মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২১, ০২:০৬ পূর্বাহ্ন

Notice :

আব্দুল বারী চৌধুরী সুনামগঞ্জের স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিত্ব

:: হোসেন তওফিক চৌধুরী ::
শহর সুনামগঞ্জে “বারী মঞ্জিল” নামে একটি বাসভবন রয়েছে। শহরের তেঘরিয়া এলাকার প্রবেশ পয়েন্টে এই ভবনের অবস্থান। এই ভবন ছিল একদিন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। মানুষের আনাগোনা ও কলকাকলীতে ছিল কর্মচঞ্চল। হরহামেশা জমতো রাজনৈতিক আড্ডা। শহরের বিশিষ্টজনরা দলমত নির্বিশেষে এই আড্ডায় যোগ দিতেন। এই ভবনের সাথে সুনামগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সময়ের বিবর্তনে আজ এই ভবনটি নিষ্প্রভ। আব্দুল বারী সাহেবের মৃত্যুর পর থেকেই এই ভবনটি তাঁর জৌলুস হারিয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই ভবনের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে অবহিত নন। প্রবীণদের এই ভবনের কীর্তিগাথা সম্পর্কে অবহিত থাকলেও তাদের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।
এই ভবনটি প্রতিষ্ঠা পায় ৮০ থেকে ৮৫ বছর আগে। এই ভবনের প্রতিষ্ঠাতার নাম আব্দুল বারী চৌধুরী। তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সদস্য। প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতা। ১৯৩৭ এবং ১৯৪৬ সালে তিনি এম.এল.এ নির্বাচিত হন। তিনি সুনামগঞ্জের লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। এই প্রখ্যাত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির জন্ম জগন্নাথপুরের আশারকান্দি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। ১৯০১ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল আব্দুল আজিজ চৌধুরী। প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর তিনি সিলেট সরকারি হাইস্কুল থেকে ১৯২২ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করেন। তিনি ১৯২৬ সালে সিলেট মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯২৯ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন।
তিনি প্রথমে কলকাতায় আইন ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু তাঁর শুভাকাক্সিক্ষ, আত্মীয়স্বজন এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনুরোধে তিনি সুনামগঞ্জে চলে আসেন এবং সুনামগঞ্জ আইনজীবী সমিতির সদস্য হয়ে আইন পেশায় নিয়োজিত হন। রাজনৈতিক মনস্ক ও রাজনৈতিক সচেতন আব্দুল বারী চৌধুরী ১৯৩৭ সালে পৃথক নির্বাচনের পদ্ধতিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি জগন্নাথপুর, শাল্লা-দিরাই নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রার্থী হন। তিনি নির্বাচনে এম.এল.এ. নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন আসনে থেকে মৌলভী মুনাওর আলী, মকবুল হোসেন চৌধুরী, দেওয়ান আহবাব চৌধুরী এম.এল.এ.নির্বাচিত হন। আসাম প্রাদেশিক পরিষদে সদস্য হিসাবে তিনি প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়নে ভূমিকা পালন করেন। কুখ্যাত লাইন প্রথা ও বাঙ্গাল খেদা বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। তিনি একজন দক্ষ ও তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন আইনপ্রণেতা হিসাবে সুনাম অর্জন করেন।
তখনকার দিনে প্রতিটি মহকুমায় স্থানীয় সরকারের পর্যায় হিসাবে লোকাল বোর্ড নামে একটি স্ব-ঘোষিত প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৩৮ সালে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সদস্য হয়ে লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। লোকাল বোর্ড প্রাথমিক শিক্ষা, স্থানীয় পূর্তকর্মের প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের কাজকর্মের দেখাশুনা করতেন। তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবে এই বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৬ সালে সাধারণ নির্বাচনে তিনি পুনরায় এম.এল.এ. নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন আসনে থেকে মৌলভী মুনাওর আলী, আলহাজ্ব মফিজ চৌধুরী, আব্দুল খালেক আহমদ, যতীন্দ্র ভদ্র ও অক্ষয় কুমার দাস এম.এল.এ. নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর সিলেট পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে এই সম্মানিত সদস্যগণকে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের সদস্য হিসাবে পরিগণিত করা হয়। তিনি ১৯৩৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও ফেলো মনোনীত হন। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৪ সালে সুনামগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান সর্বজনবিদিত। তিনি “শাহজালাল” ও “গায়ের মায়া” নামে দুইটি নাটক রচনা করেন। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা আন্দোলনে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। দেশ ভাগের আগে শিলচরে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তিনি প্রায় ১০ মাস কারাগারে আটক ছিলেন।
এই কৃতী ব্যক্তিত্ব ও বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আব্দুল বারী চৌধুরী ১৯৫০ সালের ২৫ শে জুন আকস্মিকভাবে তাঁর নির্বাচন এলাকা দিরাইয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর অকাল মৃত্যুতে সুনামগঞ্জ একজন দক্ষ আইনপ্রণেতা, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবীকে হারালো। তিনি দুই পুত্র আনিছুল বারী চৌধুরী ও আসাদুল বারী চৌধুরী ও এক কন্যাকে রেখে যান। সুনামগঞ্জের স্মরণীয় আলোকিত ব্যক্তিদের অন্যতম শীর্ষে ছিলেন তিনি। আব্দুল বারী চৌধুরীর অবদান সুনামগঞ্জের ইতিহাসে এক আলোকিত অধ্যায়। তিনি তাঁর সুকর্মের মধ্যে জনচিত্তে স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে থাকবেন।
[লেখক: আইনজীবী-কলামিস্ট]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী