বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:২৩ পূর্বাহ্ন

Notice :

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের হুঁশিয়ারি : ফসলডুবি হলে দায় পাউবো-প্রশাসনের

শহীদনূর আহমেদ ::
হাওরের ফসলরক্ষার জন্য সরকারি উদ্যোগে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের কাজ বেধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে শেষ না করায় উদ্বেগ জানিয়েছে হাওর বাঁচাও আন্দোলন। সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় হাওরে ফসলডুবির ঘটনা ঘটলে এর দায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনকে নিতে হবে বলে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয় সংগঠনটির পক্ষ থেকে।
শনিবার সকালে শহরের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে চলতি বোরো মৌসুমে হাওরে বেড়িবাঁধ নির্মাণের অগ্রগতি ও চলমান কাজের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরার উদ্দেশ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই উদ্বেগ জানানো হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে জেলার ১১টি উপজেলার হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের নির্মাণকাজ সমাপ্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ানের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গেছে বাঁধের নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাপ্ত হয়নি। কাজ শেষ করতে না পারার বিষয়টি খোদ পানি উন্নয়ন বোর্ডও স্বীকার করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, ঢিমেতালে বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই আশঙ্কা করা হয়েছিল এবারও সঠিক সময়ে কাজ শেষ হবে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ সমাপ্ত করার জন্য আমরা জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়েছি, রাজপথে মানববন্ধন করার পরও বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি। প্রকাশ্যে সমাবেশে গণশুনানি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করার দাবিও উপেক্ষা করা হয়েছে। নিজেদের খেয়ালখুশি মতো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা নিজ অফিসে বসে পিআইসি গঠন করেছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত কৃষক বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব না পাওয়ায় কাজে গতি ছিল না।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সঠিকভাবে কাজ না করায় কয়েকদিন যাবত বিভিন্ন উপজেলায় পিআইসি সভাপতি কিংবা সদস্য সচিবকে আটক করে মুচলেকার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, কোথাও গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হচ্ছে। শেষ পর্যায়ে এসে দায়িত্ব অবহেলার জন্য এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে শুরুর দিকে করলে আজ ফসলরক্ষা নিয়ে কৃষককে উদ্বেগের মধ্যে পড়তে হত না। মূলত এসব করা হচ্ছে সময় বাড়ানো এবং নিজেদের উপর থেকে দায় সরানোর উদ্দেশ্যে।
এমন পরিস্থিতিতে যথাযথ সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ার ফলে হাওরের ফসলডুবি হলে এর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। সেইসাথে পাউবো’র অগ্রগতি প্রতিবেদনেও হাওরে বাস্তব অবস্থার মিল নেই বলে জানায় হাওর বাঁচাও আন্দোলন।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যে বাঁধগুলো আমরা পরিদর্শন করেছি তাতে কোথাও মাটির কাজ শেষ হয়েছে এমন বাঁধ দেখিনি। আমরা যে বাঁধগুলো পরিদর্শন করেছি তার মধ্যে দিরাই উপজেলার পিআইসি নং ৪, ৫, ৬, ৯, ১৩, ১৩ (ক), ১৪ (ক), ২৯ ও ৩৯ -এর কাজের অবস্থা খুবই নাজুক। এখানে বাঁধ তৈরির কোন নীতিমালা মানা হয়নি। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পিআইসি নং ০১, ৩, ৪, ৬, ৯, ১৪, ১৫, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৪১, ৪২, ৪৩, শাল্লা উপজেলার ১৪, ১৫, ২৩, ২৬, ৪৪, ৬৩, ৬৭, ৭১, ৭৪, ৭৬, ৮৯, ৯০, ১১১, ১১২, ১২৫, ১৩২, ১৩৭, ২৭, ৪১, ১১০, ১২৪, ১৩২ (ক), ৩৯, ৪০, ৪১, ৬৫,৭৪, ১০৭, ১২৩, ১২৬, ১২৭, ১২৮, ১২৯, ১৩০, ১৩১, ১৩৩, ১৩৪, ১৩৮,১৩৯, ৮১,৮২ ও ৮৩ অবস্থাও নাজুক। জগন্নাথপুর উপজেলার ০২, ১১, ১২, জামালগঞ্জ উপজেলার ২৫, ২৬, ২৮, ২৯, ৩২, ৩৫, ৩৭, ৫১, ৫৬, ৬১; সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬; বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পিআইসি নং ০১, ০২, ০৬; তাহিরপুর উপজেলার ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৫৯, ৬০নং পিআইসিতে বাঁধের কাজের গুণগত মান খুবই খারাপ। এসব স্থানে বাঁধ নির্মাণের নীতিমালা মানা হয়নি। এসব বাঁধে এখন পর্যন্ত কাজও শেষ হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উল্লেখ করা হয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড দাবি করছে- ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। সংগঠন বিভিন্ন উপজেলা কমিটির কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে এবং কৃষকদের সাথে কথা বলে হাওরে ৫০-৬০ ভাগ বাঁধের কাজ শেষ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। আবার কোথাও কোথাও ৩০ ভাগও কাজও হয়নি। হাওরে অনেক অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের পাঁয়তারাও চলছে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এবার হাওর রক্ষা বাঁধে দিরাই, শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।
বাঁধ নির্মাণে গাফিলতির কারণে এবারো হাওরে কোন বিপর্যয় হলে এর দায় প্রশাসনকে নিতে হবে বলে সংবাদ সম্মেলনে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। এ জাতীয় নেতিবাচক কোনকিছু ঘটলে সুনামগঞ্জের কৃষকদের নিয়ে প্রয়োজনে পাউবো অফিস, ডিসি অফিস, ইউএনও অফিস ঘেরাও কর্মসূচিসহ আদালতে মামলা করে কৃষকের স্বার্থরক্ষার ঘোষণা দেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা।
এদিকে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ সমাপ্ত না করার প্রতিবাদে আগামী ২ মার্চ থেকে জেলা সদর থেকে সকল উপজেলা সদর ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পথসভা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের উপদেষ্টা রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু, সহ-সভাপতি সুখেন্দু সেন, সিনিয়র সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর, ডা. মুর্শেদ আলম, ইয়াকুব বখত বাহলুল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহিন চৌধুরী শুভ, সাংগঠনিক সম্পাদক এমরানুল হক চৌধুরী, একে কুদরত পাশা, সদর উপজেলা কমিটির সভাপতি স্বপন কুমার দাস, সহ-সভাপতি চন্দন কুমার রায়, সাধারণ সম্পাদক শহীদনূর আহমেদ, মানব চৌধুরী, সুনামগঞ্জ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মতিলাল চন্দ, আনোয়ারুল হক, দিরাই উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামছুল ইসলাম সরদার প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী