সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২০, ০৪:৪৭ পূর্বাহ্ন

Notice :

যাদুকাটায় ইজারার শর্ত ভেঙে বেপরোয়া চাঁদাবাজি

মাসুম হেলাল ::
তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদীতে নৌযান থেকে টোল আদায়ের জন্য দেড় কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন টোল আদায় জন্য যে দুটি ঘাট ইজারা দিয়েছে। সেখানে ইজারার শর্ত ভেঙে মাসের পর মাস চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। বালু, পাথর, কয়লাসহ পণ্যবোঝাই নৌযান থেকে টোল আদায়ের জন্য উপজেলার বালিজুড়ি ইউনিয়নের ফাজিলপুর ও ঘাঘরা নৌকাঘাট এক বছরে মেয়াদের জন্য ইজারা দেয় তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ।
ঘাঘরা ঘাট উপজেলার চিকসা গ্রামের আজিজ পাশার ছেলে শেখ শফিক ও ফাজিলপুর ঘাট ফাজিলপুর গ্রামের মরতুজ আলীর ছেলে ফয়সল আহমদ ইজারা বন্দোবস্ত পান। এই দুই ইজারাদার ঘাট দুটি ইজারা নেওয়ার পর থেকে নিজেদের ইচ্ছামাফিক সরকার নির্ধারিত হারের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হারে টোল আদায় করছেন পণ্যবোঝাই নৌযান থেকে। ইজারার শর্ত মোতাবেক কেবলমাত্র ঘাটে মালামাল উঠানামা করা নৌযান থেকে টোল আদায়ের নিয়ম থাকলেও মালবোঝাই চলতি নৌযান থেকে আদায় করা হচ্ছে টোল। নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা অতিরিক্ত হারে টোল দিতে না চাইলে তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। চাঁদাবাজি বন্ধে থানাপুলিশ, প্রশাসন থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিদের ভোক্তভোগীরা বার বার ধর্ণা দিলেও টোল আদায়ের নামে চাঁদাবাজি প্রকৃত অর্থে বন্ধ হচ্ছে না। নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের আন্দোলনে মুখে মাঝে মধ্যে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে প্রশাসন অ্যাকশনে গেলেও সময়ের ব্যবধানে চাঁদাবাজ চক্র ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক সময়ে ফাজিলপুর ও ঘাঘরা নৌকাঘাটে নৌযান থেকে চাঁদাবাজি সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেলে গত মঙ্গলবার (২১ জানুয়ারি) নির্যাতিত নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা যাদুকাটা নদীতে অনির্দিষ্টকালের নৌ-ধর্মঘটের ডাক দেন। নদী তীরের সোয়ালা নতুন বাজার এলাকায় বালু-পাথর বোঝাই শত শত নৌকা নোঙর করে বিক্ষোভ করেন তারা। খবর পেয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনরত নৌযান মালিক ও শ্রমিকদেরকে চাঁদাবাজি বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিলে সন্ধ্যায় ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন তারা। ইজারা শর্তে যাই থাক না কেন প্রতিটি নৌযান থেকে ৬০০ টাকা হারে টোল পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয় হয় ওই সভায়, যা ইজারা চুক্তিতে উল্লেখিত সর্বোচ্চ হারের প্রায় দ্বিগুণ। নির্ধারিত হারের প্রায় দ্বিগুণ টাকা টোল দিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজির হাত থেকে বাঁচতে সম্মত হয়েছেন নৌযান মালিক ও শ্রমিকেরা।
সূত্র জানায়, যাদুকাটা নদীতে পণ্যবোঝাই নৌযান থেকে টোল আদায়ের জন্য পৃথক দুই ব্যক্তিকে ফাজিলপুর ও ঘাঘরা নৌঘাট ইজারা দেয় তাহিরপুর উপজেলা উপজেলা প্রশাসন। ২০০ মেট্রিক টনের ঊর্ধ্বের মালবাহী কারগো, বার্জ ও বাল্কহেড থেকে ৩৫০ টাকা, ৫০ থেকে ২০০ মেট্রিকটন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন মালবাহী দেশীয় বড় নৌকা থেকে ২৫০ টাকা, ৫০ টনের কম ধারণক্ষমতার দেশীয় ছোট নৌকা থেকে ১৫০ টাকা টোল আদায়ের হার নির্ধারণ করে দেয় উপজেলা প্রশাসন। গত বছরে ১৬ জুন টোলের হার উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেন তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ ইমতিয়াজ। এর দুই মাস পর ইজারা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত হয়ে মর্মে উল্লেখ করে টোল আদায়ের হার একক সিদ্ধান্তে বৃদ্ধি করে দেন ইউএনও। বৃদ্ধিকৃত রেট অনুযায়ী ২০০ মেট্রিক টনের ঊর্ধ্বের মালবাহী কারগো, বার্জ ও বাল্কহেড থেকে ৩৫০ স্থলে ৯০০ টাকা, ৫০ থেকে ২০০ মেট্রিকটন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন মালবাহী দেশীয় বড় নৌকা থেকে ২৫০ টাকার স্থলে ৪৫০ টাকা, ৫০ টনের কম ধারণক্ষমতার দেশীয় ছোট নৌকা থেকে ১৫০ টাকার স্থলে ২০০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
এদিকে, আকস্মিক টোল আদায়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হলেও ইজারা বন্দোবস্তের টাকার পরিমাণের বৃদ্ধি করা হয়নি। রহস্যজনক এই অতিবৃদ্ধির বিষয়টি ইজারাদারদের লাভবান হওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। টোল আদায়ের হার বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে বিষয়টি উপজেলা সমন্বয় কমটির সভায় পাস করিয়ে নেওয়ার নিয়ম থাকলেও এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণাসিন্ধু চৌধুরী বাবুল।
তিনি বলেন, তখনকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অদৃশ্য কারণে উপজেলা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে একক সিদ্ধান্তে টোল আদায়ের হার দ্বিগুণের বেশি করে দেন। তার এমন সিদ্ধান্তে নদীতে চাঁদাবাজি ব্যাপক হারে বেড়ে যায়, যার নিয়ন্ত্রণ আজো সম্ভব হচ্ছে না।
শ্রমিকদের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন টোলের পরিমাণ দ্বিগুণ করার পর আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ফাজিলপুর ও ঘাঘরা নৌঘাটের ইজারাদারেরা। প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে তারা মালবাহী বড় নৌযান থেকে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার, মাঝারি নৌযান থেকে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা ও ছোট নৌযান থেকে চার থেকে পাঁচশ টাকা হারে টোল আদায় করে আসছেন। এক্ষেত্রে নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের কোনরূপ রসিদ দেওয়া হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে এই দুই ইজারাদারকে অতিরিক্ত হারে ইজারা আদায়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন বালিজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাবুল মিয়া। অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি ফাজিলপুর ঘাটে ইজাদারের সাথে অংশিদার। ৬০ লাখ টাকা দিয়ে ঘাট ইজারা এনেছি। আমাদের পোষাচ্ছে না। আমরা ঘাট ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে আসতে চাই।
চাঁদাবাজি ও অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। ওপর ইজারাদার শেখ শফিক হাজতে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
যাদুকাটা নৌযান মালিক সমিতির সভাপতি নূর হোসেন মল্লিক বলেন, যাদুকাটা নদীতে দুই টোল আদায়কারীর চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের কারণে নৌযান মালিক ও শ্রমিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বালিজুরি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাবুল ও তার ভাই সারোয়ারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মাসের পর মাস এই চাঁদাবাজি ও শ্রমিক নির্যাতন চলছে। আমরা অনিয়ম বন্ধে নৌধর্মঘটের ডাক দেই। একদিন ধর্মঘট চলার পর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেব চাঁদাবাজি বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিলে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, তারা প্রতিটি মালবোঝাই নৌযান থেকে জোরপূর্বক কয়েকগুণ বেশি হারে টোল আদায় করে গেলেও তাদের বিরুদ্ধে খুব একটা অ্যাকশন নেওয়া হয়নি। বেশি কেন নেওয়া হচ্ছে, জানতে চাইলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করে। চাহিদামত টাকা না দিলে মারধর করে। ওদের অন্তরে এতটুকু ভালবাসা নেই। তারা মানুষরে মানুষ মনে করে না। তারা যা বলে, তাই আইন। আমরা সরকার নির্ধারিত রেটে তাদের টোল দিতে চাই। রসিদ ছাড়া টোল দিতে চাই না। কিন্তু এতে তারা সন্তুষ্ট না। আমরা প্রশাসনের কাছে শ্রমিকদের নিরাপত্তা চাই।
তিনি আরো বলেন, নির্যাতন বন্ধ করতে প্রশাসন থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। বিভিন্ন সময় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি। কোনও সুরাহা না পেয়ে বাধ্য হয়ে আমাদের আন্দোলনে যেতে হচ্ছে। গত ১২ ও ১৫ ডিসেম্বর চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দুই দফা আবেদন করা হয়েছে। নতুন করে চাঁদাবাজি শুরু হলে আমরা আবারো কঠোর আন্দোলন কর্মসূচির ডাক দেব।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণাসিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, ইজারা দেওয়ার সময় আমরা টোলচার্ট নির্ধারণ করে দিয়েছি, সেটা ঘাটে টাঙানো থাকার কথা। রেট অনুযায়ী রশিদের মাধ্যমে টোল আদায় করা বাধ্যতামূলক। তারা নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করার খবর শোনার পর আমরা ব্যবস্থা নিয়েছে। ইতোমধ্যে একজন ইজারাদার জেলে আছেন।
তিনি বলেন, যাদুকাটা নদী অচল হয়ে গেলে এই এলাকার অর্থনীতিতে অন্ধকার নেমে আসে। আমরা সেটা হতে দিতে পারি না। চাঁদাবাজি বন্ধে আমরা সব সময় সোচ্চার থাকব। তিনি বলেন, মাঝখানে বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি তারা আবারো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। শ্রমিকরা ধর্মঘটের ডাক দেন। খবর পেয়ে আমি নদীঘাটে গিয়ে চাঁদাবাজি বন্ধে যা যা করণীয় ঘোষণা দিলে তারা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন।
তিনি আরো বলেন, সকল পক্ষের সাথে আলোচনা করে প্রত্যেক নৌযান থেকে ৬০০ টাকা হারে টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন করে ইজারা শর্ত ভাঙা হলে তাদের ইজারা বাতিল করে দেওয়া হবে।
বাদাঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বলেন, আইন-শৃংখলা রক্ষায় যা যা করণীয় আমরা তা-ই করব। যাদুকাটা নদীতে কোনওরূপ চাঁদাবাজি চলবে না।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিজেন ব্যানার্জী বলেন, যাদুকাটা নদীতে এখন আর চাঁদাবাজি নেই। অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। টোল আদায়ের পরিমাণ পুননির্ধারণ করে বৃদ্ধি করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা আমি আসার আগে করা হয়েছে। নিশ্চয় সভা করে পাস করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী