শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০৫:২২ অপরাহ্ন

Notice :

নূরুল হক আম্বিয়া এক প্রবাদ-প্রতীম ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব

:: হোসেন তওফিক চৌধুরী ::
সর্বজন শ্রদ্ধেয় নূরুল হক আম্বিয়ার মৃত্যুতে সুনামগঞ্জের ক্রীড়া অঙ্গনের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলো। তিনি ছিলেন এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের এক জীবন্ত প্রতিভূ। তিনি ফুটবল, ভলিবল, হ্যান্ডবল, হকি এবং লন টেনিসের কৃতী ও প্রবাদতুল্য খেলোয়াড় ছিলেন। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও তিনি সুনিপুণভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সমাজসেবায় তিনি অনন্য অবদান রেখেছেন। তিনি সুনামগঞ্জ রেডক্রিসেন্টের সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর গম্ভুজওয়ালা মসজিদের মোতায়াল্লী হিসাবে দীর্ঘদিন নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় এবং এলাকাবাসীর সহায়তায় টিন-বাঁশের খুঁটির মসজিদটি এখন একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদে পরিণত।
১৯৩৬ সালে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরে নূরুল হকের জন্ম। আম্বিয়া নামেই তিনি সর্বত্র পরিচিত। তাঁর পিতার নাম ছিল আনোয়ার মিয়া। তাঁদের মূল নিবাস ছিল মৌলভীবাজারে। তার পিতা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জেই স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। নূরুল হক আম্বিয়া, ফজলুল হক আছপিয়া এবং সিরাজুল হক কুতুব তারা তিন ভাই। ফজলুল হক আছপিয়া সাবেক এমপি ও হুইপ ছিলেন। তিনি বর্তমানে সুনামগঞ্জ জেলা বারের প্রবীণতম আইনজীবী। সিরাজুল হক কুতুব বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ঢাকায় চলে যান এবং ঢাকায় অবস্থানকালে মাস দুয়েক আগে ইন্তেকাল করেন। আম্বিয়া সাহেব সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী হাইস্কুল ও সিলেট এম.সি কলেজে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর দুই বোন- বড় বোন রহিমা খাতুন এবং ছোট বোন সালেহা খাতুন। বড় ভগ্নিপতি ছিলেন আলতাফুর রহমান। তিনি সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ছোট ভগ্নিপতি সুনামগঞ্জের হাজীপাড়া নিবাসী ডা. আব্দুস ছাত্তার। আইনজীবী রুহুল তুহিন তাঁর ভাগ্নে।
নূরুল হক আম্বিয়া ৮৬ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে ইন্তেকাল করেন ২০২১ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি তারিখে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, ৪ ছেলে, ৪ মেয়ে রেখে গেছেন।
গত ৫০/৬০ দশকের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। তিনি ফুটবলে গোলরক্ষক হিসেবে খেলতেন। তাঁর ক্রীড়া নৈপুণ্যের সুনাম ছড়িয়ে পড়লে তাকে ঢাকার সেন্ট্রেল স্টেশনারি দল গোলরক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি ঢাকার মহামেডান ফুটবল দলের গোলরক্ষকও ছিলেন। তিনি জাতীয় দলে স্থান পেয়ে বিদেশে গিয়েও খেলেছেন। তাকে ঢাকায় পুলিশ দল নেওয়ার জন্য পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদে চাকুরি দেয়। কিন্তু পুলিশি তদন্ত তাঁর অনুকূলে না হওয়ায় নিয়োগ পেয়েও চাকরিতে যোগদান করতে পারেননি। তিনি পাকিস্তান এয়ার লাইন্সে (পি.আই.এ) কিছুদিন চাকরি করেছেন। আমি তাঁর খেলা প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি ফুটবল ও ভলিবলে ছিলেন অনন্য। ভলিবলে তাঁকে প্রতিহত করা কঠিন ছিল বিপক্ষের খেলোয়াড়দের। তিনি ফুটবলের গোলরক্ষক হিসেবে গোলপোস্টের একজন সদাজাগ্রত ও অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই সুনামগঞ্জ দল ভলিবলে বার বার চ্যাম্পিয়ানশিপ অর্জন করে। তিনি বৃহত্তর সিলেট বিভাগে একবাক্যে পরিচিত ছিলেন।
তাঁর সময়ের খেলোয়াড়দের মধ্যে অনেকেই এখন জীবিত নেই। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন কৃতী খেলোয়াড়কে আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। তাঁদের মধ্যে আবুল মিয়া, সাইফুল ইসলাম, হারুন রশিদ চৌধুরী, হাসিন রশিদ চৌধুরী, লালশাদ মিয়া, আছদ্দর ভূইয়া, নন্দি বাবু, নুরুজ আলী (বাবন মিয়া), তজম উদ্দিন, গোলাম জিলানী চৌধুরী (কন্টর মিয়া), আলীনূর, সুরুজ মিয়া প্রমুখ।
আম্বিয়া ভাইয়ের ক্রীড়া নৈপুণ্যের স্মৃতি এখনও আমার চোখে ভাসে। তিনি সুনামগঞ্জ ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ব্যবসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। সততা ও নিষ্ঠার সাথে ব্যবসা করেছেন। তাঁর পুরো পরিবার এখন আমেরিকার নিউজার্সিতে বসবাস করছেন। আম্বিয়া ভাইকে সেখানেই দাফন করা হয়েছে। তিনি পবিত্র হজ্বব্রত সমাপন করেছেন। তিনি একজন ধর্মভীরু ও ধার্মিক লোক ছিলেন।
আম্বিয়া ভাইয়ের ব্যবহার ও শিষ্টাচার ছিল অমায়িক। তাকে আগে সালাম দেওয়া কঠিন ছিল। তিনি তাঁর ব্যবহার দিয়ে সর্বত্র মানুষের মন জয় করেছিলেন। তিনি সুনামগঞ্জে থাকতে প্রায় প্রতিদিন সকালেই ফজরের নামাজের পর ষোলঘর কাজীর পয়েন্টে তাঁর সাথে আমার দেখা হতো। তাঁর ব্যবহারে এলাকার সবাই মুগ্ধ ও বিমোহিত। তাঁর স্মৃতি অবদান দীর্ঘদিন মানুষের মনে বেঁচে থাকবে। মানুষ তাঁকে শোক, শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্মরণ করবে।
[হোসেন তওফিক চৌধুরী : সিনিয়র আইনজীবী ও কলামিস্ট]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী