রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

Notice :

সিভিল সার্জনকে বদলির নেপথ্যে সেই দুর্নীতিবাজ চক্র?

বিশেষ প্রতিনিধি ::
দুর্নীতি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদানের ২০ দিনের মাথায় ডা. তউহীদ আহমেদ কল্লোলকে কোন কারণ ছাড়াই আকস্মিক বদলি করে নেওয়ায় জেলাজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় বইছে। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তাঁর বদলির আদেশ আসার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ।
জানা গেছে, জয়পুরহাটের সিভিল সার্জন ডা. শামছুউদ্দিনকে সুনামগঞ্জের নতুন সিভিল সার্জন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ডা. তউহীদ আহমেদ কল্লোলকে বদলি করা হয়েছে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন হিসেবে।
বাবার টিউশনির টাকায় ডাক্তার হওয়া ডা. কল্লোল যোগদানের পর ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি নিজে দুর্নীতি করবেন না এবং কাউকে দুর্নীতি করতে দেবেন না। সেইসাথে স্বাস্থ্যবিভাগকে জনবান্ধব ও সেবামুখী করারও উদ্যোগ নিবেন। তাঁর এই ঘোষণায় আশাবাদী হয়েছিলেন সাধারণ মানুষ।
সিভিল সার্জনের আকস্মিক বদলির ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান জানিয়েছেন, সিভিল সার্জনকে ২০ দিনের মাথায় বদলি করে নেওয়ার খবরটি জেনেছি। আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) এনিয়ে আমি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবো।
সুনামগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের হুইপ অ্যাড. পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ এই বদলির সমালোচনা করে বলেন, এই বদলি সম্পূর্ণরূপে অন্যায়। এতে দুর্নীতি প্রশ্রয় পাবে। আমি এ নিয়ে সংসদ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কথা বলে বদলির আদেশ স্থগিত করার দাবি জানাবো। এছাড়াও আমি পরিকল্পনামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বদলির আদেশ স্থগিতের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছি।
এদিকে, দুর্নীতি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে দায়িত্বে থাকা সিভিল সার্জনকে এতো কম সময়ের মধ্যে বদলি করে নেওয়ার পেছনে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, কর্মচারী ও স্বাস্থ্যবিভাগ সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীদের হাত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনসহ সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ।
সূত্র জানায়, ডা. তউহীদ আহমেদ কল্লোল সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর দুর্নীতি বন্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ায় নিজেদের যুগ যুগ ধরে চালিয়ে যাওয়ার অপকর্ম বন্ধের আশঙ্কা দেখা দেয় দুর্নীতিবাজ চক্রের। তারা একাট্টা হয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ে তদবির করে ২০ দিনের মাথায় তাঁকে বদলি করিয়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়।
আকস্মিক এই বদলির আদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় সুনামগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর তীব্র সমালোচনা করছেন তারা। ঢাকায় অবস্থানরত সুনামগঞ্জের বিশিষ্টজনেরাও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এই বদলির বিরোধিতা করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। দুর্নীতিবাজ চক্রের তদবিরে একজন সৎ সিভিল সার্জনের বদলি স্থগিতের দাবি জানান তারা। বদলির আদেশ স্থগিতের দাবিতে বৃহস্পতিবার শহরের আলফাত স্কয়ারে সুনামকণ্ঠ পাঠক ফোরাম ও সিভিল সার্জন কার্যালয় প্রাঙ্গণে সচেতন সুনামগঞ্জবাসীর ব্যানারে পৃথক প্রতিবাদী মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে।
শহরের হাছননগর এলাকার বাসিন্দা আশরাফ শাহীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেন, কার হাতের ইশারায় মাত্র ২০ দিনের মাথায় একজন সৎ দক্ষ সিভিল সার্জন বদলি হয়ে যায়, সেটা সুনামগঞ্জবাসী জানতে চায়।
সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শেরগুল আহমেদ মনে করেন, স্বাস্থ্যবিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ায় বিষয়টি বদলির পেছনের কারণ।
প্রবাসী নূরুল গণি নজরুল বলেন, সিভিল সার্জন আসা মাত্র বদলিতেই সুস্পষ্ট প্রমাণিত, সুনামগঞ্জের দুর্নীতিবাজরা কত শক্তিশালী।
ষোলঘর এলাকার রিপন চন্দ বলেন, পশ্চাদপদ একটি জেলায় চরম দুর্নীতিতে নিমজ্জিত স্বাস্থ্যখাতের দায়িত্ব নিয়ে পরিবর্তনের ঘোষণার দেওয়ার পরপরই সিভিল সার্জনকে বদলি করে নেওয়া হল। তার ঘোষণায় সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রাপ্তির স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন মাত্র। তার মাঝেই পুরো বাংলা ছবির মতই তার বদলি! এ জেলায় স্বাস্থ্যখাতের ঘাপটি মেরে বসে থাকা সিন্ডিকেটটা অনেক দিন ধরেই শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে বহালতবিয়তে দুর্নীতি করে যাচ্ছে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেই তার যে কি পরিণতি হতে পারে, সিভিল সার্জনের বদলিই তার বড় প্রমাণ!
এদিকে, সিভিল সার্জন হিসেবে যোগদানের পর ডা. কল্লোল সাংবাদিকদের বলেন, সুনামগঞ্জে আসার আগেই সদর হাসপাতালের একটি দুর্নীতির তদন্তের দায়িত্বে ছিলাম। কাজেই হাসপাতাল সম্পর্কে আগে থেকে আমার কিছু ধারণা আছে। পূর্ব অভিজ্ঞতার সদর হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবাকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা আমার রয়েছে। স্বল্পমেয়াদি সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করা হবে। এরপর মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা এবং পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবো। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্স থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে একটি নিয়ম-শৃঙ্খলা তৈরি করে দেয়া হবে আমার মূল লক্ষ্য। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসকের সংখ্যা কম। আমরা প্রতিনিয়ত চিকিৎসক বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাবো।
সিভিল সার্জন ডা. তউহীদ আহমদ কল্লোল বলেছিলেন, আমার প্রথম কাজ হবে সবাইকে একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা। সবাই নিয়মমতো অফিসে আসছেন কিনা তা খতিয়ে দেখব। চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাদের পোশাক বাধ্যতামূলক করবো। হাসপাতালের যেসব কর্মকর্তা ব্যক্তিগত পোশাক পরে আসবেন তাকে দালাল হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। কারণ সবার পোশাক নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। কে চিকিৎসক, কে নার্স, কে কর্মকর্তা এবং কে কর্মচারী পোশাকেই নির্ধারণ হবে। চিকিৎসক ও নার্সদের অবশ্যই নেমপ্লেট ব্যবহার করতে হবে।
সেইসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমি এখানে সৎভাবে কাজ করতে এসেছি। আমাকে সরকার যে বেতন দেয় তা দিয়েই সংসার চালাই। আমি হারাম এক টাকাও খাই না, কেউ খাওয়াতে পারবে না। আমার বাবা উপসচিব ছিলেন। তবুও তিনি টিউশনি করেছেন। কষ্ট করে আমাকে লেখাপড়া করিয়েছেন। আমি যদি দুর্নীতি করি তাহলে কলঙ্কের দাগটা আমার বাবা ও পরিবারে লাগবে। আমার বাবা এবং পরিবারের গায়ে কলঙ্কের দাগ লাগতে দেব না আমি।
জানা যায়, সুনামগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগ ও সদর হাসপাতাল স্বাস্থ্যবিভাগের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ও বাইরের একটি চক্রের হাতে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি। কর্মচারী পদমর্দাদার ওই চক্রের মর্জি মাফিক চলতে হতো সিভিল সার্জনসহ অপরাপর ডাক্তার, কর্মকর্তা, নার্স ও কর্মচারীদের। হাসপাতালে বিভিন্ন জিনিসপত্র সরবরাহ নামে-বেনামে করে আসছিলেন। সরকারি ওষুধপত্রের কালোবাজারি, প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অসৎউদ্দেশ্য হাসিলের জন্য টেকনিক্যাল পদগুলোতে বছরের পর বছর খালি রাখার পেছনে হাত ছিল ওই অসাধু চক্রের। এই চক্রের অনেকেই দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল ধনসম্পদ অর্জনের অভিযোগে বার বার সংবাদের শিরোনাম হলেও তারা এতোটাই শক্তিশালী যে অবস্থান থেকে একচুলও কেউ নাড়াতে পারেনি। বরং দুর্নীতিবাজ ওই চক্রের হাতে অতীতে বশিকরণ হতে বাধ্য হয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের অনেক ডাক্তার ও কর্মকর্তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী