শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:৪৮ অপরাহ্ন

Notice :

নকশীপণ্যে ঐতিহ্যের হারানো রূপ

শামস শামীম ::
নকশীশিল্পের নাম শুনলেই আমাদের বাংলার ঐতিহ্যের একটি নান্দনিক রূপ চোখে ধরা দেয়। হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস-ঐতিহ্য যদি এই শিল্পে আরো মূর্ত করে তোলা হয় তাহলে তো হাইটেক যুগের নতুন প্রজন্মও নিজেদের ঐতিহ্য জানার সুযোগ পায়। সুনামগঞ্জ শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি চলা নকশীশিল্প প্রদর্শনী ও মেলায় সুই-সুতোয় কাপড়ে বোনার নান্দনিক নানা রূপ মুগ্ধ করেছে অনেককে। তবে আশানুরূপ বিক্রি না হওয়ায় নকশীশিল্পীদের মধ্যে হতাশা ছিল। ঐতিহ্যের পরিশ্রমী এই শিল্পপণ্যের বাজারজাতে সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারা।
নদী, পালতোলা নাও, মাঝি, বৃক্ষের বিস্তার, পালকি, বেয়ারা, বর-বধূ, ফুল, ফল, মাছ, পশু, পাখি, কৃষক, হালচাষ, গাড়িয়ালসহ গরুর গাড়ি, গ্রামবাংলার প্রকৃতি অনবদ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কাপড়ের খ- খ- ক্যানভাসে। বেডশিট, বালিশের কাভার, সোফার কুশন, ওয়ালমেট, পার্স, ভ্যানিটি ব্যাগ, ব্যাগ, নকশীকাঁথা এবং জামাসহ অন্যান্য পণ্যগুলোও সুই-সুতোর কারুকাজে ঝলমলে ছিল। বিভিন্ন রঙের কাপড়ে নকশীশিল্পীদের দরদী হাতের এ যেন এক জীবন্ত রূপ। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন। রুচিশীল ক্রেতাদের মধ্যে অনেকেই সাধ্য অনুযায়ী এসব পণ্য সংগ্রহ করতেও দেখা গেছে।
নকশীশিল্প প্রদর্শনী ও মেলাটি ইউনেস্কো-বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প থেকে আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এফ্যারটস ফর রুরাল এডভ্যান্সমেন্ট (ইরা)। ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের এই প্রকল্পটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। শেষের আগে আয়োজক কর্তৃপক্ষ এই মেলার মাধ্যমে দর্শক ক্রেতাদের সামনে উপস্থাপনের পাশাপাশি সুনামগঞ্জ ও জামালপুরের নকশীশিল্পীদেরও কাছে আনার সুযোগ করে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই প্রকল্পের অধীনে নকশীর জন্য সারাদেশের বিখ্যাত জামালপুর জেলার নকশীশিল্পীদের দিয়ে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার অত্যন্ত অর্ধ শতাধিক নকশীশিল্পীকে কয়েক দফা ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত আগ্রহে জানা এই প্রশিক্ষণ কাগজে-কলমে পেয়ে উপকৃত হয়েছেন এখানকার নকশীশিল্পীরা। প্রশিক্ষণের পরই তাদের শিল্পকর্ম অনন্য রূপ পায় বলে জানান আয়োজকরা।
মেলায় সুদূর জামালপুর থেকে ৫টি স্টল নিয়ে এসেছিলেন অন্তত ২০ জন নকশীশিল্পী। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে এই পেশায় জড়িত। একসময় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না। এখন কিছুটা পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তাদের আরো আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে এখনো এর প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি না হওয়ায় আক্ষেপও আছে তাদের।
জামালপুরের নকশীশিল্পী চাঁনভানু বেগম দীর্ঘদিন ধরে নকশী বুনছেন। তিনি নকশী বোনার কাজের পাশাপাশি এই বিষয়ে প্রশিক্ষণও প্রদান করেন এখন। নিজের মেয়েসহ অন্য নারী নকশীশিল্পীদের নিয়ে এসেছিলেন তিনি সুনামগঞ্জে। তাদের কাজগুলো মেলায় আসা ক্রেতা-দর্শনাথীদের দৃষ্টি কেড়েছে। তিনি জানান, নকশীশিল্প বাংলার ঐতিহ্য। মানুষের মনে দাগ কাটে এই শিল্প। কিন্তু বাজারজাত ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে শিল্পীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাজারজাত ও প্রসারে তিনি সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ ও সচেতনতার আহ্বান জানান।
সুনামগঞ্জের নকশীশিল্পী পারুল বেগম, সোমা আক্তার, নুরেকা বেগম, মিতালী দাস, রুবিনা ইসলাম ঋতু নিভৃতে এই কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরে। নানা মাধ্যমে তাদের নিখুঁত কাজগুলো দেখে মনে হয় হাতে বোনা নয়, ছাপার ঝলমলে রূপ। তাদের স্টলে গিয়ে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ।
খালেদা আক্তার কল্পনা বলেন, আমি অনেক আগ থেকেই নকশী বিষয়ে কিছুটা জানতাম। কিছুদিন জামালপুরের শিল্পীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ পাবার পর আমার আগ্রহ বেড়েছে। আমাদের কাজে পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, পরিশ্রমী এই কাজ মানুষের মনে দোলা দিলেও ক্রেতা কম। সামাজিক, পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এ ধরনের শিল্পপণ্য উপহার দিলে এর একটা গ্রহণযোগ্য বাজার তৈরি হতো এবং শিল্পীরা উপকৃত হতেন। তিনি বলেন, ইরা’র কল্যাণে আমি প্রশিক্ষণ পেয়ে এখন এই শিল্পের ডিজাইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।
ইরা’র নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এক বছরের এই প্রকল্পে আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। আমাদের হাওর জেলা সুনামগঞ্জ ও বিখ্যাত নকশীশিল্পের জেলা জামালপুরের শিল্পীদের সঙ্গে একটা যোগাযোগ স্থাপন করা গেছে। আমাদের অনেক শিল্পী প্রশিক্ষণ পাওয়ায় তাদের কাজের ধরন বদলেছে, গুণগত মান এসেছে। এই শিল্পপণ্যকে টিকিয়ে রাখতে ক্রেতা পর্যায়ে আগ্রহ তৈরি দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী