জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে হাওরের কৃষি : আগাম সংকেত, প্রস্তুতি কোথায়?

আপলোড সময় : ০৪-১১-২০২৬ ১০:০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৪-১১-২০২৬ ১০:০৬:৪৯ পূর্বাহ্ন
হাওরের কৃষি প্রকৃতিনির্ভর। পানির আগমন ও প্রস্থান, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা - সবকিছুর সঙ্গে মিল রেখেই কৃষককে বোরো ধানের আবাদ পরিকল্পনা করতে হয়। কিন্তু প্রকৃতির চেনা ছন্দে পরিবর্তন এলে সেই পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতেই তেমন পরিস্থিতির আভাস দেখা দিয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় এক মাস আগেই অনেক হাওরের বীজতলা থেকে পানি নেমে শুকিয়ে গেছে। এতে বীজতলা তৈরি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রকৃতির এই পরিবর্তন কৃষির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। সাধারণত কার্তিক মাসের শেষ দিকে হাওরের পানি নামতে শুরু করে। কৃষকরা তখন বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নেন। কিন্তু এবার অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকেই অনেক এলাকার বীজতলা শুকিয়ে গেছে। কোথাও বীজতলার জমিতে সবুজ ঘাস জন্মেছে, সেখানে গবাদিপশু চরে বেড়াচ্ছে। অথচ এই জমিই হওয়ার কথা ছিল নতুন বোরো ফসলের সূতিকাগার। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের সামনে বড় প্রশ্ন- আগাম বীজতলা তৈরি করবেন, নাকি প্রচলিত সময়ের জন্য অপেক্ষা করবেন? আগাম বীজতলা তৈরি করলে পরবর্তী সময়ে ধানের বৃদ্ধি, পরিচর্যা ও ফসলের উৎপাদনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, সময়মতো বীজতলা তৈরি করতে না পারলে বোরো আবাদ পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হাওরের কৃষকের এই দোটানা কেবল একটি মৌসুমের সমস্যা নয়; এটি কৃষির সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তিত স¤পর্কেরও একটি সতর্কবার্তা। এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কৃষি বিভাগের সময়োপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ। কোন এলাকায় কখন বীজতলা তৈরি করা নিরাপদ, পানির সংকট মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, আগাম বীজ বপন করলে কী ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন - এসব বিষয়ে কৃষকদের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া জরুরি। শুধু মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়ার কথা বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না; কৃষক যেন সেই পরামর্শ যথাসময়ে পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। সুনামগঞ্জে চলতি বোরো মৌসুমে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে আবাদ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতো বিপুল পরিমাণ জমির আবাদ সফল করতে হলে মৌসুমের শুরু থেকেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রস্তুতি নিতে হবে। হাওরের কৃষি কেবল কৃষকের জীবিকা নয়, এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বীজতলা তৈরির প্রাথমিক ধাপেই যদি কৃষক অনিশ্চয়তায় পড়েন, তবে বিষয়টিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও পানিপ্রবাহের ধরন বদলে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। তাই কৃষির পুরোনো অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রয়োজন আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি পরিকল্পনা, স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা। কৃষি বিভাগ, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি। কৃষকের দুশ্চিন্তা দূর করতে এখনই হাওরভিত্তিক পরামর্শ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়ে বীজতলার অবস্থা পর্যবেক্ষণ, পানির প্রাপ্যতা যাচাই এবং এলাকাভিত্তিক করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি আসন্ন ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রমেও সময়ের পরিবর্তিত ধারা বিবেচনায় রাখতে হবে। হাওরের কৃষক প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই ফসল ফলান। কিন্তু প্রকৃতির পরিবর্তিত আচরণের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তাঁদের একা ছেড়ে দেওয়া যায় না। আগাম শুকিয়ে যাওয়া বীজতলা তাই শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়, এটি ভবিষ্যৎ কৃষি ব্যবস্থাপনার জন্যও সতর্কসংকেত। সময় থাকতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে কৃষকের উদ্বেগ কমবে, বোরো আবাদও থাকবে সুরক্ষিত।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : dailysunamkantha@gmail.com
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com