বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ১০:১৫ পূর্বাহ্ন

Notice :

কার স্বার্থে পার্কের উপর বাঁধ?

বিশেষ প্রতিনিধি ::
সুনামগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্পে হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত কাজে গত দুই বছর ধরে প্রকল্প বৃদ্ধি ও বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প ও টাকার পরিমাণ বাড়ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অন্যান্য এলাকার ন্যায় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় গত দুই বছর ধরে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত বছর বোরো ফসলরক্ষা বাঁধের টাকা দিয়ে সদর উপজেলার চলতি নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় বাঁধ উল্লেখ করেও স্থানীয়রা উচ্চ আদালত পর্যন্ত গিয়ে বাঁধের কাজ বন্ধ রাখতে পারেনি।
চলতি নদী তীরের অক্ষয়নগর গ্রামের বাসিন্দা আজিজুর রহমান বলেন, গত বছর বোরো ফসলরক্ষা বাঁধের বরাদ্দ দিয়ে নদীর তীরে অপ্রয়োজনীয় ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকার অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে লিখিত জানিয়েছে বাঁধ নির্মাণ বন্ধ রাখতে পারিনি। আদালত পর্যন্ত গিয়েও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ বন্ধ রাখা সম্ভব হয়নি। রাতারাতি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। একটি বাঁধের কারণে মানুষের দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, গত বছরের ন্যায় অপ্রয়োজনীয় একটি বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে সুনামগঞ্জ শহরতলির কুুরবাননগর ইউনিয়নের ধারারগাঁও-এ সুরমা ভ্যালি পার্কের উপরে। ২০ লাখ ৯১ হাজার টাকা ব্যয়ে ডেকার হাওরের ১৫নং উপ প্রকল্প হিসেবে ফসলরক্ষা প্রকল্পের টাকায় পার্কের উপর বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সুনামগঞ্জ পৌর শহরের নবীনগর থেকে এলজিইডির একটি পাকা সড়ক ধারারগাঁও-এর পাশ দিয়ে চলে গেছে। ধারারগাঁও মোড় থেকে একটি সড়ক সুরমা নদীর ফেরি ঘাটে গেছে। ফেরিঘাটের পূর্বপাশে জেলা প্রশাসনের সুরমা ভ্যালি পার্ক। সেই পার্কের উপর পাউবোর বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। এমনকি পার্কের স্থায়ী বেঞ্চকে বাঁধের নিচে ও লেট্রিনকে বাঁধের মাঝে ফেলা হয়েছে। অথচ পার্কের উপর যেখানে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে তার পেছনে গ্রাম ও এলজিইডি’র পাকা সড়ক রয়েছে।
অনেকেই জানিয়েছেন, পার্কের পেছনে গ্রাম ও সড়ক থাকায় বোরো ফসলের জন্য এটি অপ্রয়োজনীয় বাঁধ। পার্কের উপর বাঁধটি অপ্রয়োজনীয় ও সরকারি অর্থ অপচয় বলে দাবি করেছেন, সুনামগঞ্জের হাওরের কৃষকদের দাবি নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’। কেন এবং কার স্বার্থে এই অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে বাঁধের পার্শ্ববর্তী ধারারগাঁও গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী বলেন, এই বাঁধটি হওয়ায় এখন গ্রাম, পাকা রাস্তা বাঁচবে, ফসলও বাঁচবে। তিন-চারটা কাজ হবে এই বাঁধে।
বাঁধের নিকটবর্তী বাড়ির বাসিন্দা নেকবর আলী বলেন, মেম্বার-চেয়ারম্যান জানিয়েছেন এটা বেড়ি বাঁধ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। বেড়ি বাঁধ হিসেবে বর্ষার বন্যায় তাদের ঘর-বাড়ি যাতে না ভাঙে এজন্য বাঁধ দেওয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জ শহরের নবীনগরের বাসিন্দা উন্নয়নকর্মী সালেহিন চৌধুরী শুভ বললেন, হাওরের বোরো ফসলরক্ষার জন্য হাওরেই বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। ফসলরক্ষার নামে পার্কের উপরে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ; এমন উদাহরণ দেশের কোথাও নেই। এতে দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করা হচ্ছে। কেন এবং কার স্বার্থে এই অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের এক নেতা বলেন, ফসলরক্ষা বাঁধ হাওরে হয়; যাতে বন্যার পানি হাওরে না ঢুকতে পারে এবং ফসল নষ্ট না হয়। কিন্তু পার্কের বাঁধের কাছে কোন ফসল নেই ও এই বাঁধের সাথে ফসলের সম্পর্ক নেই। এটা একটা অপ্রয়োজনীয় বাঁধ। বাঁধের নামে যে দুর্নীতি হয় এটা একটা উদাহরণ। অনেক জায়গায় প্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে না কিন্তু এখানে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন নাহার রুমা বলেন, গত বছর চলতি নদীর বামতীরে পাঁচটি প্রকল্প কমানো হয়েছিল। তিন বছর ধরে এলাকাবাসীর অনুরোধ ছিল ও ইউনিয়ন পরিষদের দাবি অনুযায়ী পার্কের কাছের বাঁধটি হচ্ছে। তাদের দাবি এইদিকে পানি ঢুকে রাস্তা-ঘাট ভেঙে গ্রাম তলিয়ে যায়, ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উপজেলা কারিগরি কমিটি বাঁধের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে উল্লেখ করে রিপোর্ট দেওয়ার পর প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন জেলা কমিটির সদস্য সচিব ও জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (১) মো. সাবিবুর রহমান বলেন, স্থানীয়দের দাবি ও সদর উপজেলা কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি এই দিকে পানি প্রবাহ হলে ফসলের ক্ষতি হতে পারে।
কাবিটা প্রকল্প বাস্তবায়ন জেলা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, তিনি সুনামগঞ্জে নতুন যোগদান করেছেন। পার্কের উপর বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে সরেজমিনে না দেখে সঠিকভাবে কিছু বলা যাবে না। পার্কের উপর বাঁধের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হচ্ছে না। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে ওই জায়গাটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী