রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:৪২ পূর্বাহ্ন

Notice :

বাঁধের কাজে ফাঁকি চলছেই

বাদল কৃষ্ণ দাস ::
হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময়সীমা শেষ হয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। তবে শতভাগ বাঁধের কাজ সমাপ্ত করতে পারেনি কোনো পিআইসি। স্থানে স্থানে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রাথমিক প্রাক্কলন সময় থেকেই পিআইসি চূড়ান্তকরণ ও প্রয়োজনের অধিক অর্থ বরাদ্দ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মধ্য দিয়েই বাঁধের কাজে বেঁধে দেওয়া সময়সীমা অতিক্রম হয়েছে। অধিকাংশে সমালোচিত ও বিতর্কিত পিআইসি নিয়েও শতভাগ কাজ অদ্যাবধি শেষ করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। হাওরবাঁধ নির্মাণখাতে এবছরও ভৌগোলিক অবস্থান অনুপাতে জেলার সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দুর্গম শাল্লা উপজেলা এলাকায়। এবছর এই উপজেলায় স্থানীয় নামের ৭টি হাওরে ১৩৭টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। আর এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ২৪ কোটি টাকা।
হাওরগুলোতে বাঁধ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় বরাম হাওরে ১৬টি, ভান্ডা বিল হাওরে ১৬টি, উদগল হাওরে ৯টি, ভেড়াডহর হাওরে ১৪টি, কুশিয়ারা ডান তীরে ৩টি, কালিকোটা হাওরে ২৭টি এবং ছায়ার হাওরে সর্বাধিক ৫২টি প্রকল্প। আর এসব হাওরের অভ্যন্তরে রয়েছে স্থানীয় দারাইন নদী।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, এই দারাইন নদী শুরু হয়েছে দিরাই উপজেলার ধল কালিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন স্থান থেকে। ধল বাজারের কালিগঞ্জ অংশের ৩/৪ কি.মি. পরেই সেটি দারাইন নদী নাম ধারণ করে দিরাইয়ের আংশিক ভেতর দিয়ে চলে গিয়ে শাল্লা উপজেলার পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে প্রায় ১০কি.মি.জুড়ে পরিচিত রয়েছে। এরপর মাঝখানে গ্রামশাল্লা হয়ে প্রায় ৬কি.মি. গুদি নদী নামে পরিচিত হয়ে বাকিটুকু চামতি নামে প্রায় ২০কি.মি. বয়ে চলে গেছে। তবে এই ৪০ কি.মি. নদী প্রবাহের মধ্যে দারাইন নামীয় অংশের প্রভাবই বেশি। কারণ দারাইন নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে মরানদীতে পরিণত হওয়ায় বৈশাখী অতিবর্ষণের প্লাবিত জলরাশি নদীর দু-তীরকে প্লাবিত করার ঝুঁকিতে রাখে। এই দারাইন নদীকে ঘিরেই এসব বাঁধ প্রকল্প দেওয়া হয়েছে।
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি শাল্লা উপজেলার বিভিন্ন হাওরবাঁধে সরেজমিন গিয়ে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। এসব প্রকল্পের ২০ থেকে ৩০ভাগ, কোনটি ৩০ থেকে ৪০ভাগ, আবার কোনটি ৫০ থেকে ৬০ভাগ স¤পন্ন হয়েছে এরকম দেখা গেছে। তবে পিআইসিরা তাদের কাজ প্রায় ৮০ভাগ স¤পন্ন করেছেন বলে দাবি করে আসছেন। যদিও বাস্তবে পিআইসির কথায়-কাজে কোন মিল নেই।
বাঁধগুলোর অভ্যন্তরে রয়েছে পিআইসির প্রতারণা ও শুভঙ্করের বিস্তর ফাঁকফোকড়। বরাদ্দের একটা মোটা অংশ লোপাট করতেই কৌশলে পুরনো বাঁধের উপরিভাগ লেভেল না করেই ঘাসবনের উপর নতুন মাটিচাপা দিয়ে বাঁধের দায়সারা কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন পিআইসিরা।
ভান্ডাবিল হাওরে দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নে ৩৩(ক) প্রকল্প থেকে পশ্চিমমুখী শাল্লা উপজেলার ১৮নং প্রকল্প উঁচু কান্দার উপর দিয়ে পুরনো রাস্তার উপর দিয়ে উপরিভাগ আংশিক ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও দিরাই তাড়ল ৩৩(ক) প্রকল্পের লাগোয়া দারাইন নদীর উত্তরপাড়ে সরালিটোপা গ্রামের নতুন উত্তরপাড়ায় দিরাই অংশের বরাম হাওরের বেশ কয়েকটি প্রকল্পে সবেমাত্র কাজ শুরু করেছেন পিআইসিরা। গত বছরের নির্মিত এসব বাঁধে গেল বর্ষার পানিতে প্রায় ২০ভাগ ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে, এরকম দেখা গেছে। কিন্তু এসব বাঁধ পুনঃনির্মাণে প্রয়োজনের অধিক বরাদ্দ ধরা হয়েছে। বরাম হাওরের এসব প্রকল্পের লাগোয়া পশ্চিমদিকে শাল্লা উপজেলার ১নং পিআইসির প্রকল্প থেকে ১১নং প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, দারাইন নদীর খাড়াতীর ঘেঁষে বেশ কয়েকটি বাঁধ প্রকল্প বালিযুক্ত মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। গত বছরের নির্মিত এই সবকটি বাঁধেও গেল বর্ষার পানিতে বড়জোর ২০ভাগ ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে। তাই এসব বাঁধে কোথাও একফুট, কোথাও দেড় ফুট থেকে দুই ফুট মাটি ভরাট করেই ঘাসে ভরা বাঁধের প্রস্থ উচ্চতা ঢাল ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এদিকে দারাইন নদীর পশ্চিমপাড়ি ১৮ থেকে ২০ নং প্রকল্প ঘুরে বিস্তর অনিয়ম দেখা গেছে।
নীতিমালা অনুসরণ না করেই মাটি ফেলে বাঁধের উপরিভাগ ঢেকে ড্রেসিং করা হচ্ছে। দুরমুজ দেওয়ার কোন আলামতই পাওয়া যায়নি কোন প্রকল্পেই। স্থানীয় লোকজন বলছেন, ভারী বর্ষণে এসব বাঁধের উপরিভাগ ধ্বসে পড়তে পারে। তাছাড়া বরাম হাওর, ভান্ডা হাওর, উদগল হাওর, ভেড়াডহর, ছায়ার হাওর, কালিকোটা হাওর, সবকটিতে বেশ কয়েকটি প্রকল্প ঘুরে শুভঙ্করের ফাঁকির একই চিত্র দেখা গেছে। এসব বাঁধে গেল বছরের ৭০ থেকে ৮০ভাগ মাটিই বহাল রয়ে গেছে। তাই এবছর দেড় ফুট থেকে দুই ফুট মাটি ভরাটেই বাঁধের কাজ সেরে নিচ্ছেন পিআইসিরা। আর এতে অপচয় হচ্ছে বরাদ্দের লাখ লাখ টাকা। মোটাদাগে লাভবান হচ্ছেন পিআইসির লোকজন। স্থানীয় কৃষকদের অভিমত এবছর নতুন করে প্রয়োজনের অধিক বরাদ্দ না দিলেও চলতো।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন শাল্লা উপজেলার সভাপতি এবং শাল্লা সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক তরুণ কান্তি দাস বলেন, বাঁধের কাজের সময়সীমা শেষ, অথচ অগ্রগতি খুবই হতাশাজনক। তাছাড়া কাজের মানও সন্তোষজনক মনে হচ্ছে না। আমি বেশ কিছু বাঁধে গিয়েছি। কোথাও কোথাও প্রয়োজনের অধিক বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে। বাঁধের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে এবং টেকসই কাজ আদায়ে প্রকল্পগুলোতে এলাকাবাসীর সচেতনতা, ট্যাগ অফিসারসহ সংশ্লিষ্টদের ঘন ঘন মনিটরিং জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তাছাড়া ভরাট হয়ে যাওয়া নদীখননেরও দাবী জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী