শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:০৩ অপরাহ্ন

Notice :

শিশুর প্রতি নৃশংসতা বাড়ছেই

বিশেষ প্রতিনিধি ::
সুনামগঞ্জে শিশুর প্রতি পারিবারিক নৃশংসতা বাড়ছে। পারিবারিক দ্বন্দ্বে একের পর এক নির্মমভাবে খুন হচ্ছে শিশু। পরিবারের বড়দের বিরোধে বলি হচ্ছে কোমলমতি প্রাণ। এর মধ্যে দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামের সাড়ে ৫ বছরের শিশু তুহিন হত্যা জাতীয়ভাবে নাড়া দিয়েছে। তুহিনকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে জবাই করে, দুই কান ও লিঙ্গ কেটে পেটে দুটি ছুরি ঢুকিয়ে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। তুহিন হত্যায় বাবা, চাচা ও চাচাতো ভাই জড়িত থাকার অভিযোগে আদালতে বিচারকাজ শুরু হয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১১ জানুয়ারি শনিবার ভোররাতে তাহিরপুরে সাত বছরের শিশু তোফাজ্জল হোসেনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তার চোখ উপড়ে হত্যা করে বস্তাবন্দি লাশ ফেলে রাখা হয় প্রতিবেশীর বাড়ির পেছনে। এই ঘটনায়ও চাচা ফুফুসহ ৭জনকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। পুলিশ এক চাচার বসতঘরের ওয়ারড্রব থেকে রক্তমাখা লুঙ্গি ও বালিশ উদ্ধার করেছে। এর আগে ছাতকের বাতিরকান্দি গ্রামে ২০১৫ সালে মসজিদের বারান্দায় ৫ বছরের শিশু মোস্তাফিজুর রহমান ইমনকে হত্যা করে তিন টুকরো লাশ হাওরে পুতে রাখা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডে সম্প্রতি চারজনের ফাঁসি দিয়েছেন আদালত।
গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাতে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে শিশু তুহিনকে নির্মমভাবে হত্যা করে স্বজনেরা। পুলিশ এ ঘটনায় তুহিনের বাবা, তিন চাচা ও এক চাচাতো ভাইকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত দেখিয়ে গত ৩০ ডিসেম্বর চার্জশিট দিয়েছে। গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আনোয়ার মেম্বারের সঙ্গে মামলার বিরোধের জের ধরেই প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শিশু তুহিনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাকে জবাই করে দুই কান ও লিঙ্গ কেটে পেটে দুটি ছুরি বিদ্ধ করে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। নৃশংস এ ঘটনার প্রতিবাদে দেশব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই নৃশংসতা নিয়ে বক্তব্য দেন। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে আড়াই মাসের মাথায় বিচারকাজ শুরু হয়েছে। গত ১৩ জানুয়ারি আদালতে সাক্ষী দিয়েছেন তুহিনের মা মনিরা বেগমসহ ৫ জন। তবে মনিরা বেগম কে তার ছেলেকে হত্যা করেছে জানেন না বলে আদালতকে জানান। তার স্বামী আব্দুল বাছিরের সঙ্গে দেবর নাসিরের প্রায় ৬ মাস ধরে পারিবারিক বিরোধ নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল এবং কথা বন্ধ ছিল বলে আদালতকে জানিয়েছেন।
এদিকে এই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত গ্রাম বাঁশতলার জোবায়ের হোসেনের সাড়ে ৭ বছরের শিশু তোফাজ্জল হোসেনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। গত ৮ জানুয়ারি নিখোঁজের পর ৯ জানুয়ারি ৮০ হাজার টাকা মুক্তিপণের চিরকুট লিখে তোফাজ্জলের জুতাসহ বাড়ির সামনে ফেলে রেখে যায় ঘাতকেরা। মুক্তিপণ না দেওয়ায় গত ১১ জনুয়ারি শনিবার ভোররাতে বাড়ির পার্শ্ববর্তী তোফাজ্জলের দাদার চাচাতো ভাইয়ের বাড়ির পিছনে বস্তাবন্দি লাশ পান স্বজনেরা। শিশুটির চোখ উপড়ানো ছিল ও পা ভাঙা ছিল। এ ঘটনায় ওইদিন রাতেই চাচা, ফুফু, ফুফুর স্বামী ও শ্বশুর এবং শিশু তোফাজ্জলের দাদার চাচাতো ভাই ও ভাতিজাসহ ৭জনকে আটক করে পুলিশ। তাছাড়া ফুফুর পরিবারের সঙ্গে তোফাজ্জলের বাবার পরিবারের লোকদের বিরোধ ও মামলা ছিল। গত ১৪ জানুয়ারি আদালতে ১৬৪ ধারায় তোফাজ্জলের দাদার চাচাতো ভাইয়ের ছেলে সারোয়ার হাবিব রাসেল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে ভাতিজাকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা স্বীকার করে। জবানবন্দির পর রাসেলের শয়নকক্ষের বক্সখাট ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা রক্তমাখা লুঙ্গি, রক্তমাখা দুটি তোয়ালে, মুক্তিপণের চিরকুটের খাতা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় সাতজনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসা করছে পুলিশ। এ ঘটনায়ও পরিবারের লোকজন জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অন্যদিকে ২০১৫ সালের ২৭ মার্চ ছাতকের বাতিরকান্দি গ্রামের শিশু শ্রেণির ছাত্র মোস্তাফিজুর রহমান ইমন অপহরণ করে ঘাতকরা। মসজিদের ইমাম সুয়েবুর রহমান সুজনসহ তিনজন মিলে ইমনকে অপহরণ করে। টাকা না পেয়ে মসজিদের বারান্দায় জবাই করে হত্যা করে লাশের টুকরো হাওরে ফেলে দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ঘাতক ইমাম সুয়েবুর রহমান সুজনসহ চারজনকে ফাসির দণ্ড দেন। ইমামের সঙ্গে শিশু ইমনের প্রতি এই নৃশংসতায় নিকটাত্মীয়রাও জড়িত ছিলেন।
এভাবে একের পর এক শিশুদের নৃশংসভাবে খুন করা হচ্ছে। পরিবারের লোকজনের এমন নৃশংসতায় হতবাক হচ্ছেন মানুষ। নিজেদের সন্তানের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা মানবতাকেও কলঙ্কিত করছে।
সুনামগঞ্জ জেলা খেলাঘরের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রভাষক দুলাল মিয়া বলেন, আমাদের সুনামগঞ্জে সম্প্রতি কয়েকটি শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে পরিবারের লোকজনই জড়িত বলে জানাগেছে। শিশুর প্রতি স্বজনদের এমন বর্বরতা ভাবাই যায় না। অনেক মানুষ বিবেকবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে দানবে পরিণত হচ্ছে। তিনি বলেন, বুনো পশু পাখিও নিজের সন্তানের প্রতি এমন অমানবিক হয় না। মানুষ হয়ে কিভাবে এমন নৃশংসতা চালাতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের সবার মানবিক মূল্যবোধ জাগানো দরকার।
অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, আমাদের সুনামগঞ্জে পারিবারিক নৃশংসতার শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। এমন বর্বর কাণ্ডে গোটা জাতি হতবাক হচ্ছে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের কাছে না ফিরলে অসহিষ্ণু সমাজে এমন কলঙ্কজনক ঘটনা বাড়তেই থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী