সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৯:২১ পূর্বাহ্ন

Notice :

ফসলরক্ষা বাঁধের বরাদ্দে নদীতীর রক্ষায় ২৫ প্রকল্প!

শামস শামীম ::
সুনামগঞ্জে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের টাকায় হাওর বহির্ভূত ২৫টি প্রকল্পে কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১৭.৫৩৯ কি.মি. দৈর্ঘ্যরে ওই বাঁধগুলোতে ব্যয় হচ্ছে সরকারের প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা। হাওরের ফসলের কাজে না আসলেও নদী তীর সংরক্ষণ এবং জনগণের চলাচলে এসব রাস্তা হিসেবে কাজে দিবে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। পাউবো এগুলোকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হিসেবে মেরামত ও সংস্কারের বিষয়টি স্বীকার করেছে। হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও কৃষকরা বলছেন, এই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পসহ এবছর অন্তত তিন শতাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় অভিজ্ঞ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত খরচার হাওরের বোরো ফসল গজারিয়া খাল দিয়ে পানি প্রবেশ করে ফসলডুবির ঘটনা ঘটায়। ২০১৬ সনে এখানে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে সরকার রাবারড্যাম নির্মাণ করে দিয়েছে। তাই হাওরটিও এখন সুরক্ষিত আছে। কিন্তু এবার ওই হাওরের ফসলরক্ষার কথা বলে নামকাওয়াস্তে গণশুনানী করে সংশ্লিষ্টরা চলতি নদীর বাম তীরে ১ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৭টি প্রকল্প গ্রহণ করেন। প্রতিটি প্রকল্পই নদী তীরের রাস্তার উপরই নেওয়া হয়েছে। একই নদীর ডান তীরে ৩৭ লক্ষ ৩৭ হাজার টাকা ব্যয়ে আরো দুটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোকে ফসলরক্ষার জন্য অপ্রয়োজনীয় বলছেন কৃষক, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ প্রকল্প গ্রহণে যুক্তরা বলছেন এগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হিসেবেই মেরামত ও সংস্কারে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর বাম তীরে ৫টি প্রকল্পে ১ কোটি ১৮ লক্ষ ৩৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পেরও হাওরের ফসলক্ষায় কোন কাজে আসবে না। একই নদীর শাল্লা উপজেলা অংশে ডান তীরে ৩টি প্রকল্পে ৪৬ লক্ষ ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলার খাসিয়ামারা নদীর দুই তীরে আরো ৪টি প্রকল্পে ৬২ লক্ষ টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এভাবে হাওরের ফসলরক্ষার বাঁধের বরাদ্দ অন্য কাজে ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।
জামালগঞ্জের পাগনার হাওরের প্রয়োজনীয় ‘বড়বান্দ’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাঁধে কোন বরাদ্দ না দিয়ে ফসলরক্ষার অপ্রয়োজনীয় এমন প্রকল্প গ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর দুদক সচিব দিলোয়ার বখতের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এসব বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন। তাছাড়া গত ৮ ফেব্রুয়ারি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায়ও এসব অভিযোগ করেন হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।
এদিকে এলাকাবাসী জানিয়েছেন, নদীতীরের ওই বাঁধগুলো মাটির বদলে বালি দিয়ে করা হচ্ছে। যার ফলে বাঁধগুলোতে কাজ করা হলেও টেকসই হচ্ছে না। পানি এলে আবারও বাঁধের বালু সরে যাবে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শহিদ নূর আহমেদ বলেন, এ বছর হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের ছড়াছড়ি রয়েছে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের সঙ্গে অনেক অক্ষত বাঁধেও সমান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া হাওর নেই এমন স্থানেও একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করে সরকারের টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। আমরা সরেজমিনে ঘুরে এসে গত ৮ ফেব্রুয়ারি পানিসম্পদ মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে এসব বলেছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কার্যকরী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, দুদকের সচিব, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা এসব নিয়ে কথা বলেছি। আমরা স্মারকলিপিও দিয়েছি। তারপরও হাওরের বরাদ্দের টাকায় নদীতীর রক্ষার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক স্থানে প্রয়োজনীয় প্রকল্পও নেওয়া হয়নি।
সুনামগঞ্জ-সিলেট সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার বলেন, জামালগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ হাওর পাগনার হাওর। এই হাওরের বড়বান্দ খ্যাত বাঁধে স্থানীয় কৃষকরা বলার পরও প্রকল্প নেওয়া হয়নি। আমিও কৃষকদের পক্ষে অনুরোধ করেছিলাম। এখানে প্রকল্প নেওয়া হলে কৃষকরা উপকৃত হতেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও হাওরের ফসলরক্ষা মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব মো. সবিবুর রহমান বলেন, নদীতীরের প্রকল্পগুলো বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ হিসেবে প্রকল্পভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হাওরের ফসলরক্ষার কথা বিবেচনা করে বাস্তবায়ন করা হয়নি। এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। এতে কোন অপচয় হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী