শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৫৫ অপরাহ্ন

Notice :

সাংবাদিক রেজা এবং আমার সাথের দু-একটি স্মৃতি এবং ওসি মহসিনের চাকুরি হারানোর কাহিনী

:: ম ফ র ফোরকান ::
বন্ধুবর মাসুদুল আমেরিকা প্রবাসী। দীর্ঘদিন ধরে দেখা-সাক্ষাৎ নেই আমাদের। ১ আগস্ট ২০২০ তারিখ সকাল সাড়ে ৭টায় আমার ঘনিষ্ঠ বাল্যবন্ধু রেজাউর রহমান রেজা মৃত্যুবরণ করেছে। তার মৃত্যু হয়েছে সিলেট ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে। মাসুদুলেরও প্রাণপ্রিয় বন্ধু ছিল রেজা। মৃত্যু সংবাদ পেয়েই ফেসবুকে রেজাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছে মাসুদুল। তার লেখাটি ছিল খুবই হৃদয়গ্রাহী। একটি ম্যাসেজে মাসুদুল আমাকেও তাগিদ দিয়েছে রেজাকে নিয়ে কিছু লেখার। মাসুদুলসহ আমাদের বন্ধুমহল এমন প্রত্যাশা করতেই পারে আমার কাছে।
বন্ধুত্বের ৫৪/৫৫ বছরের অগণিত স্মৃতি চোখের সামনে। এর কোনটি প্রকাশযোগ্য আবার কোনটির প্রকাশ, একদমই নয়। রেজার মৃত্যুর দিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তাকে নিয়ে কিছু না লেখার। মনটা বেজায় খারাপ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাসুদুলের অনুরোধটি উপেক্ষা সম্ভব হয়নি। আগেই বলেছি, রেজা আমার বাল্যবন্ধু।
হাছননগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে প্রথম শ্রেণিতেই তার সঙ্গে পরিচয়। ঘনিষ্ঠতা বাড়ে ১৯৭১ সালে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। আমাদের মহল্লা হাছননগর-সুলতানপুরে বাসাবাড়ির সংখ্যা এমনিতেই কম। তদুপরি এসব বাসাবাড়ির অধিকাংশ বাসিন্দা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ভয়ে তখন ছন্নছাড়া বা উদ্বাস্তু- বাড়িঘর ফেলে শহর থেকে দূরে। মহল্লার যে ৪-৬ টি পরিবার কয়েক মাস গ্রাম-গ্রামান্তরে কাটিয়ে অবশেষে নিজ নিজ বাসায় ফিরে এসেছিলাম, সেসব বাসার ছেলেরা বিকেলে খেলাধুলা করতাম এক সঙ্গে। চারিত্রিক নানা বৈপরীত্ব থাকা সত্ত্বেও আমার আর রেজার সম্পর্ক তুঙ্গে উঠে সে সময়ে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ’৭১-এর ক্রান্তিকালের বন্ধু কাজী রফিক, মাসুদুল, জিয়াউল, রেজা ও আমার মধ্যে বিনা সুতার একটা দৃঢ় বন্ধন গড়ে উঠে। দীর্ঘ পথচলায় রেজা ও আমার সম্পর্ক যে একেবারে মসৃণ ছিল তা কিন্তু নয়। বেশ ক’টি অমার্জনীয় ও দুঃখজনক ঘটনা আমাদের সম্পর্ককে কয়েকবারই খাদের কিনারায় নিয়ে যায়। তারপরও দু’জনে দেখা হলে আমরা যেন উতালা হয়ে যেতাম। সম্পর্কে ফাটল ধরেছে কিংবা তিক্ততা চলছে তা বাইরের কেউ তো দূরের কথা আমরা নিজেরাও যেন ঠাহর করে উঠতে পারতাম না। বিরামহীন কথা চলাকালে কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে চাইতাম না। স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে একজন আরেকজনের জন্য জীবনটাও অকাতরে বিলিয়ে দিতে দ্বিধা করতাম কিনা তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না। একটা ঘটনা উল্লেখ করলে আমার বক্তব্যটা পরিষ্কার হতে পারে। ১৯৮১ সালের দিকে আমাদের মহল্লার স্বপন নামের একটি বখাটে ও মদ্যপ ছেলে রেজাকে ছুরিকাঘাত করে। কি কারণে এ ছুরিকাঘাত, তা আমার অজানা। সংবাদটি প্রায় উন্মাদ করে দেয় আমাকে। আমি হাসপাতালে ছুটে যাই তৎক্ষণাত। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে যাই থানায়। ওসি একজন এসআইকে পাঠান অভিযুক্তকে ধরে আনতে। ১০ কিংবা ১৫ মিনিট পর সে এসআইকে খালি হাতে ফিরে আসতে দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনি। থানার ভেতরে আমি তখন চরম উত্তেজিত। এমনি অবস্থায় আমার গায়ে ধাক্কা লাগিয়ে ওই এসআই নিজের টেবিলের দিকে যাওয়ার সময় আমি ঘটিয়ে ফেলি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও অকল্পনীয় ঘটনা। এসআইকে পেছন থেকে ঘাড়ে ধরে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করি “আমাদের আসামি কোথায়?” বেচারা এসআই তো হতভম্ব। উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা ঝাপটে ধরে আমাকে। শুরু করে বেধড়ক পিটুনি। রেজার বড়ভাই আলতাফ আমার ঘটানো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাটির জন্য বারবার ক্ষমা চাইতে থাকে ওসি মো. মহসিনের কাছে। এদিকে খবর পেয়ে দ্রুত থানায় ছুটে আসেন দৈনিক বাংলার তৎকালীন রিপোর্টার এডভোকেট আবু আলী সাজ্জাদ হোসাইন ও আমার বড়ভাই দৈনিক দেশের রিপোর্টার সিদ্দিকুর রহমান চৌধুরী। তাঁদের জোর তৎপরতায় থানা থেকে ছাড়া পাই আমি। এ সময় সুনামগঞ্জের এসডিপিও আর ওসির মধ্যে চলছিল ঠাণ্ডা লড়াই। আমাদের লন্ডনী অধ্যুষিত জগন্নাথপুরে বিয়ে করেছিলেন ওসি। চাকরি সূত্রে ওসি মহসিন এমনিতেই ছিলেন বহু টাকার মালিক। তারপর সোনায় সোহাগা হয় লন্ডনী শ্বশুরবাড়ি। টাকার গরমে উপরস্থ কর্মকর্তাদের আদেশ-নির্দেশ ওসি গ্রাহ্যের মধ্যে আনতেন খুব কমই। আমার সঙ্গে থানা পুলিশের ঘটনাটি হয়তো কানে যায় এসডিপিও’র। তারই জের ধরে ঘটনার মাসখানেক পর আমাদের মহল্লার এক বড় ভাই, তালেব আলী মুক্তার দেখা করেন আমার ও রেজার সঙ্গে। বলেন, এসডিপিও সাহেব তোমাদেরকে চা খাওয়ার দাওয়াত করেছেন। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে কথা বলতে চান তিনি তোমাদের সঙ্গে। আমি, রেজা ও মহল্লার সেই বড়ভাই সেদিন সন্ধ্যায়ই হাজির হই এসডিপিও’র সামনে। তখন অফিসটি ছিল আলীমাবাগে- লোকজন যে বাড়িটিকে মিনিস্টার বাড়ি বলে চিনে। চা খেতে খেতে ওসি মহসিনের অনেক কুকীর্তি প্রকাশ করেন এসডিপিও আমাদের কাছে। এরমধ্যে একটি ধর্ষণের ঘটনা ও সে সময়কার ছাত্রনেতা মউজদীনের কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাটি ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব ব্যাপারে সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করেন তিনি। আমরা সানন্দে সম্মত্তি জানাই। এসডিপিও আমাদের হাতে তুলে দেন বড় একটা নথি। সে সময় সুনামগঞ্জে ফটোস্ট্যাট-এর কোন দোকান ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে নথিটি দিয়ে দেন আমাদের হাতে। বললেন, এটা বাসায় নিয়ে যা যা নোট করে রাখা দরকার করে নিন। সেই সঙ্গে তিনি জানান, আগামীকাল সুনামগঞ্জ থাকবেন না তিনি। তাই আগামীকাল সন্ধ্যায় নথিটি যেন তাঁর মায়ের হাতে দিয়ে যাই আমরা। আরেকটা কথা বললেন তিনি আমাদেরকে। দিন কয়েকের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ডিআইজি আসবেন ওসি মহসিনের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলো তদন্ত করতে। আমরা কয়েকজন ডিআইজি’র সঙ্গে দেখা করলে, ভাল ফল হবে। এসডিপিও’র এ প্রস্তাবেও সম্মতি জানাই আমরা। পরদিন আমরা এসডিপিও’র স্পিড বোট দিয়ে যাই ধর্ষিতা নারীর বাড়ি। সেখানে গিয়ে রেকর্ড করি ঐ নারীর বক্তব্য। ধর্ষিতা মহিলার বাড়িটি কোন গ্রামে ছিল তা এখন আর স্মরণ করতে পারছি না। শুধু মনে আছে, ধোপাখালি খাল দিয়ে গিয়েছিলাম আমি ও রেজা। এর কয়দিন পরই সুনামগঞ্জ সফরে আসেন চট্টগ্রামের ডিআইজি। আমরা কয়েকজন সাংবাদিক মাসুদুল, রেজা ও আমি সাক্ষাৎ করলাম ডিআইজি’র সঙ্গে। ওসি মহসিনের অনেক কলংকিত অপরাধচিত্রের সঙ্গে ছাত্রনেতা মউজদীনের ধরা খাওয়া অস্ত্রের নম্বর পর্যন্ত তুলে ধরা এবং তখনকার বিএনপি দলীয় এমপি দেওয়ান আবেদীন রাজার বদৌলতে মউজদীনের ছাড়া পাওয়ার কাহিনীসহ ওসি মহসিনের বিরুদ্ধ উঠা প্রতিটি অভিযোগ গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকেন ডিআইজি। ডিআইজি’র সঙ্গে থাকা এক অফিসার তা নোট করেন নিরলসভাবে। এক পর্যায়ে ডিআইজি প্রশ্ন করেন, মউজদীনের কাছ থেকে উদ্ধার করা অস্ত্রের নম্বর ও অন্যান্য অভিযোগের এত নিখুঁত তথ্য আপনারা পেলেন কিভাবে? জবাবে আমি বলেছিলাম, এটা তো দেখার বিষয় নয়, জরুরি হলো, অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা যাচাই করা। অনুর্ধ্ব ২০ বছর বয়সী ছেলেদের এমন দৃঢ় উত্তরে ডিআইজি যেন কিছুটা বিস্মৃত হলেন। মিনিটখানেক সময় চিন্তা করে তিনি বললেন, “আপনারা পত্রিকায় লিখেন। যে দিন পত্রিকায় এ নিউজ ছাপা হবে এর পরদিনই ওসি’র চাকরি থাকবে না।”
আমরা যখন ডিআইজি’র সঙ্গে কথা বলি তখন পুরাতন সার্কিট হাউজে উপস্থিত ছিলেন সমাজের নানা স্তরের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন। এরমধ্যে ছাত্রনেতা জগলুও একজন। হাছননগরের এক ধনাঢ্য ব্যক্তির শিশুপুত্রের সঙ্গে প্রতিবেশী এক ঠেলাচালকের শিশুনাতির মারামারিকে কেন্দ্র করে দায়েরকৃত মামলায় ঠেলাচালকের পরিবারের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে থানায় এনে অমানষিকভাবে নির্যাতন করেন ওসি মহসিন। এ ঘটনায় আলফাত মুক্তার সাহেব আর ছাত্রনেতা জগলুর নেতৃত্বে পরিচালিত মিছিল-মিটিংয়ে সুনামগঞ্জের রাস্তাঘাট ছিল প্রকম্পিত। বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিনই হতো মিছিল-মিটিং। আরেকটি কথা এখানে উল্লেখ প্রয়োজন। তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখার বিষয়ে আমাদের মত অল্প বয়সী সাংবাদিকদের ওপর সুনামগঞ্জের এসডিপিও সম্ভবত ততটা ভরসা করতে পারছিলেন না। কাতর কণ্ঠে অনুরোধ করে বলেছিলেন, “আমি তথ্য দিয়েছি তা ডিআইজি সাহেব জানতে পারলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে আমাকে।” ডিআইজি কত ক্ষমতাধর তার একটি উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, “আমার মত এসডিপিও’কে গাড়ির পেছনে রশি দিয়ে বেঁধে রাস্তা দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া ডিআইজি সাহেবের জন্য কোন ব্যাপারই না।” আমার দৃঢ় আশ্বাসে সেদিন আশ্বস্ত হয়েছিলেন এসডিপিও।
দু’এক দিনের মধ্যেই সংবাদটি পাঠালাম আমরা নিজ নিজ পত্রিকায়। আমার পত্রিকা গণকণ্ঠ তা ছাপেনি। বাজিমাত করে রেজার পত্রিকা ‘দৈনিক কিষাণ’। কিষাণ নিউজটি ছাপে পুরো এক পৃষ্ঠাজুড়ে।
২০০৪ সালের মহাবন্যায় আমার স্বযত্নে থাকা গুরুত্বপূর্ণ পেপার কাটিংয়ের খাতাটি ভেসে যাওয়ায় কিষাণে ছাপা নিউজের দিন তারিখ উল্লেখ করা গেল না এখানে। শুধু মনে আছে, কোন একটা মাসের ২৯ তারিখ দৈনিক কিষাণ বুকে ধারণ করেছিল ওসি মহসিনের ঘৃণিত অপরাধচিত্রগুলো। এর ঠিক ৩দিন পর সাময়িক বরখাস্ত হন অভিযুক্ত ওসি মহসিন।
সাময়িক বরখাস্ত থাকাবস্থায় ওসি মহসিন সিলেট পুলিশ লাইন এলাকায় “হার্ট টু হার্ট” নামে একটি রেস্টুরেন্ট দিয়েছিলেন। খাকি উর্দির অসীম ক্ষমতার ওসি’র চাকরিতে ফেরা আর কপালে জুটেনি তাঁর। এরপর তার জীবনে কি ঘটেছিল তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। তবে শুনেছিলাম, চাকরিহারা ওসি মহসিন শেষাবধি লন্ডন পাড়ি জমিয়েছিলেন।
রেজাকে নিয়ে লেখাটির আজ এখানেই ইতি টানছি। শারীরিক নানা সমস্যায় কাতর আমিও। সময় সুযোগ পাওয়া গেলে রেজাকে নিয়ে আরো কিছু লেখার চেষ্টা করব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী