শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:০১ অপরাহ্ন

Notice :

হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কেটে ঘরে তোলা জরুরি

:: আবদুল লতিফ মন্ডল ::
করোনাভাইরাসের কারণে দেশব্যাপী সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বাইরের জেলাগুলো থেকে শ্রমিক আসতে না পারায় শ্রমিক সংকটের জন্য হাওরাঞ্চলে পাকা বোরো ধান কাটা নিয়ে বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। মাঠে পাকা ধান। রয়েছে আগাম বন্যার ভয়। তাই দুশ্চিন্তায় ঘুম নেই কৃষকের চোখে (যুগান্তর, ২ এপ্রিল)। যদিও হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ইতিহাস রয়েছে, তথাপি ২০১৭ সালের মার্চের অকাল বন্যায় বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি এ অঞ্চলের মানুষের মনে যে প্রবল ভীতি সৃষ্টি করেছে, তা এখনও তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
দেশের হাওরাঞ্চলে যে কোনো মুহূর্তে বন্যা শুরু হতে পারে। করোনায় সৃষ্ট শ্রমিক সংকটের কারণে সরকারি উদ্যোগে হারভেস্টার মেশিনের সাহায্যে জরুরি ভিত্তিতে ধান কেটে কৃষকের ঘরে তোলা কেন প্রয়োজন, তা আলোচনা করাই এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বেশ কয়েকবার দেশের হাওরাঞ্চলে অবস্থিত ৭টি জেলা- সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজারে আকস্মিক বন্যা সংঘটিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে ২০০০, ২০০২, ২০০৪, ২০১০, ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের আকস্মিক বন্যার উল্লেখ রয়েছে। ২০১৭ সাল ছাড়া অন্যসব বছরে আকস্মিক বন্যা হয়েছে এপ্রিল মাসে। ২০১৭ সালে আগাম বন্যা হয়েছে মার্চ মাসে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় হাওরাঞ্চলে এসব আকস্মিক বন্যার যেসব কারণ চিহ্নিত করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. হাওরের পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা; খ. ধানচাষী ও মাছ উৎপাদনকারীদের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দ্বন্দ্ব; গ. সঠিক সময়ে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত না হওয়া; ঘ. সুশাসন সম্পর্কিত সমস্যা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর তাদের এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বোরো ধানসহ অন্যান্য রবি ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এতে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে দেশে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি ৪ লাখ ৩৬ হাজার টন।
সারা দেশে ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, যার প্রায় ২৩ শতাংশ উল্লিখিত ৭টি জেলার হাওরাঞ্চলে অবস্থিত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রের বরাত দিয়ে ৭ এপ্রিল একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- হাওরাঞ্চলের ৭ জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ১০১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে।
চাল উৎপাদনে দেশ বর্তমানে স্বনির্ভরতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হলেও তা বাহ্যিক আঘাত (external shock) সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। এর উদাহরণ দিতে বেশি দূর যেতে হবে না। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মার্চ মাসে অকাল বন্যায় সিলেটের হাওরাঞ্চলে বোরোর উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাবে এ ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ১০ লাখ টন, যদিও বেসরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১৫ থেকে ২০ লাখ টন।
সরকারের বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার (১ কোটি ৯১ লাখ টন) বিপরীতে উৎপাদন ১০ লাখ টন কমে যাওয়ায় এবং চাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কহারের (২৮ শতাংশ) কারণে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চাল আমদানির পরিমাণ পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় (ওই অর্থবছরে শুধু বেসরকারি খাতে ১ লাখ ৩৩ হাজার টন চাল আমদানি করা হয়) ২০১৭-১৮ অর্থবছরের শুরুতে দেশের কমবেশি ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকায় পৌঁছায়, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে ফেলে। মাঝারি ও চিকন চালের দাম ছিল আরও অনেক বেশি।
চালের ঘাটতি মেটাতে এবং দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকার বেসরকারি খাতে চাল আমদানি উৎসাহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। চাল আমদানির ওপর পুরো শুল্ক (২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক এবং ৩ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি) রহিত করা হয়। তাছাড়া, সরকারি খাতেও ১৫ লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখছে। সংস্থাটি এজন্য একাধিকবার সতর্কবার্তা জারি করেছে। অতিসম্প্রতি জারিকৃত সতর্কবার্তায় সংস্থাটি বলেছে, করোনাভাইরাস মহামারীর প্রকোপে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
এ অবস্থায় বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে অনেক দেশে ভোক্তারা খাদ্যপণ্যের সরবরাহ সংকটে পড়েছেন। এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ভোক্তারা ঝুঁকেছেন অতিরিক্ত খাবার ক্রয়ে, যা তারা আপৎকালের জন্য মজুদ করছেন। অন্যদিকে মহামারীর মধ্যে জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহের তাগিদে খাদ্যপণ্য রফতানি বন্ধ করার পরিকল্পনা করেছে বিভিন্ন দেশ। একই পথে হাঁটছে এশিয়ার শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশগুলোও। ফলে এ অঞ্চল থেকে খাদ্যপণ্যটির রফতানি হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক দেশ চরম খাদ্য সংকটে পড়বে।
এদিকে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে চীনের মধ্যবর্তী পণ্য রফতানি দুই শতাংশ কমলে যে ৩৫টি দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশ তার একটি।
করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্প খাত, কাঠ ও আসবাব শিল্প এবং চামড়াশিল্পে ক্ষতির আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের অর্থনীতি শ্লথ হওয়ায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে চামড়াশিল্পে। এ শিল্পে ১৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বস্ত্র ও আসবাবপত্র শিল্পে এক মিলিয়ন ডলার করে ক্ষতি হতে পারে।
তৃতীয়ত, গম আমাদের দ্বিতীয় প্রধান খাদ্যশস্য। মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চালের, বিশেষ করে মাঝারি ও চিকন চালের তুলনায় গমের আটার দাম অনেক কম হওয়ায় শহরাঞ্চলের মানুষের মধ্যে গমের আটার ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এ খাদ্য পণ্যটির জন্য বলতে গেলে আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি।
পণ্যটির বার্ষিক প্রয়োজন কমবেশি ৭০ লাখ টন। আর দেশে উৎপাদনের পরিমাণ ১২ থেকে ১৩ লাখ টন। অর্থাৎ বছরে আমাদের কমবেশি ৬০ লাখ টন গম আমদানি করতে হয় এবং এতে ব্যয় হয় প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা। এফএও’র সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের কারণে খাদ্যশস্য চাল ও গম রফতানিকারক দেশগুলো সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় পণ্য দুটির আমদানি-রফতানিতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
কাজাখস্তান ইতিমধ্যেই গমের আটা রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে এবং শাকসবজি রফতানির ওপর সীমা আরোপ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গম রফতানিকারক রাশিয়া পণ্যটির রফতানিতে সীমা আরোপ করতে পারে।
বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে ২৩ মার্চ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি খাতে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার টন গম আমদানি করেছে বলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়। কমপক্ষে আরও ৭ লাখ টন গম আমদানির ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হোক। বৈশ্বিক চাল রফতানিতে শীর্ষ দেশ ভারত এরই মধ্যে তিন সপ্তাহের লকডাউনে চলে গেছে। ফলে ভারত থেকে পণ্যটির সরবরাহ চ্যানেল এখন থমকে দাঁড়িয়েছে।
ভিয়েতনাম চাল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। একই পথে হাঁটতে পারে থাইল্যান্ডও। রফতানি সীমাবদ্ধতার কারণে বাড়ছে চালের দাম। উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৮ সালের খাদ্য সংকটের কালে চালের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছিল টনপ্রতি ১ হাজার ডলারের কাছাকাছি। সে সময় রফতানিতে সীমা আরোপ এবং আতঙ্কে ক্রয়প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল পণ্যটির মূল্য। তাই স্বল্প পরিমাণে চাল আমদানির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হোক।
বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের কারণে খাদ্য রফতানিকারক দেশগুলোর খাদ্যপণ্য রফতানিতে রক্ষণাত্মক মনোভাবের কারণে কমপক্ষে আগামী ছয় থেকে নয় মাসের জন্য খাদ্যপণ্যের সন্তোষজনক মজুদ গড়ে তোলার জন্য সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
সবশেষে বলতে চাই, হাওরাঞ্চলে যে কোনো মুহূর্তে বন্যা সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় সেখানকার উৎপাদিত ধান কেটে কৃষকের ঘরে তোলার ওপর সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা চাই না, বন্যার কারণে সেখানকার এক কেজি ধান বা চাল নষ্ট হোক।
করোনাভাইরাসের কারণে হাওরাঞ্চলে ধান কাটা শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়ায় হারভেস্টার মেশিনের সাহায্যে সমস্যাটির সমাধান করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। স্মর্তব্য, অর্থমন্ত্রী তার ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে হারভেস্টিং মেশিনারি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতদূর?
[আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী