শনিবার, ০৬ মার্চ ২০২১, ০৫:৪৩ পূর্বাহ্ন

Notice :

সেচের পানি নেই : দোয়ারায় বোরো চাষ অনিশ্চিত

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী ::
দোয়ারাবাজার উপজেলার হকনগর স্লুইসগেট পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির আওতায় এ বছর বোরো চাষাবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট স্লুইসগেট পানি ব্যবস্থাপনা সমিতি কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কারণেই এ বছর উপজেলার সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন হাওরের হাজার হাজার হেক্টর বোরো জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বোরো চারা উৎপাদনের ভর মৌসুমেও পানি পাচ্ছেন না এখানকার কৃষকরা। গত রোববার এলাকাজুড়ে মাইকিং করা হয়- “স্লুইসগেটে ত্রুটি থাকার কারণে এ বছর বোরো চাষাবাদে সেচের পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে না”। সমিতি কর্তৃপক্ষের এমন ঘোষণায় সীমান্ত এলাকার কৃষকরা এখন চরম হতাশায় ভোগছেন। পানির অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হলে এবার কৃষকের গোলায় বোরো ফসল উঠবেনা বলে জানিয়েছেন তারা।
জানাযায়, স্লুইসগেটের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ড্রেন ও বেড়িবাঁধ সংস্কার না করায় স্থানীয় মৌলা নদীর উজানের পানি ব্যবহার করে বোরো চাষাবাদ এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে এলজিইডি ও পানি ব্যবস্থাপনা সমিতি কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা গেছে। নানা কারণ দেখিয়ে তারা এখন দায়সারা বক্তব্য দিচ্ছেন। অপরদিকে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ায় স্বস্তিতে নেই সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার বোরো চাষি।
তবে হকনগর পানি ব্যবস্থাপনা সমিতি কর্তৃপক্ষ বলছে, ৬ মাস পূর্বেই ড্রেন সংস্কার ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় স্থানীয় এলজিইডি কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হলেও এ নিয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি সংশ্লিষ্টরা। ফলে এবছর কৃষকদের পানি সরবরাহ সম্ভব হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে পানি ব্যবস্থাপনা সমিতি।
জানা যায়, ২০০৪ সালে সীমান্ত এলাকার কৃষকদের বোরো চাষের আওতায় নিয়ে আসতে স্থানীয় সরকার বিভাগ দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের হকনগর মৌলা নদীতে একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করে। স্লুইসগেটটি নির্মিত হওয়ার পর থেকে বাঁশতলা, কলোনী, জুমগাঁও, পেকপাড়া, মৌলারপাড়, আলমখালি, নতুন বাঁশতলা, চৌধুরীপাড়াসহ অন্তত ৭/৮টি গ্রামের কৃষক ওই নদীর পানি দিয়ে বোরো চাষসহ মৌসুমী সবজি চাষ করে। আর স্লুইসগেটের আওতায় প্রায় তিন সহ¯্রাধিক উপকারভোগী কৃষকদের মধ্যে নদীর পানি সমবণ্টনের জন্য শুরু থেকে ‘হকনগর পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি’ সার্বিক দেখভাল করে আসছে।
চৌধুরীপাড়া গ্রামের মুজিবুর রহমান মাস্টার বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির নামে অর্থ লুটপাট হচ্ছে। প্রায় অর্ধ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেন নির্মাণ করার পরও কৃষক পানি পাবেনা তা মেনে নেয়া যায় না। এ বছর পানি না পেলে আমরা আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হবো।
বাঁশতলা গ্রামের কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, হকনগর স্লুইসগেটের আওতায় উজানের পানি সরবরাহ করে আমরা বোরো চাষাবাদ করি। এখানকার পানি দিয়েই আমরা প্রতিবছর হাজার মণ বোরো ধান উৎপন্ন করি। কিন্তু এবছর আমরা সমিতির সভাপতির গাফিলতির কারণে পানি পাবো না। এ কারণে কৃষককুলকে এবার না খেয়ে মরতে হবে।
জুমগাঁও গ্রামের কৃষক ও সাবেক ইউপি সদস্য হাসিব উদ্দিন বলেন, এ বছর আমরা পানি পাবোনা, এর দায়ভার কারা নেবে? পানির অভাবে বোরো চাষাবাদ করতে না পারলে আমাদের পথে বসতে হবে।
সমিতির সদস্য মোস্তফা গাজী জানান, সমিতির শুরু থেকে এ যাবৎ কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। হিসাব চাইলে সমিতির সভাপতি গড়িমসি করেন। তার নেতৃত্বে সমিতির অর্থ লুটপাটে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
বাঁশতলা গ্রামের উপকারভোগী কৃষক বুরহান উদ্দিন বলেন, সমিতির দায়িত্বশীলদের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়মের বিরুদ্ধে আমি গত দুই বছর ধরেই কথা বলে আসছি। কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। এবছর কৃষকরা পানি পাবেনা তা মেনে নেয়া যায় না।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ জানান, আমার কাছে সমিতির আর্থিক কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। সবই সভাপতি জানেন। আর ড্রেনেজ সমস্যা দূর করতে আমরা স্থানীয় এলজিইডি কর্তৃপক্ষকে অনেক আগেই অবহিত করেছি। তারা সরেজমিন পরিদর্শনও করেছেন। কিন্তু বোরো মৌসুম শুরুর পূর্বে তা সমাধান না করায় চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকদের পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
তবে স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগগুলো অস্বীকার করে হকনগর পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির সভাপতি আব্দুল আহাদ বলেছেন, প্রায় ১ লাখ টাকা আমার হাতে আছে। আর বাকি টাকা সমিতির তহবিলে ব্যাংকে জমা রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ড্রেনেজ সমস্যা থাকায় এ বছর পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে আমাদের কি করার আছে।
সমিতির নানা অনিয়ম বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মৈত্রেয়ী আচার্য্য বলেন, হকনগর সমিতির অব্যবস্থাপনার ব্যাপারে আমি ইতিপূর্বে অবগত হয়েছি, তবে এর সত্যতা খতিয়ে দেখিনি।
বাংলাবাজার ইউপি চেয়ারম্যান জসিম মাস্টার বলেন, ড্রেনেজ সমস্যা ও স্লুইসগেটের ত্রুটির কারণে এবার কৃষকরা পানি না পেলে এর সম্পূর্ণ দায়ভার পানি ব্যবস্থাপনা কমিটিকে নিতে হবে। তাদের গাফিলতির কারণেই এমন সংকট দেখা দিয়েছে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা এলজিইডি’র উপসহকারী প্রকৌশলী সাদিরুল ইসলাম বলেন, হকনগর স্লুইসগেটের ড্রেন সংস্কারের ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো চাহিদা পাঠানো হয়নি। জুন মাসের পূর্বে চাহিদা প্রেরণ করা হলে হয়তো এর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী