শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০২:১৪ পূর্বাহ্ন

Notice :

সুনামগঞ্জ নিয়ে ভাবনা : অ্যাড. মলয় চক্রবর্ত্তী রাজু

পর্যটন নিয়ে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি। সমগ্র বিশ্ব এই শিল্পকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এটাকে যখন একটা স্থায়ী শিল্প করে ফেলেছে তখনও আমরা ভাবছি। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই শিল্প যখন সারা বিশ্বে জনপ্রিয় একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন আমরা কেন জানি অত্যন্ত নির্মোহ হয়ে এর ভাল-মন্দ নিয়ে শংকিত হয়ে না-বোধক ভাব নিয়ে বিচার করছি। এই আমাদের মতো মানুষদের অনেকেই অনেক দেশ ঘুরেছেন। তাদের মুখেই পর্যটনের নানাবিধ সুফলের কথা শোনা যায়। কিন্তু দেশেই এ ধরনের একটা উদ্যোগ নেয়া যায় কিনা সে সম্পর্কে কোন হ্যাঁ-সূচক ভাবনা তাদের মধ্যে নেই বললেই চলে। সামাজিক রক্ষণশীলতার দোহাই তাদের মুখে তখন জড়তা এনে দেয়। অবাধ যৌনতা ছাড়াও যে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠতে পারে তা যেন আমরা ভাবতেও পারিনা। যৌনতা ও দেশের সংস্কৃতি বিরোধী বিষয় ছাড়াও যে পর্যটনশিল্প গড়ে উঠতে পারে কল্পনাতেও আমাদের নেই যেন। তাই কেমন যেন একটা দ্বিধা। দেশটা কি থাইল্যান্ডের মতো হয়ে যাবে? দেশে একটা পর্যটন মন্ত্রণালয় আছে সরকারিভাবে। কিন্তু এর কাজ শুধু স্থানে স্থানে হোটেল নির্মাণ ছাড়া আর কিছু আছে বলে মনে হয় না।
দেরীতে হলেও জাতীয়ভাবে একটা উদ্যোগের কথা উঠেছে। সংস্কৃতি আর পর্যটন মন্ত্রণালয়কে একীভূত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। পর্যটনের বিকাশে সংস্কৃতির যে অপরিসীম ভূমিকা তাকে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে। বোধোদয় হয়েছে যে সংস্কৃতি ও পর্যটন একে অপরের পরিপূরক। সংস্কৃতি অঞ্চলভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থার প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। আর এখানেই সুনামগঞ্জের ভবিষ্যতের এক অপার সম্ভাবনার কথা মনে উঠে আসে।
গত কয়েক বছর ধরে সুনামগঞ্জেও এ শিল্পের একটা সম্ভাবনা গড়ে উঠেছে। টাঙ্গুয়ার হাওরকে ঘিরে। এটা হঠাৎ করে কিভাবে একেবারে দেশের একটা উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠলো এটাই একটা আশ্চর্য্য কা-। সুনামগঞ্জের মানুষ বলা যায় হতভম্ব হয়ে পড়েছে। প্রাকৃতিক এই হাওরটি এতোদিন তো আমাদের চোখের সামনেই ছিল। তারপরও সরকার বা আমাদের মনেও হলো না একবারের জন্যও।
তারপরও বলা যায় টাঙ্গুয়ার হাওরের মাধ্যমে সুনামগঞ্জ একটা নতুন সম্ভাবনার মুখোমুখি। এই সুযোগটাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু কিভাবে? এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে। তবে এটা হতে খুবই তাড়াতাড়ি। কারণ যে সুনামগঞ্জমুখী জনস্রোত বইতে শুরু করেছে তাকে ধরে রাখতে গেলে একটা সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে প্রশাসন ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে। টাঙ্গুয়ার হাওরকে ভিত্তি করে পাহাড়-জলা-নদীসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদকে নিয়ে একটা সম্পূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রয়াস এখন সময়ের দাবি।
আর আমাদের লোকসংস্কৃতির কথা তো বিশ্বের সবার জানা। হাসন-রাধারমণ-দূর্ব্বীন-করিম প্রমুখের গানকে সম্বল করে লোকসংস্কৃতির অপূর্ব এক জগৎ তৈরি করা যায়। সঠিক মাধ্যমে একে সযত্নে তুলে ধরতে হবে পর্যটকদের সামনে। বর্তমান ব্যবস্থাপনা দিয়ে এটা অসম্ভব। কারণ সুনামগঞ্জের এই ক্ষেত্রটি বড়ো এলোমেলো অবস্থায় আছে। যোগ্যতার নিরিখে এই বিভাগকে সাজালে পর্যটকদের আরো আকর্ষিত করার সুযোগ থাকে। শুধুমাত্র প্রশাসন বা সরকারি দেখভালের উপর ভরসা না করে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ বা সংস্থাকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করতে হবে এক সুশৃঙ্খল বলয়। আর এটা সুনামগঞ্জে সম্ভব।
যেমন, উদাহরণ দেওয়া যায় পৌরসভার কথা। এতে একটা বিশেষ ভূমিকায় এসে যাবে সুনামগঞ্জ পৌরসভা। কারণ এই হাওর পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এই জেলা শহরকে ধরা হবে। কাজেই এই শহরকেও সেইমতো করে সাজতে হবে। প্রাকৃতিক বা অন্য যেভাবেই হোক এই শহর তার সৌন্দর্য্য আগের চেয়ে অনেক হারিয়েছে। আগের যে গ্রাম্য শহরের টানে স্থানীয় বা অস্থানীয় এই শহরকে ভালবাসতো, ছুটে আসতো তা আর নেই বললেই চলে। রাস্তাঘাট বড় হয়েছে কিন্তু কেন জানি আগের শ্রী হারিয়েছে। যেখানে সেখানে আবর্জনা। গাছপালা কমে গেছে। আগের মতো সাজানো গোছানো মনে হয় না। এভাবে আরো অনেক কিছু বলা যায়। তবে পৌর প্রশাসন আরেকটু আন্তরিক হলেই আমরা একটি সুন্দর শহর পেতে পারি। কারণ মনে রাখতে হবে এটা মূলতঃ বাণিজ্যিক শহর নয়। সেহেতু শহরটাকে সাজাতে তেমন বেগ পেতে হবে বলে মনে হয় না। প্রয়োজন চালনার মূল জায়গায় স্বপ্নেভরা একটা সুন্দর মন আর কর্মতৎপরতা। এভাবেই বিভিন্ন সংস্থা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে স্ব স্ব অবস্থান থেকে কাজ করে গেলেই সুনামগঞ্জকে একটি সমৃদ্ধ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যাবে।
শুরুতে যা বলছিলাম তাই শেষে আবার বলতে চাই। বাঙালির পায়ে সর্ষে। কিন্তু বাংলাদেশের অতিপরিচিত পর্যটনস্থলগুলো এখন আর আগের মতো সবাইকে টানেনা, পরিচর্যার অভাবে। ঠিক এভাবেই আমাদের এই জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জায়গাগুলোও হয়তো এমনি করে পানসে হয়ে যাবে। কিন্তু যদি সংস্কৃতি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে একীভূত করে একটা গোছানো বেড়ানোর জায়গা হিসেবে সুনামগঞ্জকে প্রস্তুত করা যায় তাহলে মরক্কোর রাবাতের মতো একটি স্থায়ী পর্যটনের স্থান হিসেবে পরিচিতি পাবে। আমাদের প্রকৃতি আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সঠিক বিচার ও সম্মান করা হবে। আর এই দুই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে প্রান্তিক এ জেলা অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে একটি উন্নত অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী