বৃহস্পতিবার, ০৪ মার্চ ২০২১, ১২:২২ অপরাহ্ন

Notice :

ত্রিশ গজের সীমানায় সীমাহীন কোন্দল

মাসুম হেলাল ::
‘পুরান বাস স্টেশন থেকে কামারখাল’ কিংবা ‘ওয়াপদা পয়েন্ট থেকে কাজির পয়েন্ট’ – এই ত্রিশ গজের সীমানার মধ্যে যখন বিএনপি’র দলীয় কর্মকাণ্ড, সেই পরিস্থিতিতেও দলটিতে কোন্দল থেমে নেই। সীমাহীন অন্তর্কোন্দলে জর্জরিত দীর্ঘ ১১ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজপথের বিরোধীদল বিএনপি। দুঃসময়ে ঐক্যের পরিবর্তে জেলা থেকে, উপজেলা কিংবা ইউনিয়ন পর্যন্ত বিবাদের বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছেন দলের নেতাকর্মীরা। বিবাদ নিরসনে স্থানীয় কিংবা কেন্দ্রীয় উদ্যোগ না থাকায় ক্রমেই বাড়ছে কোন্দলের মাত্রা।
সুনামগঞ্জ বিএনপি’র রাজনীতিতে দুটি গ্রুপের কোন্দল দৃশ্যমান থাকলেও তলে তলে সক্রিয় বেশ কয়েকটি গ্রুপ। তাদের কারোর সাথেই কারোরই সম্পর্ক কিংবা সমন্বয়ও নেই। দলের অভ্যন্তরে সমন্বয়হীনতা আর সরকারি চাপ- দু’য়ে মিলে দুর্বল হয়ে ওঠছে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি।
বিএনপি’র রাজনীতিতে দৃশ্যমান দুটি গ্রুপের একটির নেতৃত্বে আছেন জেলা বিএনপি’র সভাপতি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন ও সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নূরুল। অপর পক্ষের নেতাকর্মীরা সক্রিয় চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা সাবেক হুইপ ফজলুল হক আছপিয়ার নেতৃত্বে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ফজলুল হক আছপিয়ার হয়ে মাঠ পর্যায়ের সভা-সমাবেশে প্রথম সারিতে দেখা যায় জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি নাদির আহমদ, আকবর আলী, সেলিম উদ্দিন আহমদ ও জেলা যুবদলের সভাপতি আবুল মনসুর শওকত, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান প্রমুখকে।
জানা যায়, মহাজোট সরকারের গত মেয়াদে ঐক্যবদ্ধ থাকায় বিএনপি’র সভা-সমাবেশসহ দলীয় কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে অনেকটাই শিথিলতা দেখাতো আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। মিছিল নিয়ে পুরো শহর প্রদক্ষিণের সুযোগ পেতেন নেতাকর্মীরা। সমাবেশ করতে পারতেন শহরের প্রাণকেন্দ্রে। গত নির্বাচনের পর থেকে দলীয় গ্রুপিং চরম আকার ধারণ করায় সাংগঠনিক শক্তিও দুই ভাগ হয়ে যায়। কর্মসূচি পালনের জন্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অলিখিতভাবে বেধে দেওয়া ৩০ গজের সীমানার মধ্যে থাকতে হচ্ছে নেতাকর্মীদের।
দলীয় সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২৬ মে নাছির-মিলনের নেতৃত্বাধীন আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন মিলনকে সভাপতি ও তৎকালীন জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নূরুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনিপর ৫১ সদস্যের আংশিক কমিটি অনুমোদন দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর প্রায় দুই বছর পর চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করা হয়।
আংশিক কমিটি গঠনের সময় বর্তমান সভাপতি কলিম উদ্দিন মিলন ছাড়াও দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন, মিজানুর রহমান চৌধুরী, নাদির আহমদ জেলা বিএনপি’র সভাপতি প্রার্থী ছিলেন। কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব থাকার পরও তাদের মধ্য থেকে মিলনকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হলে নাখোশ হন বাকিরা। আর সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়েও ছাত্রদল নেতা নূরুল ইসলামের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল জেলা যুবদলের সভাপতি আবুল মনসুর শওকতের। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে আসনভিত্তিক দ্বন্দ্বে জড়ান অনেকে। এরপর থেকে অনেকগুলো গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে জেলা বিএনপি।
পরবর্তী গত আগস্ট মাসে বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন উপলক্ষে জেলা যুবদলের সভাপতি আবুল মনসুর শওকতকে পাশ কাটিয়ে সিনিয়র সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠানের পর থেকে দলীয় গ্রুপিংয়ে নতুন মাত্রা পায়। এরপর থেকে জেলা কমিটিকে পাশ কাটিয়ে প্রতিটি কেন্দ্রীয় কর্মসূচি সদর ও পৌর বিএনপি’র ব্যানারে পালন করছেন আছপিয়া অনুসারী নেতাকর্মীরা। এরপর থেকে আর একসাথে বসার সুযোগ হয়নি তাদের। বিপরীতে দ্বন্দ্বের মাত্রা বেড়েই চলছে। গ্রুপিং রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।
আছপিয়া অনুসারীদের দাবি, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে দলীয় কোন্দল। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে করে তারা বলেছেন, ব্যক্তিগত রেষারেষিকে দলীয় পর্যায়ে নিয়ে এসে গ্রুপিং করছেন তারা।
জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি নাদির আহমদ বলেন, তাদের সাথে আমাদের বিরোধ সম্পূর্ণ নীতিগত। তারা বিভিন্ন উপজেলায় সরকারি দলের এজেন্ট হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনার চেষ্টা করছেন। মহিলা দল, শ্রমিক দল, মৎস্যজীবী দলের জেলা কমিটি দলীয় ফোরামে আলোচনা না করে গঠন করেছেন। জেলা বিএনপি’র কমিটিতে মিলন সাহেবের অনুসারী ছাতক-দোয়ারার ৪৭ জন নেতাকর্মী জায়গা পেয়েছেন। এতে করে অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী বঞ্চিত হয়েছেন। সভাপতি ছাতক থেকে অতিথির মতো এসে মিছিলে যোগ দিয়ে শেষ হলেই চলে যান। এভাবে দল চলতে পারে না। এইসব স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের পর তাদের সাথে এক হয়ে চালার সুযোগ থাকে না।
তিনি আরো বলেন, আমরা যখন ঐক্যবদ্ধ ছিলাম, তখন মিছিল নিয়ে সারা শহর প্রদক্ষিণ করতাম। এখন মিছিল শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যায়। পুলিশি বাধায় থেমে যায়। সংখ্যা দিয়ে অনেক সময় দল চলে না, পুড়খাওয়াদের মূল্যায়ন করতে হয়। এখন গ্রাম-গঞ্জের নিবেদিতপ্রাণ অনেক নেতাকর্মী দলীয় কর্মসূচি এড়িয়ে চলেন। এমন পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চলার পরিবেশ তৈরি করতে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককেই উদ্যোগ নিতে হবে।
জেলা বিএনপি’র অপর সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শেরেনূর আলী বলেন, দলের অভ্যন্তরে কোন্দল সৃষ্টির মতো কোন পরিস্থিতি আমি দেখছি না। যারা এটা তৈরি করছেন সেটা সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিগত রেষারেষি থেকে। প্রতিটি কর্মসূচির আগে তাদেরকে দাওয়াত দেওয়া হয়- তারপরও তারা স্বেচ্ছাচারিতার যে অভিযোগ করছেন সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি আরো বলেন, অঙ্গসংগঠনের কমিটি ঢাকা থেকে অনুমোদন হয়ে আসে। এ নিয়ে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে দোষারোপ করা যুক্তিযুক্ত না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী