বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২০, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

Notice :

কৃষিঋণ নিয়ে বিপাকে কৃষক : টাস্কফোর্সের কার্যক্রম স্থগিতের দাবি

বাদল কৃষ্ণ দাস ::
প্রতি বছর কৃষিখাতে ধারাবাহিক লোকসান ও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে কৃষক যখন আর্থিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে কৃষিঋণ পরিশোধের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন, ঠিক এমন অবস্থাতেই বকেয়া ঋণের সুদসহ ব্যাংকের সমুদয় পাওনা টাকা পরিশোধ করতে কৃষি ব্যাংক টাস্কফোর্সের প্রেরিত নোটিশে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে ঋণ অপরিশোধ জনিত অসদাচরণের দায়ে ঋণগ্রহিতা কৃষকদের গ্রেফতার করে সিভিল জেলে পাঠানো হবে। যে কারণে ঋণ সুদ-আসলের যাঁতাকলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক।
জানা গেছে, সারাদেশে কৃষিব্যাংকের অনাদায়ী ঋণ আদায় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সুনামগঞ্জ জেলাতেও কৃষি ব্যাংক টাস্কফোর্সের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এদিকে ঋণ আদায়ের নামে অভিযানের যাঁতাকলে পড়ে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
জামালগঞ্জ উপজেলার কৃষক শাহীদ আলী, শুক্কুর আলী জানান, তারা একজনে ৮ হাজার টাকা ও অপরজনে ২৫ হাজার টাকা কৃষিব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। এখন তা সুদে আসলে ১৬ হাজার টাকা থেকে ৫৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এখন এই ইরি-বোরো মৌসুমে ঋণ পরিশোধের চাপে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তারা এই মুহূর্তে ধান চাষের বীজ-সার কিনে ফসল লাগাবেন নাকি কৃষিকাজ ত্যাগ করে ঋণের সমুদয় টাকা পরিশোধ করবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না।
নোটিশের হুলিয়ায় দিশেহারা আরো একাধিক কৃষক জানান, সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রিকালে বেশ কয়েকজন কৃষকের কাছ থেকে ঋণের পাওনা হিসেবে ধান বিক্রির টাকা নিয়ম বহির্ভূতভাবে আদায় করেছে উপজেলা কৃষি ব্যাংক। কিন্তু পাবলিক বাজারে ধানের মূল্য ৫শ টাকা থেকে ৬শ টাকার মধ্য উঠানামা করায় প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচই পাওয়া যাচ্ছ না। এমতাবস্থায় ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহে এমনিতেই বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছেন। হিমশিম খাচ্ছেন সাংসারিক ব্যয় নির্বাহে। এরমাঝে ঋণের চাপে পড়ে কৃষকদের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। টাস্কফোর্সের নোটিশে উল্লেখিত গ্রেফতার ও জেল জরিমানার ভয়ে অভাবি কৃষকরা অবশিষ্ট জমি বাড়ি, গরু ছাগল সহায় স¤পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে দৌড়ঝাঁপ করছেন।
জামালগঞ্জ কৃষি ব্যাংক শাখার ম্যানেজার উৎপল রঞ্জন ভট্টাচার্য জানান, এই শাখা থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত কৃষিঋণের গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। এতে অনেক ঋণের সুদ-আসলে গ্রাহকের কাছে বকেয়া পাওনা আছে প্রায় ১৬ কোটি ৫০লাখ টাকা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর বৈশাখী বোরো-ইরি ফসল তোলার পর সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির সময়ে কৃষিঋণের অনেক গ্রাহকের কাছ থেকে এসব বকেয়া ঋণের কিস্তি আদায়ে কিছু কিছু কৃষকের কাছে থেকে কর্তন করে নিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ব্যাংকের শাখা ম্যানেজার জানান, খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির সময়ে কোন কৃষকের কাছ থেকে ঋণ পরিশোধ খাতে কোন টাকা কর্তন করে রাখা হয়নি। এর কারণ হিসেবে ব্যাংক সূত্র জানায়, সরকারি খাদ্যগুদামে সরকারের নির্ধারিত মূল্যে ধান সরবরাহকালে কৃষিকার্ডধারী যেসব কৃষকের নামে ধান সরবরাহ করা হয় তাতে তৃণমূল কৃষকরা আসেন না। মূলত সে সুবিধা নিচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গনের লোকেরা। প্রান্তিক কৃষকের নাম ভাঙিয়ে তাদের কাছ থেকে কথিত মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রতিটি কার্ড দুই হাজার টাকা থেকে তিন হাজার টাকায় ভাড়া করে এনে খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করেন। সেসময় ঋণধারী কৃষকের কৃষি কার্ডের অনুকূলে ঋণের পাওনা আদায় করতে গেলে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া ও রাজনৈতিক লোকদের হুমকি ধামকি ও চাপের মুখে পড়ে অনাদায়ী ঋণের আংশিক কিস্তিও আদায় করতে পারে না ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
জামালগঞ্জ কল্যাণ পরিষদের সাধারণ স¤পাদক লিটন সরকার জানান, গত ১৬ জানুয়ারি জামালগঞ্জ উপজেলায় আমরা মানববন্ধন করেছি এই ফসল লাগানোর সময়ে যাতে টাস্কফোসের্র কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সুনামগঞ্জের মুখ্য আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক রাজীব চন্দ্র সাহা এ বিষয়ে বলেন, টাস্কফোর্সের কার্যক্রম সিলেট ডিভিশন, চিটাগাং ডিভিশন, কুমিল্লা ডিভিশনসহ সব জায়গায় একযোগে চলতেছে। তিনি বলেন, আমরা সাধারণত কৃষককে লোন দেই ঋণ প্রদানের দেড় বছরের মাথায় তা পরিশোধের শর্ত মোতাবেক। সে সময়ের পরে থেকে যদি ঋণ গ্রহিতা ঋণ পরিশোধ না করে তবে তাকে আমরা একটা সাধারণ নোটিশ দিয়ে তাগিদ দেই। যে সমস্ত লোনগুলো সে সময় থেকে ৩/৪বছর অতিক্রম করেছে তাদেরকে আমরা এই নোটিশ ইস্যু করতেছি লোনটা আদায়ের জন্য। হাওরাঞ্চলে চলতি বোরো-ইরি মৌসুমে কৃষকদের ঋণ পরিশোধের অক্ষমতার বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা তো কৃষকদেরকে এই মুহূর্তে শতভাগ ঋণ পরিশোধ করতে হবে এমনটা বলতেছি না। আমরা বলতেছি অন্তত সুদের টাকা দেন, সুদের টাকার অর্ধেক হলেও দেন। বাকিটা আবার রিনিউ করে দেব আপনাকে। খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি কালে কৃষি ব্যাংক কর্তৃক টাকা কর্তন করে রাখা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষি ব্যাংক তো এনজিওর মতো এরকম টাকা কেটে রাখে না। গ্রাহকের সেভিংস অথবা কারেন্ট একাউন্ট থেকে ঋণের টাকা আমরা কর্তন করে রাখিনা। কৃষি ব্যাংকের কোন শাখা যদি এরকম টাকা কেটে রাখে তবে প্রমাণসহ দেন, আমি সরাসরি যাব। তিনি আরো বলেন সুনামগঞ্জের ইউনিয়ন পর্যায়ের একেকটি ব্রাঞ্চে সর্বনিম্ন কৃষিঋণ ৩ কোটি টাকা থেকে বিভিন্ন ব্রাঞ্চে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকার অধিক পর্যন্ত ব্লক হয়ে পড়ে আছে। কৃষিঋণের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মিটিংয়ে এ বিষয়টি সরাসরি উত্থাপন করা হয়েছে। খেলাপিদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। তাই আমরা নির্দেশনা অনুসরণ করতেছি।
এ ব্যাপারে সংসদ সদস্য অ্যাড. শামীমা শাহরিয়ার বলেন, সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে এ বিষয়ে আমি কথা বলবো। যাতে ফসল ঘরে তোলার আগে পর্যন্ত কৃষকদের হয়রানি না করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী