শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:১৮ অপরাহ্ন

Notice :

বসন্ত বিজয়, একটি রোগের মৃত্যু : সুখেন্দু সেন

বসন্তকালে প্রাদুর্ভাব হতো বলেই হয়তো মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগটি এদেশে ‘বসন্ত’ নামে পরিচিত ছিলো। গুটি বসন্ত। স্মল ফক্স। বিশ্বজুড়ে শতশত বছর ধরে লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণ সংহার হতো বসন্ত মহামারীতে। আমাদের দেশে কয়েক বছর আগেও এর প্রাদুর্ভাব ছিলো। সারা গায়ে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত ফোসকার মতো পুঁজ ভর্তি গুটি। অধিকাংশই মারা যেতো অসহ্য যন্ত্রণা ভোগে। ভাগ্য গুণে যারা বেঁচে থাকতো, কেউ দৃষ্টি হারাতো, কেউ শ্রবণ শক্তি। আর সারা শরীরে আজীবনের জন্য রয়ে যেতো গুটি গুটি ক্ষত চিহ্ন। এখনও সে ক্ষতধারী অনেক লোকের দেখা মেলে।
ভীষণ ছোঁয়াচে হওয়ায় তখনও কোয়রেন্টাইন মানা হতো। ছিলো প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা।নাম ‘বসন্ত ঘর’। শহরের প্রান্তে বনজঙ্গল ঘেরা নির্জন স্থানে একটি টিনের চৌচালা ঘরের অবস্থান ছিলো সুনামগঞ্জ শহরের বর্তমানে ষোলঘর স্টেডিয়াম নামে পরিচিত মাঠের উত্তর দিকটিতে। বসন্ত রোগীকে এই নির্জন ঘরে নিয়ে রেখে আসতো স্বজনরা। হয়তো খাবার-দাবারও কিছু দিয়ে আসতো। শুশ্রূষার জন্য ধারে কাছে কেউ থাকতো না। কোনো চিকিৎসক বা চিকিৎসাকর্মী দায়িত্বে থাকতেন কিনা জানা নেই। কারণ সে সময়ে মহকুমা সদর হাসপাতালে সাকুল্যে একজনই ডাক্তার আর দু’জন মাত্র কম্পাউন্ডার ছিলেন। তবে নিশ্চয়ই একজন মুর্দাফরাশ দূরত্ব বজায় রেখে অপেক্ষায় থাকতেন। অসহায়ভাবে জীবন শেষ হয়ে যেতো একাকী নির্জনে।
পূর্বপ্রজন্ম হয়তো প্রত্যক্ষ করে থাকতে পারেন কিন্তু আমাদের চোখে এখানে কোনো দিন কোনো রোগীর উপস্থিতি টের পাইনি। এমনকি ভয়ভয় খালি ঘরটির কাছে গিয়েও দেখা হয়নি। সম্ভবত ’৭১ সাল পর্যন্ত বসন্ত ঘরটির অস্তিত্ব ছিলো। কিন্তু ভয়াবহ রোগটির অস্তিত্ব এরপরও অনেক দিন ছিলো। সুনামগঞ্জের এক পরিচিত মুখ গৌরাঙ্গ আচার্য্য এ যুগের কিংবদন্তী চরক, সাক্ষাৎ শ্মশ্রুতের প্রতিরূপ হয়ে ভয়ানক ছোঁয়াচে রোগের চিকিৎসা দিতেন।কোন এক অলৌকিক শক্তি বলে রোগীর গা ঘেঁষে নিজ হস্তের শুশ্রূষায় সারিয়ে তুলতেন সংক্রামক ব্যাধিগ্রস্ত অনেককেই। শীত-গ্রীষ্ম ধুতির একপ্রান্ত খালিগায়ে জড়িয়ে রাখা গৌরা দা বলতেন- ‘মা শীতলার দয়া’।
সে গৌরাঙ্গ আচার্য আজ আর নেই। গুটিবসন্তও নেই। পৃথিবীর একমাত্র মহামারী যা নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। ১৭৯৬ সালে ড. এডওয়ার জেনার নামক এক বৃটিশ চিকিৎসক এ রোগের প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে প্রায় দুইশত বছর এ টিকার প্রচলন ছিলো।
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত গুটি বসন্ত জীবনঘাতি মহামারী রূপে বিশ্বজুড়ে ছিলো এক আতঙ্কের নাম। ১৯৬০ ও ৭০ এই দুই দশক পৃথিবী থেকে এ মহামারী নির্মূল করার অভিযান শুরু হয় জোরেশোরে। ১৯৬৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ড.ডি,এ এন্ডারসনকে গুটিবসন্ত নির্মূল অভিযানে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নিযুক্ত করে। তিনি সফল হন। মানবজাতি আবার যন্ত্রণাদায়ক এক মৃত্যু মহামারীর সঙ্গে লড়াইয়ে জয়ী হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৮০ সালে পৃথিবীকে গুটিবসন্ত মুক্ত বলে ঘোষণা দেয়। এখানেই শেষ নয়, গুটি বসন্তের জীবাণু যদি কেউ অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে, তা প্রতিরোধে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর বায়ো সিকিউরিটির মাধ্যমে বিশ কোটি টিকা তৈরী করে রাখেন।
স্মরণকালের ইতিহাসে ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ তিন বছরে আমাদের দেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১ লক্ষ ১৫ হাজার লোক গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলো। মারা যায় ৮৬ হাজার। স্বাধীনতার পরপর আবার এর সংক্রমণ দেখা দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় গুটিবসন্ত নির্মূলে ব্যাপক অভিযান শুরু হলে এর প্রশমন কমতে থাকে। গুটিবসন্ত রোগীর সংবাদ দিতে পারলে ৫০০টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়। শহরের রাস্তায় বসন্ত নির্মূলের কাজে ব্যবহৃত একটি গাড়ি ‘পাঁচশো টাকার গাড়ি’ নামে পরিচিত ছিলো। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ রোগীটি পাওয়া যায় এবং ১৯৭৭ সালে সরকারীভাবে বাংলাদেশকে গুটিবসন্ত মুক্ত ঘোষণা করা হয়।
বর্তমান বিশ্বের আতঙ্ক করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী অধ্যাপক সারা গিলবার্ট-এর নেতৃত্বে একটি প্রতিষেধক ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছেন এবং এর কার্যকারীতা পরীক্ষামূলকভাবে মানবদেহে প্রয়োগও সম্পন্ন হয়েছে। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী এ ভ্যাকসিন ফলদায়ক হবে। আতঙ্কগ্রস্ত বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে সে শুভক্ষণটির প্রতীক্ষায়- কখন করাল করোনার বিরুদ্ধে মানবজাতির বিজয় ঘোষিত হবে। ঘটবে কোভিড ১৯ নামের আরেকটি রোগের মৃত্যু। রোধ হবে মহামারী, থামবে হাহাকার। ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা সতর্ক থাকি, সচেতন থাকি, জনসংস্পর্শ এড়িয়ে চলি, যা এখন পর্যন্ত কার্যকর প্রতিরোধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী