শনিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০১:৩২ অপরাহ্ন

Notice :

অভিনন্দন মেয়র নাদের বখত

:: ম ফ র ফোরকান ::
১৬ জানুয়ারি ২০২১ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সুনামগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচন। এ দিনের নির্বাচনটি ছিল সন্দেহাতীতভাবে প্রশ্নহীন ও নির্ভেজাল। অনেকটা স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আয়োজিত নির্বাচনের মত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন।
ভোটকেন্দ্র দখল, বাক্স ছিনতাই, পক্ষপাতের বশিভূত হয়ে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক ব্যালটে বাক্স ভর্তির মতো কোন অভিযোগ তুলতে পারেনি কেউ এই নির্বাচনে। বরং সবার মুখেই ছিল এসবের বিপরীত ঘটনার বর্ণনা। প্রবীণ বহু ভোটারের দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য ছিলো, ‘এমন সুষ্ঠু নির্বাচন আবার অনুষ্ঠিত হবে তা ভাবতে পারিনি আদৌ’। দলীয় সরকারের পক্ষেও যে সুষ্ঠু ও প্রশ্নাতীত নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব, সুনামগঞ্জ পৌরসভার ১৬ জানুয়ারির নির্বাচনটি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আর এ নির্বাচনেই নাদের বখতকে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নাদের বখত তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মুর্শেদ আলমকে ১৫ হাজার ৭৯৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। নাদের নৌকা প্রতীকে ভোট পেয়েছেন মোট ২১ হাজার ৬৬৯। ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী মুর্শেদ আলম পেয়েছেন মোট ৫ হাজার ৮৮৫ ভোট।
এবারের নির্বাচনে সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে নাদের বখতের পক্ষে অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি হয়। সাবেক জননন্দিত পৌর মেয়র ও আওয়ামী লীগের এক সময়ের জেলা সেক্রেটারি জননেতা আয়ূব বখত জগলুল সুনামগঞ্জ পৌরসভার অতীতের সব চেয়ারম্যানের রেকর্ড ভঙ্গ করে পৌর এলাকায় বহু দৃশ্যমান ও জনকল্যাণমুখী উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করে যান। স্বল্প সময়কালে এতো দৃশ্যমান উন্নয়নের মুখ দেখার কল্পনাও কখনও করেনি পৌরবাসী। কিন্তু সুনামগঞ্জের পৌর নাগরিক সে সৌভাগ্য অর্জন করে মেয়র জগলুলের ক্লান্তিহীন শ্রমের বদৌলতে। বড় ভাই জগলুল আকস্মিক মৃত্যুমুখে পতিত হলে উপনির্বাচনে নির্বাচিত মেয়র নাদেরও অনুসরণ করেন বড় ভাইয়ের পদাঙ্ক। বাস্তবায়ন করেন চোখ ধাঁধানো নানা উন্নয়ন প্রকল্প। স্বল্প সময়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভায় অনেক দৃশ্যমান উন্নয়ন সাধন করে বঞ্চিত পৌর নাগরিকদের নজর কাড়তে সমর্থ হন নাদের বখত। এ জন্য নাগরিক সমাজ আস্থাশীল হয় নাদেরের ওপর। বিশ্বাস করে, নাদেরও হবেন জগলুলের মতই নাগরিক চাহিদা পূরণে অন্তপ্রাণ। মানুষ পাশে পাবে তাঁকে আপদে-বিপদে, যে শিক্ষা তাঁদের পরিবারের সবাই পেয়েছেন পিতা হোসেন বখতের কাছ থেকে।
হোসেন বখত ছিলেন সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। সুনামগঞ্জে প্রগতিশীল রাজনীতির বিকাশ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংগ্রামে হোসেন বখত নামটি প্রবাদপ্রতীম। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান সুনামগঞ্জবাসী স্মরণ করে আজো শ্রদ্ধাভরে। নির্দ্বিধায় বলা যায়, পিতা ও বড় দু’ভাই আমৃত্যু নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের সেবা করে যাওয়ার সুফলই পেয়েছেন মেয়র নাদের।
অন্যদিকে, যুগের পর যুগ এই পৌর চেয়ারে সমাসীন থাকা ব্যক্তি বা তাঁদের উত্তরসূরিরা আঙুল তুলে সুনামগঞ্জ পৌরসভায় উন্নয়নের কোন নমুনা দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং নজিরবিহীন দুর্নীতিতে হাবুডুবু খাওয়ার দালিলিক প্রমাণ জনসম্মুখে ঝলমল করছে বিধায় তারা এখন হয়েছেন পরিত্যাজ্য। এক সময় একটি বাড়ির লোক ছিলেন সব নির্বাচনে দাঁড়ানোর বিকল্পহীন প্রার্থী। প্রধান তিনটি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতেন যে একটি বাড়িতে থেকে, কালেরচক্রে আজ সে বাড়ি জনপ্রতিনিধিহীন। স্বার্থান্ধ চামচারা ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ বাধিয়ে নিজেরা আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হলেও ওই বাড়িটির কপালে কলঙ্কের ছাপ এঁটে দিয়েছে স্থায়ীভাবে। আজ এ বাড়ির কোন ব্যক্তির পক্ষে নির্বাচনে নামার হিম্মত নেই। বলতে পারি, মুরোদে কুলোয় না। জনতুষ্টির স্থলে চামচাতুষ্টি ও চামচাদের কানমন্ত্র শুনে দাপট দেখতে বেশি সিদ্ধহস্ত হওয়ায়, তাদেরকে বরণ করতে হয়েছে এই করুণ পরিণতি।
সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনে মোট ভোটার ৪৭ হাজার ১৫। প্রয়োগ হয়েছে ৩০ হাজার ৬০৬ ভোট। এরমধ্যে বাতিল হয়েছে ৭৩৮ ভোট। কাস্টিং ভোটের হার ৬৫.১০ শতাংশ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নবীনগর হাজী আবিদ উল্লাহ পৌর প্রাথমিক কেন্দ্রে মোট ভোট ২ হাজার ১৮১। নাদের বখত পেয়েছেন ১ হাজার ১৩৯। বিএনপির মুর্শেদ আলম পেয়েছেন ১৬২ ভোট। মোহাম্মদপুরের ব্লু স্কাই একাডেমি কেন্দ্রে মোট ভোটার ২ হাজার ২৫১। নাদের বখত পেয়েছেন ৯৫১। মুর্শেদ ৩৫৮ ভোট। ষোলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোট ২ হাজার ৮১৭। নাদের বখত পেয়েছেন ১ হাজার ১৯২। মুর্শেদ ৩০৭। হাছননগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের বখত পেয়েছেন ৪০৯ ভোট। মুর্শেদ ১৫৫। এখানে মোট ভোট সংখ্যা ১ হাজার ৪৫। জেলা মৎস্য অফিস কেন্দ্র নাদের বখত পেয়েছেন ৫১৯। মুর্শেদ পেয়েছেন ৮০। ষোলঘর পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউজ কেন্দ্রে মোট ভোট ১ হাজার ১২১। নাদের বখত পেয়েছেন ৪৪৮। মুর্শেদ ১৯০।
আপ্তাবনগরের হযরত খাদিজাতুল কোবরা (রা) ইসলামিয়া বালিকা মাদ্রাসা কেন্দ্রে নাদের বখত পেয়েছেন ৮৭৪ ভোট। মুর্শেদ ২১১। নতুন হাছননগরের আব্দুল আহাদ সাহিদা চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের বখত পেয়েছেন ১ হাজার ৪৯৫ ভোট। মুর্শেদ পেয়েছেন ৫২৫ ভোট। মোক্তারপাড়া জাতীয় মহিলা সমিতি কেন্দ্রে নাদের বখত পেয়েছেন ১হাজার ৬৪ ভোট। মুর্শেদ ১১৮। সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের পেয়েছেন ৫৬৫। মুর্শেদ আলম ৭৪।
এইচএমপি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের বখত পেয়েছেন ৭৭৩ ভোট ও মুর্শেদ আলম ১৫০ ভোট। সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে নাদের পেয়েছেন ১ হাজার ৮৯৪ ভোট। মুর্শেদ পেয়েছেন ১২৮। বুলচান্দ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের পেয়েছেন ১ হাজার ২৯৫। মুর্শেদ পেয়েছেন ১৭৬ ভোট। উত্তর আরপিননগর পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের পেয়েছেন ৭১৪ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী মুর্শেদ পেয়েছেন ৫২৯ ভোট। দক্ষিণ আরপিননগরের কে বি মিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের পেয়েছেন ৬৬৪। মুর্শেদ ২৮৯। জামতলা পিটিআই কেন্দ্রে নাদের পেয়েছেন ৩০৩ ও মুর্শেদ ১৩৯ ভোট। লবজান চৌধুরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের বখত পেয়েছেন ১ হাজার ২৬৭ ভোট। মুর্শেদ আলম পেয়েছেন ৩৬৮ ভোট। বড়পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদেরের প্রাপ্ত ভোট ৯২৪। মুর্শেদের ৩৪০। বড়পাড়া আব্দুর রহমান পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের পেয়েছেন ১ হাজার ৪১ ভোট ও মুর্শেদ পেয়েছেন ২৬৪ ভোট। মল্লিকপুর আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের বখত পেয়েছেন ১হাজার ২৭৭। মুর্শেদ আলম ৩২৭। কালিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নাদের পেয়েছেন ৬৬৫ ভোট। মুর্শেদ পেয়েছেন ২৪৩ ভোট। ওয়েজখালি হোসেন বখত ফরিদা বখত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা কেন্দ্রে নাদেরের প্রাপ্ত ভোট ১ হাজার ২৯৯। মুর্শেদ পেয়েছেন ৫০৯ ভোট। জলিলপুর পৌর প্রাথমিক কেন্দ্রে নৌকার প্রার্থী নাদের পেয়েছেন ৮৯৭ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী মুর্শেদ পেয়েছেন ২৪৩ ভোট।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ ছিল খুবই শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল। ভোটাররা এসব কেন্দ্রে ভোট দিতে গেছেন উৎসবমুখর পরিবেশে। ১৬ জানুয়ারি/২০২১এর নির্বাচনে মেয়র নাদের আগের সাড়ে ৩ বছরের নাগরিক সেবার মূল্যায়ন পেয়েছেন ষোলআনা। শেষ হাসি হেসেছেন তিনি পৌরবাসীর বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ঘোষণা শুনে।
আমি মনে করি, অনাগত দিনে তেলের বোতল উপুত করে মালিশকারীদের তথা সাবেক এক চেয়ারম্যান তল্পিতল্পা নিয়ে কলঙ্কের কালিমায় কলঙ্কিত হয়েছেন যাদের কুমন্ত্রণায়, যাঁরা চেয়ারম্যানকে দুর্নীতির নোংরা জলে ডুবিয়ে নিজেরা হয়েছেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ, তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে মেয়র নাদের বখত আগের মতোই পৌরসভার উন্নয়নে সক্রিয় এবং অন্তপ্রাণ থাকবেন-এ প্রত্যাশা সুনামগঞ্জ পৌরসভার প্রতিটি নাগরিকের। আবারো অভিনন্দন জানাই জনতার প্রতিনিধি, জনতার সেবক প্রিয় নাদের বখত-কে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী