শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:২৫ অপরাহ্ন

Notice :

কাটলে হাওরের ধান মিলবে ত্রাণ : মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ

করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী এক সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্বের ৩ কোটি মানুষ এই সংকটে খাদ্যাভাবে মৃত্যুবরণ করতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে অনেক পূর্বেই এ বিষয়ে অনুধাবন করতে পেরে দেশবাসীর উদ্দেশে প্রদত্ত ৩১ দফা বক্তব্যের মধ্যে তিনি দেশের প্রতি ইঞ্চি জমিতে খাদ্যশস্য, সবজি এবং ফলমূল আবাদের বিষয়ে সবাইকে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। দেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে সুনামগঞ্জ জেলার উৎপাদিত ধানের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী সম্যক অবগত আছেন এবং তার সুচিন্তিত নির্দেশনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে যে কোনো রকম সম্ভাব্য দুর্যোগের পূর্বেই নিরাপদে ধান ঘরে তোলার জন্য সরকার তৎপর রয়েছে।
চলমান ২০১৯-২০ অর্থবছরে সুনামগঞ্জের হাওর ও হাওরবহির্ভূত প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১২ লাখ টন, যা সুনামগঞ্জের চাহিদা মিটিয়েও সারাদেশের খাদ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হবে।
২৬-৩০ এপ্রিল তারিখে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আগাম বন্যা পূর্বাভাসের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার অতিজরুরি ভিত্তিতে হাওরে পেকে যাওয়া সব ধান ঘরে তোলার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছে জেলা প্রশাসন। বিভাগীয় কমিশনার সিলেট বিভাগ, সিলেট নিজে সুনামগঞ্জ জেলার কর্মকর্তাদের নিয়ে সুনামগঞ্জে মাঠপর্যায়ে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার হাওরগুলোর ধান কাটার কাজ তত্ত্বাবধান করেন এবং সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কাটার কার্যক্রম সম্পর্কে সবার সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি ধান কাটা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জেলার সবাইকে নিয়ে একটি নির্দেশনামূলক সভা করেন এবং বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের খাদ্য চাহিদা জোগানে সুনামগঞ্জের ধানের গুরুত্ব বিষয়ে সব উপলব্ধি করান। সুনামগঞ্জের প্রতিটি হাওরের ফসল নিরাপদে কৃষকের ঘরে তুলে দেয়াকে তিনি বর্তমান প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বিবেচনা করে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে মাঠে যাওয়ার অনুরোধ জানান।
জেলার আনসার, কর্মক্ষম ছাত্র-শিক্ষক, পরিবহন শ্রমিক, মৎস্যজীবী, বারকি শ্রমিক, পাথর-বালুমহাল শ্রমিক, রেস্টুরেন্ট-হোটেল শ্রমিক, কলকারখানার কর্মহীন শ্রমজীবীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে সুনামগঞ্জ জেলায় প্রত্যাগত বিশাল জনসমষ্টি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধান কাটার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ফলে ৬ দিনের মাঝে ধান কাটা, মাড়াই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের শ্রমিকের সংখ্যা ৩০৫৯২ হতে বৃদ্ধি পেয়ে ৯৪৪৫৬-এ উন্নীত হয়েছে।
সুনামগঞ্জের ধান দ্রুত কাটার সমস্যা সমাধানে গত ৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃক প্রদত্ত ৪০টি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারসহ মোট ১১০টি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার ও ১১৮টি রিপার মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। পরিকল্পনামন্ত্রী, জেলার সংসদ সদস্যগণ এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ধান কাটার কাজ তত্ত্বাবধান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সুনামগঞ্জের হাওরে প্রায় ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৪৫টি পিআইসির মাধ্যমে নির্মিত ৬৩৩ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ এবং ১৩৫টি ক্লোজার সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং তত্ত্বাবধানের মধ্যে রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরাসরি মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাদের সব অসুবিধা সমাধান করছেন। নিরাপদে ধান উত্তোলনে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ‘কাটলে হাওরের ধান, মিলবে ত্রাণ’ শিরোনামে কৃষকদের মাঝে বরাদ্দকৃত ৯০ টন খাদ্য সহায়তা, ১২ হাজারের অধিক হাত ধোয়ার সাবান, গামছা, মাস্ক, খাদ্যদ্রব্য, ১৫ হাজারের অধিক ধান কাটার কাঁচি বিতরণ করছেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। অন্যান্য জেলা হতে আগত কৃষি শ্রমিকদের যাতায়াত ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়ে সারাদেশের প্রশাসন, পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগ একযোগে কাজ করছে। হাওরে ধান কাটার জন্য আগত বিভিন্ন জেলার কৃষি শ্রমিকদের থাকার জন্য হাওরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়া হয়েছে এবং তাদের জন্য খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়া ধান কাটার কাজ তদারকি করছেন সব সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা।
আশা করা যায়, এসব সমন্বিত উদ্যোগের ফলে হাওরের ফসল সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা জয় করে কৃষকের ঘরে তুলে দেয়ার পাশাপাশি দেশের খাদ্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে কৃষকের ধান ন্যায্য মূল্যে বিক্রির লক্ষ্যে এ জেলার মিল-মালিক ও ধান ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে এবং খাদ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ জেলার প্রাপ্ত ২৫ হাজার ৮৬৬ টন ধান সরাসরি কৃষকের কাছে থেকে নির্ধারিত মূল্যে কেনার লক্ষ্যে সব পর্যায়ে স্বচ্ছ তালিকা তৈরির কার্যক্রম চলমান। যাতে কোনো ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগী মহল কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। প্রকৃতি অনুকূল থাকলে সবার অক্লান্ত ও সমন্বিত উদ্যোগে এ বছর সময়মতো নিরাপদে ধান নিরাপদে কৃষকের ঘরে তুলে দেয়া সম্ভব হবে বলে সুনামগঞ্জের আপামর জনগণ আশাবাদী।
[মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ : জেলা প্রশাসক, সুনামগঞ্জ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী