শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৪:৩০ অপরাহ্ন

Notice :

দোয়ারা ও তাহিরপুরে ফসলরক্ষায় বালির বাঁধ!

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালীরাজন চন্দ ::
প্রতি বছর বর্ষা শুরু হলেই পাহাড়িঢলে বিনষ্ট হয় বিস্তীর্ণ হাওরের ফসল। সরকারিভাবে সর্বনাশা পাহাড়িঢলের কবল থেকে কৃষকের ফসল রক্ষায় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে বরাদ্দের টাকায় হাওরের ফসলরক্ষায় বেশির ভাগ বাঁধ নির্মাণে উপেক্ষিত হয় নীতিমালা। অনেক প্রয়োজনীয় বাঁধ না হয়ে যত্রতত্র বাঁধ নির্মাণের হিড়িক পড়ে যায়। চলতি বছরে দোয়ারাবাজারে বিভিন্ন হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ প্রকল্পে ৫ কোটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি ক্লোজারে কোনো প্রকল্পই গ্রহণ করা হয়নি। তন্মধ্যে উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের নাইকো সড়কের ভাঙা, একই ইউনিয়নের খাসিয়ামারা নদীর রাবারড্যাম সংলগ্ন ভাঙায় প্রকল্প হতে বাদ পড়েছে। আর এ দুটি বাঁধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় বাঁধে মাটি ভরাটের প্রকল্প না থাকায় এবং খাসিয়ামারা নদীর ডান ও বাম তীরে বালি দিয়ে ফসলরক্ষা বাঁধ তৈরি করায় কার্যত এবার কপাল পুড়বে কৃষকের।
উদ্বেগজনক খবর হচ্ছে, দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা খাসিয়ামারার নদীর ডান তীর এবং বাঁ তীরের ৩২নং উপ-প্রকল্পের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি পিআইসি’র সভাপতি তমিজ উদ্দিন সম্পূর্ণ বাঁধের কাজ ‘বালু মাটি’ দিয়ে করাচ্ছেন। এখানে বালির বাঁধ তৈরি হওয়াতে পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ধসে বিপদ বাড়ার শঙ্কাই দেখা দিয়েছে। এছাড়াও একই অবস্থা ৩১, ৩৩, ৩৪নং উপ-প্রকল্পেও।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বাংলাবাজার থেকে রাবারড্যাম পর্যন্ত খাসিয়ামারা নদীর ডান তীর ৩২নং উপ-প্রকল্পের ৫৭৭ মিটার বাঁধের ভাঙা বন্ধকরণ ও মেরামত কাজের সম্পূর্ণ বাঁধ ‘বালু মাটি’ দিয়ে করা হচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে বালু মাটিতে পা ফেললেই পা দেবে যাচ্ছে। এসময় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যদের সাথে কথা বললে তারা জানান, এখানে বালু মাটি আছে, ভালো মাটি কোথা থেকে পাবেন! তাই তারা বালু দিয়েই কাজ শেষ করছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাও কাজ দেখে গেছেন।
মেঘালয়ের কোলঘেঁষে সুনামগঞ্জ সদর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার বিস্তীর্ণ কাংলার হাওর এবং নাইন্দার হাওর। দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ও লক্ষ্মীপুর এবং বোগলাবাজার ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের কৃষকরা এই দুই হাওরে চাষাবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। হাওরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ পাহাড়ি নদী খাসিয়ামারার ডান তীর উপ-প্রকল্পের। বাম তীরও কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
স্থানীয় ও উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, এই দুই ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ উঁচু করার জন্যই চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) কে এ বছর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬২ লাখ টাকা। পিআইসি দায়িত্বশীলরা বাঁধের কাজ করেছেন বাঁধের নিচের বালু মাটি দিয়ে। অথচ গত বছর সরকার এই বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল ৪৪ লাখ টাকা। সে বছরও এই প্রকল্পের কাজ বালু মাটি দিয়ে হয়েছিল।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, যেভাবে হাওর রক্ষা বাঁধ বালু মাটি দিয়ে করা হচ্ছে- এরকম বাঁধ নির্মাণ হলে বর্ষার এক সপ্তাহের বৃষ্টিতেই ভেঙে যাবে বাঁধ। তাতে এই বাঁধ কোন কাজে আসবে না। অথচ পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ কর্তৃপক্ষ যেন দায়সারাভাবে কাজ করাচ্ছেন। বাঁধের কাজ সঠিকভাবে করতে হলে এখানে জিও টেক্সটাইল ছাড়া এই বাঁধগুলো টিকবে না। বাঁধের কাজে সরকারের টাকাই ব্যয় হবে কিন্তু ফসল রক্ষার কাজে আসবে না। তাই কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
খাসিয়ামারার ডান তীরের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মো. তমিজ উদ্দিনের কাছে বালুর বাঁধ তৈরির বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, এখানে মাটি পাওয়া যায় না। বাঁধের পাশে বালু মাটি পেয়েছি তাই এই মাটি দিয়ে বাঁধের কাজ করাচ্ছি। প্রায় ৬৫ শতাংশ বাঁধের কাজ শেষ।
দোয়ারাবাজার উপজেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী (এসও), উপজেলা প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব সমশের আলী বলেন, আমি ও আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম মহোদয় এই বাঁধগুলো পরিদর্শন করে দেখেছি। বর্তমানে কাজটি বন্ধ রয়েছে।
এ ব্যাপারে দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোনিয়া সুলতানা বলেন, এখানে মাটি না পাওয়ায় বালি দিয়েই বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে তা যাচাই-বাছাই করে দেখার জন্য আমি পাউবো’র এসওকে নির্দেশ দিয়েছি।
অপরদিকে, তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরের অক্ষত একটি বাঁধে বালির উপরেই মাটি ফেলে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করেছেন পিআইসি কমিটি। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এ বাঁধটিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড অপ্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। সেই সাথে বালির উপরে সামান্য পরিমাণ মাটি ফেলে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করায় হাওরের ফসল রক্ষায় এ বাঁধটি হবে ঝুঁকিপূর্ণ।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, গত বছর পাহাড়ি ঢলে উপজেলার মাটিয়ান হাওর উপ-প্রকল্পের বর্তমান ৬৫নং পিআইসির হাওর রক্ষা বাঁধটি তলিয়ে গিয়েছিল। সেই সময় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ থেকে গ্রামের মানুষজনের যাতায়াতের সুবিধার্থে বালু ভর্তি বস্তা দিয়ে বাঁধটি উঁচু করা হয়েছিল। কিন্তু গত বছরে বাঁধে দেয়া বালুর উপরেই এ বছর সামান্য পরিমাণ মাটি ফেলে বাঁধের কাজ শুরু করেছেন মাটিয়ান হাওরের ৬৫নং উপ প্রকল্পের পিআইসিগণ।
উল্লেখ্য, চলতি অর্থ বছরে তাহিরপুর উপজেলার মাটিয়ান হাওরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামত ও সংস্কার প্রকল্পের এই ৬৫নং বাঁধে ১০ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, মাটিয়ান হাওরের এ বাঁধটি প্রায় ৭০ পার্সেন্ট অক্ষত ছিল। তবুও পানি উন্নয়ন বোর্ড এ বছরেও প্রায় সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। অপরদিকে বাঁধের উপর থাকা বালি না সরিয়ে সামান্য পরিমাণ মাটি কেটে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করায় এ বাঁধটি হাওরের ফসল রক্ষায় ঝুঁকির মধ্যে থাকবে।
এ বিষয়ে প্রকল্পের পিআইসি সভাপতি আইন উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, বাঁধের উপর থাকা গত বছরের বালি সরিয়েই বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করেছি। এ প্রতিবেদক সরেজমিনে গিয়ে বালির উপরে মাটি ফেলার বিষয়টি দেখেছেন এমন প্রশ্ন করলে পিআইসি সভাপতি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
বাঁধের পার্শ্ববর্তী কৃষক নুর ইসলাম বলেন, এ বাঁধটি মাটিয়ান হাওরের ফসল রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বালির উপরে মাটি ফেলে বাঁধ নির্মাণ কাজ হওয়ায় সামান্য পানিতেই বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
রেজাউল ইসলাম নামে আরেক কৃষক বলেন, এই বাঁধে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেই পরিমাণ টাকা খরচ হবে না। কারণ গতবারের কাজেই প্রায় ৭০ পার্সেন্ট বাঁধ অক্ষত ছিল।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজেন ব্যানার্জি বলেন, বালির উপরে বাঁধ নির্মাণ কাজ এটা হবে না। আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে পাঠিয়ে বিষয়টির খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী