সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৩১ অপরাহ্ন

Notice :

৫৭ ভূমিখেকোর পেটে কামারখাল

স্টাফ রিপোর্টার ::
দুই যুগ আগেও যে খালগুলো ছিল স্রোতস্বী, চলাচল করতো নৌযান – সুনামগঞ্জ পৌর শহরের উপর দিয়ে প্রবাহিত এমন পাঁচটি খালের বেশিরভাগ অংশ এখন অবৈধভাবে দখলদারদের পেটে। এক সময়ের স্রোতস্বী বলাইখালি, কামারখাল, তেঘরিয়া খাল ও বড়পাড়া খাল খালের উপর অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলায় এগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। আর ঝির ঝির করে কোনোমতে বইছে ধোপাখালি খাল।
প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট এই খালগুলো অস্তিত্ব হারানোয় পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি শহরবাসীর জন্য জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণ আর সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে দখল হওয়া খালগুলো পুনরুদ্ধারে সমাজের নানা প্রান্ত থেকে দাবি উঠলেও অদৃশ্য কারণে বছরে পর বছর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
বিভিন্ন সময় দখলদারদের উচ্ছেদে কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলেও তাদের দখলদারদের হাত এতোটাই লম্বা যে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হতে না হতেই থেমে যাওয়ার নজির প্রত্যক্ষ করে আসছেন পৌরবাসী। এদিকে, প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট খাল, নদী, নালা থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশের প্রেক্ষিতে দেশব্যাপী চলা উচ্ছেদ অভিযান এই সুনামগঞ্জ পৌর এলাকায়ও কার্যকর করার দাবি পৌর নাগরিকদের।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ থাকলেও শীঘ্রই অভিযান শুরু করা হবে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিস সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জ পৌর শহরের দখলকৃত প্রধান প্রধান খালের দখলদারের তালিকা ইতোমধ্যে চূড়ান্ত করেছে সদর উপজেলা ভূমি অফিস। শহরের প্রধান খাল কামারখাল দখলের তালিকায় নাম রয়েছে ৫৭ জনের। তারা খালের উপর দোকান কোঠা, সীমান প্রাচীর, বাসাবাড়ি নির্মাণ করে খালটির অস্তিত্ব প্রায় বিলীন করে দিয়েছেন। এগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে উচ্ছেদের তালিকা করে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে পাঠানোর কথা জানিয়েছেন সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ আদনান।
জনশ্রুতি রয়েছে এক সময় ঝাওয়ার হাওর খনন করেই সুনামগঞ্জ শহর প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই হাওরে গিয়ে পড়ত শহরের পানি। সুরমা নদী থেকে প্রবাহিত ৫টি খাল শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ঝাওয়ার হাওরে গিয়ে শেষ হয়। এই খালগুলোই ছিল শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ। এই খালগুলো হচ্ছে ধোপাখালি, বলাইখালী, কামারখাল, তেঘরিয়া খাল ও বড়পাড়া খাল।
শহরের পূর্ব উত্তর এলাকায় ধোপাখালি খালটি অবস্থিত। এই খাল দিয়ে এক সময় মরাগাঙে পানি নামতো। পরে এই পানি মোহাম্মদপুর হয়ে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের পূর্বে অবস্থিত জলাশয়ে গিয়ে পতিত হতো। এই জলাশয় থেকে সোনাখালি খাল হয়ে ঝাওয়ার হাওরে নামতো পানি। বর্তমানে পানি নামলেও ধোপাখালিতে অপরিকল্পিত স্লুইসগেটের কারণে পর্যাপ্ত পানি চলাচলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ভরাট ও দখল হয়েছে খালটি।
ষোলঘরের পুরাতন কাস্টমস অফিস সংলগ্ন সুরমা নদী থেকে বলাই খালের উৎপত্তি। এখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খালের পানি বনানীপাড়া হয়ে ঝিলে গিয়ে পড়তো। পরে সরকারি কলেজের পেছনের খাল হয়ে হাওরে নামতো এই জলধারা। খালের আশপাশের সকল বাসাবাড়ির পানি এই খাল দিয়েই নিষ্কাশন হতো।
এদিকে, কামারখাল এক সময় খরস্রোতা খাল ছিল। উপনিবেশিক আমলে শহরে আসতে এই খাল পাড়ি দিতে হতো নাগরিকদের। পশ্চিম বাজারের বর্তমান পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন সুরমা নদী থেকে খালটির উৎপত্তি। এখানে পাকিস্তান আমলে বাঁশের সেতু দিয়ে যাতায়াত করতেন মানুষ। পরবর্তীতে পৌর চেয়ারম্যান দেওয়ান ওবায়দুর রেজা চৌধুরীর সময়ে পৌর কর্তৃপক্ষ এখানে আকর্ষণীয় ডিজাইনের পাকা সেতু নির্মাণ করে। পরে প্রয়াত মেজর ইকবাল হোসেন চৌধুরীর সময়ে সেতুটি ভেঙে দিয়ে খালটি বন্ধ করে রাস্তা তৈরি করা হয়। প্রয়াত পৌর চেয়ারম্যান মমিনুল মউজদীনের সময়ে উৎপত্তিমুখে পৌর প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়। এভাবেই খালটির মৃত্যু ঘটে। এই খালটি আরপিননগর হয়ে ডা. তৃণাঙ্কুর রায়ের বাসার সামনে দিয়ে শামীমাবাদ-বুলচান্দ, মহিলা কলেজের সামনে দিয়ে, বাঁধনপাড়া হয়ে ঝাওয়ার হাওরে পতিত হয়। ওই খালের পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের পানি নিষ্কাশন হতো এই খাল দিয়ে। এক সময় এই খালটিতে পৌর কর্তৃপক্ষ সংকুচিত ড্রেন নির্মাণ করে আরও সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করেন নাগরিকরা।
পশ্চিম তেঘরিয়ার ডা. আমিরুল ইসলামের বাসার পূর্বে তেঘরিয়া খালটির অবস্থান ছিল। এরও উৎপত্তি সুরমা নদী থেকে। এই খালটি তেঘরিয়াকে দুই অংশে ভাগ করে। এই খালটি লম্বাহাটি মসজিদ, বিদ্যুৎ অফিস, কোর্টের সম্মুখে সড়ক ও জনপথ বিভাগের খাল হয়ে মল্লিকপুর সেতু (বিজিবি অফিসের সামনের সেতু) হয়ে ঝাওয়ার হাওরে পতিত হতো। পরবর্তীতে সেতুর নিচ ভরাট করে স্থায়ীভাবে খালটির পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এই খালের অর্ধেক অংশে রাস্তা নির্মিত হয়। অনেকে খালটি দখলও করে নেন। বড়পাড়া খালটি ছমির উদ্দিনের বাড়ির সামন থেকে সুরমার একটি ধারা হিসেবে প্রবাহিত হতো। এই খালটি সওজের রাস্তা সংলগ্ন খালে যুক্ত হয়ে মল্লিকপুরের সেতুর নিচ দিয়ে ঝাওয়ার হাওরে মিশে। এই খালের উপর বর্তমানে পৌরসভার রাস্তা নির্মিত হয়েছে।
প্রবীণরা জানান, এই ৫টি খালই ছিল শহরবাসীর প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের প্রধানতম ধারা। এক সময় ড্রেন না থাকায় এই খালগুলোই নাগরিকদের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সহজতর করেছিল। বিশেষ করে শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার ড্রেনেজগুলো পতিত ছিল এসব খালে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কার্যকরী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, সুনামগঞ্জ পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি শহরের দখলকৃতখালগুলো দখলমুক্ত করা। সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে অনেক সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন করা হয়েছে। কিন্তু খাল দখলমুক্ত করার কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হচ্ছে না। শহরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় খালগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে পুনরুদ্ধার করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে পৌর কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, নদী ও খালের উপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজ এগিয়ে নিয়ে এসেছি। করোনার কারণে উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ ছিল। শীঘ্রই শুরু করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ১৫ নভেম্বর (আজ রোববার) শহরের খাল পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে একটি সভা রয়েছে। যেখানে মেয়র মহোদয়কে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একটি কারিগরি টিমের মাধ্যমে অবৈধ দখলদারের তালিকা করা হয়েছে। পৌর মেয়রের সহযোগিতায় চলতি মাসেই খাল পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী