বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:১০ পূর্বাহ্ন

Notice :

বাঁধের অনিয়মের প্রতিবাদে চার কৃষকের অনশন

বিশেষ প্রতিনিধি ::
দোয়ারাবাজার উপজেলার নাইন্দার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদে অনশন করেছেন হাওরপাড়ের চার কৃষক। মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনশনে বসেন তারা।
অনশনে বসা চারজন কৃষক হলেন দোয়ারাবাজার মাঝেরগাঁও গ্রামের আব্দুল জলিল (৬০), আব্দুন নূর (৭০), আব্দুর রউফ (৫০) ও বড়বন্দ গ্রামের আব্দুল জলিল (৬০)। উপজেলার নাইন্দার হাওরে তাদের বোরো জমি রয়েছে।
বিকেল ৪টায় আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু ও সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়-সহ সংগঠনটির নেতারা চার কৃষককে শরবত পান করিয়ে অনশন ভাঙান।
অনশনকারী কৃষকদের দাবি, নাইন্দার হাওরের ১৩০০ হেক্টর জমির বোরো জমির বোরো ফসলরক্ষার জন্য সরকার পৌনে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ১৭টি প্রকল্পের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণের কাজ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসন। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যানের ছত্রছায়ায় ১২টি প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করে বরাদ্দের টাকা লুটপাট করে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এমন পরিস্থিতিতে আগাম বন্যা হলে হাওরের বোরো ফসল পানি নিচের তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে অনশনের পথ বেছে নিয়েছেন তারা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী বলেন, চারজন কৃষকের দাবির সাথে আমাদের সংগঠন সম্পূর্ণরূপে একমত। আমরা চাই নাইন্দার হাওরসহ জেলার প্রতিটি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ যেন যথাযথ নিময় মেনে করা হয়।
তিনি আরো বলেন, বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে যারা অনিয়ম-দুর্নীতি করছেন তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় কৃষকের ফসলরক্ষা করা সম্ভব নয়।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ফসলরক্ষা বাঁধের কাজে অনিয়ম থামছে না। এ ব্যাপারে প্রতিবাদ করেও প্রতিকার মিলছে না। এবার ফসলহানি হলে এর দায় পাউবো ও প্রশাসনকে নিতে হবে।
এদিকে, নাইন্দার হাওরের ১২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি কর্তৃক (পিআইসি) বাঁধ নির্মাণে নীতিমালা তোয়াক্কা না করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আনেন অনশনকারীদের মধ্যে অন্যতম মাঝেরগাঁও গ্রামের কৃষক আব্দুল জলিল। গোড়া থেকে মাটি তুলে বাঁধ নির্মাণ, দায়সারাভাবে কাজ সম্পাদন, পুরোনো বাঁধের উপরের ঘাস তুলে নতুন বাঁধ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে আপন দুই ভাই এবং হাওরে জমি নেই এমন ব্যক্তিকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এনে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে পৃথক তিনটি দরখাস্ত দিয়েছিলেন তিনি।
উল্লেখ্য, নাইন্দার হাওরে চলতি বোরো মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী হাওরটির ফসলরক্ষার জন্য ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিকে (পিআইসি) মাধ্যমে ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ, মেরামত ও ভাঙা বন্ধকরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ১৭টি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ কোটি ৬৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, উপরোক্ত ১২টি পিআইসিতে প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করে দায়সারাভাবে বাঁধ নির্মাণ করে সরকারি বরাদ্দের মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাতের পাঁয়তারা করছেন। নীতিমালা অমান্য করে বাঁধের গোড়া থেকে মাটি উত্তলন করে বাঁধের নির্মাণ কাজ করছেন তারা। যে কারণে বৃষ্টি শুরু হলে ফসলরক্ষার জন্য নির্মিত বাঁধগুলোতে ধ্বস দেখা দিবে। এতে করে কৃষকের ফসল বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
অভিযোগে আরো বলা হয়, পুরোনো বাঁধের যে অংশগুলো অক্ষত রয়েছে সেগুলো থেকে কোদাল দিয়ে উপরের ঘাস তুলা হচ্ছে, যাতে দেখলে বুঝা যায় ওই স্থানে নতুন করে মাটি ফেলে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। সেইসাথে প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করে একই পরিবারের দুই ভাইকে পৃথক পিআইসির সভাপতি করা হয়েছে।
অভিযোগ থেকে জানাযায়, নীতিমালা অনুযায়ী হাওরে জমি আছে এমন কৃষকদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও নাইন্দার হাওরের ৪, ৫, ৬ এবং ৮ নং পিআইসির সভাপতিদের ওই হাওরে নিজস্ব কোন জায়গাজমি নেই।
উল্লেখিত অনিয়মগুলো সরেজমিন তদন্তপূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট অনুরোধ জানিয়েছেন দরখাস্তকারী হাজী আব্দুল জলিল।
অভিযোগকারী জানান, বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত অভিযোগ দেওয়ার ১৩ দিন পার হয়ে গেলেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য জানতে কর্তৃপক্ষ যোগাযোগও করেননি।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, আমরা তাদের দেওয়া অভিযোগপত্রটি দেখে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী