মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১, ০৩:০৮ পূর্বাহ্ন

Notice :

পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রকল্প!

শামস শামীম ::
সুনামগঞ্জে পাল্লা দিয়ে হাওরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাড়ানো হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক মাস অতিবাহিত হলেও এখনো কাজই শুরু হয়নি কোথাও। কাজ শুরু না হলেও সুবিধাভোগীরা আরও প্রকল্পের জন্য টাকা নিয়ে ঘুরছেন এমন বিস্তর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় শীর্ষ জনপ্রতিনিধিদের নাম ভাঙিয়ে প্রতিটি হাওরে মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা উপজেলাসহ কয়েকটি উপজেলায় একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। তারা উপজেলা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন কমিটিকে প্রভাবিত করে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে প্রকল্প গ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেক কৃষক। গত বছর ৭৪৫টি প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও এবার ইতোমধ্যে ৭৮৭টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। আরো প্রকল্প বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে জড়িত জেলা কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ ডিসেম্বর হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। ওই সময়ে ১০টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে মর্মে বলা হলেও আদতে কোথাও ‘শোঅফ’ ছাড়া কাজ শুরু হয়নি। ওই সময়ে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের মাঠ পর্যায়ে প্রাক্কলন সম্পন্ন করতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড হাওরের ৯৫০ কি.মি. এলাকা সার্ভে করেছিল। চলতি বছর ৬১৩ কি.মি. বাঁধ মেরামত, সংস্কার ও পুননির্মাণকাজ আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ করার কথা। কিন্তু প্রকল্প গ্রহণ বিলম্ব হওয়ায় যথাসময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবেনা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১০ জানুয়ারি রবিবার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত জেলা কমিটির সভায় এ পর্যন্ত ৭৮৭ টি প্রকল্প গ্রহণ করা করা হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে এসব প্রকল্পের মধ্যে এ পর্যন্ত ২১২টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এবার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ৬২ কোটি ৫৪ লক্ষ টাকা প্রাথমিক বরাদ্দ দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। রবিবারের সভায় প্রাথমিক অনুমোদিত ৭৮৭টি প্রকল্পে কোন আপত্তি থাকলে তিনদিনের মধ্যে অভিযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে জেলা কমিটি।
২০১৭ সালের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনায় কাবিটা নীতিমালা বদল করে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প শুরু করে সরকার। এতে জেলা প্রশাসক জেলা কমিটির সভাপতি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় নির্বাহী প্রকৌশলী সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলীর নেতৃত্বে কাবিটা মনিটরিং ও বাস্তবায়ন কমিটি রয়েছে। উপজেলা পর্যায় থেকে হাওরে গিয়ে সুবিধাভোগী, জমির মালিক ও প্রকৃত কৃষকদের নেতৃত্বে পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠনের কথা থাকলেও সেটা কোথাও করা হয়নি। বরং স্থানীয় শীর্ষ জনপ্রতিনিধিদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় সুবিধাভোগী প্রভাবশালীদের নিয়েই গণশুনানী হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। যার ফলে প্রকৃত কৃষকরা বাদ পড়েছেন। এসব অনিয়মের ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃত কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বিভিন্ন এলাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন। প্রকল্পে যুক্ত হতে বিভিন্ন এলাকায় লোকজন টাকা নিয়ে ঘুরছেন বলে গত শনিবার সুনামগঞ্জ ট্রাফিক পয়েন্টে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে অভিযোগ করেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। পিআইসি গঠনে চরম দুর্নীতি ও অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন সংগঠনের নেতারা।
এদিকে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে শাল্লা উপজেলায় হবিবপুর গ্রামের কৃষক নীতিশ পুরকায়স্থ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন, ভাণ্ডাবিল হাওরে তার জমি রয়েছে। কমিটিতে থাকার তার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তাকে না ঢুকিয়ে যার জমি নেই এমন ব্যক্তিকে ঢুকানো হয়েছে। জাতগাঁও গ্রামে কৃষক এনাম চৌধুরী পিআইসিতে যুক্ত হতে আবেদন করলেও তার কাছে ১ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে। তাই তিনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। পিআইসিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রকল্পে যুক্ত করায় কাজে বিলম্ব হচ্ছে বলে মনে করেন হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক লীগের সদস্য সচিব বিন্দু তালুকদার বলেন, আমরা অভিযোগ পাচ্ছি একটি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী পিআইসিতে লোকজন ঢুকাতে টাকা নিয়ে ঘুরছে। আমরা সাংগঠনিকভাবে সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতিমুক্তভাবে পিআইসি গঠন করে হাওরের কৃষকের সম্পদ রক্ষায় দ্রুত কাজ শুরুর দাবি জানিয়েছি। এখনো কাজ শুরু না হওয়ায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, হাওরে এই সময় আসলে হরিলুট শুরু হয়। নীতিমালা অনুযায়ী কোথাও পিআইসি গঠন হচ্ছে না। বরং টাকা দিয়ে পিআইসিতে লোকজন যুক্ত হওয়ায় জন্য লড়াই শুরু হয়েছে। যার ফলে কাজ শুরু ও প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব হচ্ছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, জেলার সর্বত্র হাওরের প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ওঠেছে। আমরা প্রকৃত কৃষকদের পিআইসিতে যুক্ত করার দাবি জানিয়েছি। একই সঙ্গে দ্রুত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছি।
হাওররক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে যুক্ত জেলা কমিটির সদস্যসচিব ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, পানি বিলম্বে নামার কারণে সার্ভে করতে বিলম্ব হয়েছে। তাই প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদনেও বিলম্ব হচ্ছে। তবে এ মাসেই কাজ শুরু হবে। তবে মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের প্রকল্প গ্রহণে নীতিমালা মানার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা রবিবার সভা করে ৭৮৭ প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছি। কমিটিগুলো ইউনিয়ন, উপজেলা ও পাউবো’র ওয়েবপোর্টালে প্রকাশের নির্দেশনা দিয়েছি। তিনদিনের মধ্যে কোন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ করা হলে আমরা ব্যবস্থা নেব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী