বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ০৮:৩০ অপরাহ্ন

Notice :

অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের ছড়াছড়ি : বরাদ্দ অপচয়ের পাশাপাশি সীমাহীন দুর্নীতির শঙ্কা

শহীদনূর আহমেদ ::
২০১৭-এর কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরের বোরো ফসল সুরক্ষায় শুরু হয়েছে বাঁধ নির্মাণের কাজ। বাঁধ নির্মাণের শুরুর দিকেই পিআইসি গঠনে নীতিমালা না মানা, বিগত বছরের চেয়ে অধিক প্রকল্পের অনুমোদন, অপ্রয়োজনীয় স্থানে বাঁধ নির্মাণ, ক্ষেত্র বিশেষে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক বরাদ্দসহ বাঁধ নির্মাণ সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে বিতর্ক উঠেছে।
২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে চেয়ে চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত প্রকল্প অনুমোদন ও কাজের তুলনায় অধিক বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টিকে সরকারি বরাদ্দ অপচয়ের পাশাপাশি সেখানে সীমাহীন দুর্নীতি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাঁধ নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কর্তাব্যক্তিরা। কোনো কারণ ছাড়াই অধিকাংশ উপজেলায় প্রতিযোগিতা করে বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পের সংখ্যা (পিআইসি)। অনেক প্রকল্পে গত বছরের চেয়ে দেয়া হয়েছে অধিক বরাদ্দ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অতিরিক্ত বরাদ্দ ও প্রকল্প বাড়ানোর ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে ধর্মপাশা উপজেলা। এই উপজেলায় প্রাক্কলিত প্রকল্পের অর্ধেকই অপ্রয়োজনীয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এক্ষেত্রে এর পরের অবস্থানে আছে সুুনামগঞ্জ সদর। গত বছরের চেয়ে তিনগুণ বেশি প্রকল্প নেয়া হয়েছে এই উপজেলায়, যার বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয়। এছাড়াও শাল্লা, জামালগঞ্জ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলায় অনেক অপ্রয়োজনীয় স্থানে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের দায়িত্বশীলদের অভিযোগ, এ বছর জেলায় প্রকল্প বাড়ানোর সাথে সাথে বাড়ানো হয়েছে বরাদ্দের পরিমাণ। বোরো ধানের সাথে সম্পর্কহীন স্থানে প্রকল্প গ্রহণ, বাঁধের টাকায় গ্রামের রাস্তা নির্মাণসহ গত বছরের ভালো বেড়িবাঁধে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন হাওরে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয়ের পাশাপাশি অনেকেই বরাদ্দের টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে হজম করার পাঁয়তারা করবেন বলে অভিযোগ তাদের। যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত প্রকল্প বাতিলের দাবি জানিয়েছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত অর্থ বছরে ৫৭২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে ৫৪১ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। বাঁধ নির্মাণের জন্য ৮০ কোটি ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। বরাদ্দের টাকায় নির্মিত বাঁধের ফলে সে সময় নিরাপদে বোরো ফসল ঘরে তুলে নেন কৃষকরা।
জানা যায়, চলতি অর্থ বছরে জেলার ১১ উপজেলায় ৬৩৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ৭৪৪টি পিআইসি গঠন করা হয়। এর জন্য ১৩২ কোটি ১৭ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠায় পাউবো। প্রথম ধাপে ৬৭৮টি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সংশ্লিষ্ট দপ্তর। যেখানে গত বছরের চেয়ে দেড়শ প্রকল্প বেশি। বরাদ্দের পরিমাণও চাওয়া হয়েছে দ্বিগুণ।
জানা যায়, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অতিরিক্ত প্রকল্প গঠন করা হয়েছে ধর্মপাশা উপজেলায়। গত বছর ৮৯টি পিআইসি’র মাধ্যমে ১৪ কোটি টাকা দিয়ে ৬৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলেও এবার প্রকল্পের পরিমাণ দ্বিগুণ করে ১৭৪টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। ১৬৮ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি, অর্থাৎ ৩৩ কোটি টাকা। ধর্মপাশার অতিরিক্ত প্রকল্পের সবগুলো অপ্রয়োজনীয় বলে দাবি কৃষকদের।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় গত বছর বাঁধ নির্মাণে ৯টি পিআইসি’র জন্য মাত্র ৬২ লাখ টাকা ব্যয় করলেও এবার ২৭টি পিআইসির জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অনুমোদিত ২৭ পিআইসির মধ্যে বোরো জমির সংশ্লিষ্টতা নেই এমন স্থানে, অর্থাৎ চলতি নদীর তীরে ১৪টি প্রকল্পকে অপ্রয়োজনীয় দাবি করে এইগুলো বাতিলের জন্য স্থানীয়রা লিখিত আবেদন জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।
এদিকে, বিগত বছরের চেয়ে অধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে শাল্লা উপজেলায়। গত বছর ১১৫টি পিআইসি’র মাধ্যমে ১৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৯২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হলেও এবার প্রকল্প বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৭টি। গত বছরের বাঁধসহ নতুন করে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে ৯৬ কিলোমিটারের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
জামালগঞ্জ উপজেলায় গত বছরের ৫৩টি পিআইসি থেকে বেড়ে এবার অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৬৯টি পিআইসি। যার ব্যয় গত বছরের চেয়ে ২ কোটি টাকা বেশি।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় গত বছর ১৬টি প্রকল্প গ্রহণ করে ফসলরক্ষা করা হলেও এবার প্রকল্প বৃদ্ধি করে ২৬টি পিআইসির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। যার ব্যয় গত বছরের চেয়ে আড়াই কোটি টাকা বেশি।
এদিকে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় গত অর্থ বছরের ৪২টি পিআইসির মাধ্যমে ৩৮ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও, এবার ৫০টি পিআইসির জন্য তিনগুণ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ৪৯ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
দোয়ারাবাজার উপজেলায় গত বছরে ২৩টি পিআইসি নেওয়া হলেও এবার তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩৪টিতে। এই উপজেলায় গত বছরের চেয়ে সাড়ে তিন কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, তাহিরপুর উপজেলায় গত বছর ৬৬টি পিআইসির মাধ্যমে ৫৫ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের জন্য ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেও এবার তা বৃদ্ধি করে ৭০টি পিআইসি’র মাধ্যমে ৭৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। টাকার অঙ্কে গত বছরের চেয়ে দেড় কোটি বেশি। ছাতক উপজেলায় ৭টি পিআইসি থেকে বৃদ্ধি করে ১১টি পিআইসি’র অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
অপরদিকে, গত বছরের চেয়ে এবার জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলায় দুয়েকটি পিআইসি কমলেও বেড়েছে বরাদ্দের পরিমাণ। গতবছর জগন্নাথপুর উপজেলায় ৫০টি পিআইসির জন্য ৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও এবার ৪৫টি পিআইসির জন্য চাওয়া হয়েছে ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। দিরাই উপজেলায় গত বছর ১০২টি পিআইসিতে ১৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও এবার ১০১টি পিআইসির জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ১৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, গত বছরে সাড়ে ৫শ প্রকল্পের মাধ্যমে সুনামগঞ্জের হাওরের ফসল রক্ষা হলেও এবার এবার অহেতুক প্রকল্পের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে প্রতি উপজেলায় প্রতিযোগিতা করে পিআইসি বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত এবং অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে সরকারের কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হচ্ছে। এই সকল অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিলের দাবি জানান তিনি।
প্রকল্প বৃদ্ধির ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে পিআইসির তালিকা অনুমোদনের জন্য জেলা কমিটির কাছে পাঠায়। পরবর্তীতে জেলা কমিটি ৬৭৮টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে। কিছু পিআইসি নিয়ে অভিযোগ আছে। জেলা প্রশাসন ইতোমধ্যেই প্রকল্প যাচাই কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারা মাঠপর্যায়ে প্রকল্প যাচাই করে রিপোর্ট দিলে প্রকল্প কার্যকর হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী