শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:২০ অপরাহ্ন

Notice :

স্মরণে বরণীয় অধ্যাপক ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী

:: সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য্য ::
শৈশব স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে পাই অবিচ্ছেদ্য বিন্যস্ত জীবন যাপনের চিত্র যা মানসপটকে আনন্দ-বেদনার মিশ্রণে আনন্দিত-ভারাক্রান্ত করে তুলে। মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে ফিরে এক বাড়িতে একই পরিবারের মতো ছিল আমাদের জীবনযাপনের ধারা, সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়ায় ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়। সেখানে খুব কাছ থেকে দেখা মানুষ যিনি সম্পর্কে আমার বোনপো, বয়সে ছোট হওয়ার কারণে যাঁকে আমি/আমরা ‘মামা’ বলে ডাকতাম। তিনিই অধ্যাপক ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী।
সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠার সে দিনগুলোতে ফিরে গেলে কতশত স্মৃতি চোখের তারায় জ্বলজ্বল হয়ে সামনে আসে তার হিসেব নেই। কবিগুরুর জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী এ দুটো দিনের অনুষ্ঠানমালা দেখতে বসলে তাঁর অভাব অনুভব করি, অকালে ঝরে যাওয়ার কথা মনে হলে ব্যথাতুর মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে বারমাসই। অপার সম্ভাবনাময় এক উজ্জ্বল নক্ষত্র পরিবার তথা সমাজেও বিরল, বড়ো বেশি অনুভব করি তাঁর অনুপস্থিতি!

বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পরপরই বেতার বাংলা সিলেট থেকে প্রথম লাইভ প্রোগ্রামে গাওয়া গানটি ছিল “কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া”। আমরা সবাই পিনপতন নীরবতায় মধ্যের ঘরের সিঁড়িতে বসে রেডিও ঘিরে গান শুনেছিলাম মুগ্ধতা নিয়ে। পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা আঙিনায় চেয়ারে ও অনেকে ফ্লোরে বসেছিলো। কেবল বাসার নয়, পাড়ার লোকরাও এসেছিলো। তখনকার পারিপার্শ্বিকতায় বিরাট বাড়িটিতে একটি রেডিওকে ঘিরে গান শুনেছিলাম সবাই একসাথে হয়ে। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পরতাম। একটা অতৃপ্তি আমার মনে কাজ করছিল, শুনতে পেলাম কিন্তু দেখতে পেলাম না বলে। পরবর্তীতে টিভিতে গান ও সঞ্চালনা করেছিলেন অনেকবার বছরের পর বছর। কিন্তু প্রথম বেতারে ভেসে আসা গান শুনার দিনটি স্মরণীয় হয়ে আছে ভিন্নমাত্রা ও আমেজ নিয়ে! ছবিও আঁকতেন বিশেষ করে কবিগুরুর ছবি। সেখানেও স্মৃতিকাতরতা আছে বৈকি! পেছনে দাঁড়িয়ে মামার আঁকা কবিগুরুর ছবির পেন্সিল স্কেচ দেখছিলাম, মনপ্রাণ ঢেলে আঁকছিলেন। আঁকা শেষ করে নীচে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতের লেখার মতো করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখে ছবিটি দুহাতে ধরে দেখতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন আমরা দাঁড়িয়ে আছি। বললেন কি রে? বলেছিলাম আমরা অনেকক্ষণ তোমার আঁকা দেখছিলাম। গুরুগম্ভীর বিনয়ের সাথে বললেন ও! স্বল্পভাষী এক নীরব সাধক যাঁর মুখাবয়ব থেকে বিচ্ছুরিত হতো উজ্জ্বল দীপ্তি! সহাস্যে কথা বলার সাথে পানের রসে ভরা চেহারাটি জীবনেও ভুলার নয়!

১৯৭৫ সালের অক্টোবর/নভেম্বরে বাংলাদেশ সরকারের স্কলারশিপ পেয়ে তিনি বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, শান্তিনিকেতনে সংগীত বিষয়ে পড়ার জন্য দেশ ছেড়ে যান। ১৯৯৪ সালে পি.এইচডি ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরেন। তার আগে অনেকবার দেশে এসেছেন। আসার সময় সবার জন্য নিয়ে আসতেন উপহার। শান্তিনিকেতনের মৃৎশিল্পীদের তৈরি সুন্দর সুন্দর উপহার।
“আমরা কতিপয় তরুণ সাহিত্যসেবী” নামে সাহিত্য আড্ডা হতো আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতনে। শান্তিনিকেতন থেকে প্রথমবার আসার পর সেখানে এসেছিলেন। ‘কতবার ভেবেছিনু’, অনুরোধ রেখে শুনিয়েছিলেন। ১৯৭৭/১৯৭৮ সালে একঝাঁক গানের পাখি নিয়ে আসলেন সুনামগঞ্জে। যেক’দিন ছিলেন বাসাটাতে যেন শান্তিনিকেতনের হাওয়া বিরাজিত ছিল। ময়মনসিংহ গীতিকার অনবদ্য পালা “সোনাই মাধব” গীতিনাট্য পরিবেশিত হয়েছিল মঞ্চে। অসাধারণ নৃত্যশৈলীতে সোনাইয়ের চরিত্রে শুক্লা সরকার পালাগানের সাথে নৃত্য পরিবেশন করেন। পালাগানের শিল্পীরা ছিলেন শম্পা রেজা, সাদি মোহাম্মদ, তকিউল্লাহ, চয়ন ইসলাম, সাজিদ আকবর, মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে। অসাধারণ মনোমুগ্ধকর ময়মনসিংহ গীতিকার “সোনাই মাধব” পালা সুনামগঞ্জের মানুষের মনে এতটাই রেখাপাত করেছিল যা দীর্ঘসময় স্থায়ী ছিল। এমন অনন্য স্মৃতিসমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গীতিনাট্যটি অনুষ্ঠিত করার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ছিল মৃদুলকান্তি চক্রবর্তীর। তাঁর ব্যক্তি পরিচিতির জন্যই এত এত গুণীজনের একসাথে একটি প্রান্তিক শহরে আগমন ঘটেছিল। তাঁরা কয়েকদিন সুনামগঞ্জে ছিলেন, অনুষ্ঠানের রিহার্সেলের সময় পুরো বাড়িটা উৎসব মুখর হয়ে উঠতো।

২০১১ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরবেলায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমার স্বামী বাসায় ফেরার ১০/১২ মিনিট আগে শামু (মিহির চক্রবর্তী)র ফোন, বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, কি বলছিস? টিভির স্ক্রলে দেখো, দেখলাম। বাসায় আসলে দুজনে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের বাসায়। রত্নামাসীও এসেছে হবিগঞ্জ থেকে। হরিধনদাসহ আত্মীয়রা, ঘর ভর্তি মানুষ দীপকদাসহ ঢাকায় ওর বন্ধুরাও, শোকাহত সকলের দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে! আমাদের শহরের আলোকিত মানুষটিকে শেষ দেখা দেখতে সবাই মিলিত হয়েছিলাম সেদিন।

২০১৬ সালের জুলাই মাসে প্রথম ফেসবুকে যোগ দেই। বিভিন্ন সময়ে টুকে রাখা ছন্দবদ্ধ কিছু স্বরচিত অনুভূতি সেসময় ব্যক্ত করি। ১৫ই আগস্টে বঙ্গবন্ধুর প্রতি “শ্রদ্ধাঞ্জলি” নামে ও মৃদুলমামাকে উৎসর্গ করে “ধবল ফুলের সুবাস” নামে দুটো কবিতা প্রকাশ করেছিলাম যা ছিল ২০১১ সালের ব্যক্ত অনুভূতি :
ধবল ফুলের সুবাস (স্বরচিত)
অবিস্মরণীয় একরাত বৃষ্টিভেজা ঘুটঘুটে অন্ধকার
ফুলবাগানে রজনীগন্ধা বেলী দোলনচাঁপা টগরের বাহার
ধবল বর্ণের ফুলগুলি অন্তদৃষ্টিতে বিকশিত প্রাণবন্ত
বর্ষণে স্নাত ফুলের পাপড়ি বিন্দু বিন্দু জলে সিক্ত
কাঁচের টুকরোর স্ফটিকের মত ছিল স্বচ্ছ জীবন্ত
সুগন্ধ কেবলই সুগন্ধ ছড়িয়ে করেছে আপ্লুত।

শ্বেত-শুভ্র বসনে অন্তিম শয়ানে চলে গেলো যে বর্ষায় সিক্ত ধবল ফুলগুলির সুবাসে যেনো তাঁরই কণ্ঠ- নিঃসৃত সুর ফুল হয়ে সুবাস ছড়িয়ে চলেছে …

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুসংবাদে যেমন শ্রাবণের চোখের সাথে মানবের চোখের জল মিলেমিশে শোকাবহ পরিবেশে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিলো বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকাসহ বিশ্বব্যাপী, ঠিক তেমনি ২০১১ সালের ১৫ই আগস্ট একই রকম শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলো সুনামগঞ্জ, চিকিৎসায় অবহেলাজনিত কারণে তার সোনার সন্তানের অনাকাক্সিক্ষত অকাল প্রয়াণের মর্মান্তিক বার্তায়! অশ্রুসজল চোখে চিরদিনের মতো ধোপাখালি শ্মশানঘাটে তাঁর চিতা-ভস্ম সুরমার জলে বিলীন হয়ে গেলো – যার বুকে নৌকা ভ্রমণের সময় সাথীদের বাউল গানে মাত করে রাখতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ড. মৃদুলকান্তি চক্রবর্তী। নবম প্রয়াণ দিবসে প্রয়াত আত্মার শান্তি কামনা করে তাঁর স্মৃতির প্রতি রাখছি বিনম্র শ্রদ্ধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী