শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২০, ১১:০১ অপরাহ্ন

Notice :

পাকিস্তানী আর্মিরা ৮ ঘণ্টা মানসিক নির্যাতন করে

অনুলিখন ও সম্পাদনা : শামস শামীম
১৯৭১। স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল সমগ্র দেশ। পাকিস্তানীদের শাসন-শোষণে বঞ্চিত জাতি কাক্সিক্ষত স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। পাকিস্তানী অপশাসন-শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে উন্মুখ সবাই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে কৃষক, মজুর, ছাত্র-শিক্ষকসহ সকল পেশার মানুষের মধ্যেই ঐক্য ও সংগ্রামের যুগপৎ ছায়া লক্ষণীয় ছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ও প্রেরণাদায়ক ভাষণ পুরো জাতিকে উজ্জীবিত করে স্বাধীনতার প্রশ্নে। জয়বাংলা স্লোগান জাতিরাষ্ট্রের অবিনাশী সুরে পরিণত হয়। এই সুরগাঁথায় এক সম্মোহন সবাইকেই স্পর্শ করে।
২৫ মার্চ কালরাতে জাতিনির্মূলে ইতিহাসের জঘন্যতম ভয়াবহ জেনোসাইড চালায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। তাদের সঙ্গী এদেশের জন্মপাপী কিছু কুলাঙ্গার। আমরা মফস্বলের কয়েকজন কৃষক পরিবারের তরুণ তখন ছাত্রত্ব অবসান শেষে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের অপেক্ষায়। ঢাকায় অবস্থান করি। রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও পত্র-পত্রিকা আর মানুষের আলোচনা থেকেই বুঝতে পারি দেশে বিরাট পরিবর্তন আসবে। জাতিকে ছুঁয়ে যাবে সেই পরিবর্তন। আমরা মেসে থাকি। পিসিএস (পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষা দিয়েছি সবে। ফলাফল প্রকাশের প্রহর গুণছি। ২৫ মার্চ রাতেও ঢাকায় আরামবাগ ডা. জিল্লুল হকের বাসার মেসে ছিলাম। রাতে বন্ধুরা মেসে খুনসুটি করছিলাম। আমাদের একজন বন্ধু ছিল পাকিস্তানী রাজনীতির ভাবাদর্শের। তাকে তর্ক ও যুক্তিতে কাবু করি আমরা। এর মধ্যে রাতেই মারণাস্ত্রের গর্জন শুনতে পাই। সঙ্গে সাধারণ নিরীহ মানুষের গোঙানির শব্দও শুনতে পাই আমাদের অবস্থানস্থল থেকে। এক অজানা আতঙ্কে রাত গুজরান করি। সীমাহীন অস্থিরতা নিয়ে রাত পোহায় আমাদের। ২৬ মার্চ সকালে বেরিয়ে দেখি রাস্তাঘাটে মানুষ নেই। যুদ্ধ বিধ্বস্ত শহর। সুনসান, নীরব। জেনোসাইডের চিহ্ন পথে পথে। চেনা শহরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর এমন নৃশংস বর্বরতা দেখে মনটা বিষণœ হয়ে গেল। কিছু কিছু দৃশ্য দেখার পর আর সহ্য হচ্ছিল না। মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক দেখি। মেসে ফিরে আসি। মেসের সবাই সিদ্ধান্ত নেই ঢাকা ছেড়ে নিজ নিজ বাড়ি চলে আসবো। যানবাহনের ব্যবস্থা তেমন না থাকায় হেঁটে হেঁটেই রওয়ানা দেই কয়েক শত মাইল দূরের দেশের একপ্রান্তের জনপদ সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে। আমরা এই অঞ্চলের চারজন তরুণ ছিলাম। একাত্তরের এক দুঃসহ সময়ে বাঁচার তাগিদে ঢাকা ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিলাম। পথে পথে ছিল বিপদের হাতছানি। কারণ পাকিস্তানী আর্মি ও মিলিশিয়ারা যুবক ও সংখ্যালঘু দেখলেই এগিয়ে আসতো। নির্যাতন করতো। নানা প্রশ্ন করে সন্দেহ হলেই নির্যাতন করতো। যার ফলে মানুষের মধ্যে ভীতি ও ক্ষোভ ছিল।
১৯৭১ সালের ওই সময় আমি থাকতাম ঢাকার আরামবাগে পল্লী চিকিৎসক ডা. জিল্লুল হকের বাসায়। ডা. জিল্লুল খুবই প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তাই পাকিস্তানীরা তাকে শান্তি কমিটির লোক বানিয়ে নেয়। তবে প্রস্তুতিযুদ্ধের সময় রাতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকজন আসতেন তার বাড়িতে। তিনি তাদের আপ্যায়ন করতেন, পাকিস্তানী সেনাদের বিষয়ে তথ্য দিতেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের আর্থিক সহযোগিতা করতেন। একাধিকবার এটা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। নানা পরামর্শ দিতেন মুুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের। পাকিস্তানীদের সঙ্গে থেকেও আড়াল থেকে দেশের পক্ষে তাঁর অবস্থানটি তখন আমার ভালো লাগে। উচ্চশিক্ষা নেওয়ার পর পেশাগত জীবনে প্রবেশে সর্বোচ্চ পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষমাণ আমরা। সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করে জনগণের জন্য ভালো কাজ করি এটা ডা. জিল্লুল হক চাইতেন। ঢাকা থাকলে বাঁচতে পারবনা আশঙ্কা ছিল তার। তাই তিনিই আমাদেরকে নিজ নিজ বাড়িতে চলে আসতে উদ্বুদ্ধ করেন।
ডা. জিল্লুল হকের বাসার মেসে থেকেই আমরা বন্ধুরা অবসর সময়ে পত্রিকার মাধ্যমে রাজনীতির উত্তপ্ত পরিস্থিতির খোঁজ নিতাম। গতিপ্রকৃতি বুঝতাম সংবাদপত্রের ভাষ্য থেকে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খবর আগ্রহ নিয়ে পড়তাম সকলে। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বক্তব্য পাঠেই স্বপ্ন দেখতাম তার ডাকেই, তার নেতৃত্বে বাঙালি শুধু রুখেই দাঁড়াবেনা, স্বাধীনতাও ছিনিয়ে আনবে। দেশের পক্ষের প্রগতিশীল পত্রিকাগুলোর ভাষ্যও ছিল তখন দেশের পক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষে। তারা মানুষের আকাক্সক্ষা তখন পাঠ করতে সক্ষম হয়েছিল বলে আমার মনে হয়।
মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি আরো অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিতও। পাকিস্তানী শোষণ থেকে বেরিয়ে আসতে এক অবিনাশী দ্রোহ ও অদম্য জাগরণ ছিল মানুষের মধ্যে। শুধু সময়ের অপেক্ষায় ছিলো সবাই। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঘর থেকে বেরিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো অগুণতি মানুষ। ৭ মার্চের ভাষণের পরেই প্রস্তুতিযুদ্ধ প্রকাশ্য হলো। চূড়ান্ত যুদ্ধের উত্তাপের দিকে যাচ্ছিল দেশ। সারাদেশেই তখন সাত মার্চের ভাষণের উত্তাপ।
২৫ মার্চের গণহত্যার পর আমরা কারফিউ অবস্থার মধ্যেও লুকিয়ে লুকিয়ে আশপাশের ঢাকার অবস্থা দেখে একেবারেই ভেঙে পড়ি। চেনা পরিবেশটা নেই। মনটা খারাপ হয়ে যায়। বিষণœ ডাক্তার জিল্লুল হকের মনও। আমাদের হতাশ অবয়ব দেখে তিনি পরামর্শ দিলেন যার যার বাড়ি চলে আসার জন্য।
২৭ মার্চের দিকে আমরা চারজন একসঙ্গে বাসা থেকে বের হই বাড়ির উদ্দেশ্যে। এর মধ্যে আমাদের দিরাইয়ের একজন পুলিশ ছিলেন। যিনি রাজারবাগে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তিনি অন্য সিপাহীদের সঙ্গে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে পিছিয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছিলেন। তিনি সেদিনের রাতের ভয়াবহতার কথা কিছু জানালেন আমাদের।
২৭ মার্চ। ঢাকা ছেড়ে বাড়ি আসার পথে লক্ষ করি চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা। ২৫ মার্চের ভয়াবহতা দেখে মানুষ ছুটছে অজানা গন্তব্যে। বৃদ্ধ, শিশু নারীরা অসহায়ের মতো ছুটছে। পথে ঘাটে এসব দৃশ্য দেখে মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। এভাবে দুই দিনে নানাস্থানে বিরতি দিয়ে হেঁটে হেঁটেই ভৈরবে আসি। ভৈরবে আমাকে বিহারী মনে করে আটক করে মুক্তিযোদ্ধাদের দল, আমাদের দলের অন্যদেরও। তারা নানা কথা জিজ্ঞেস করে। একটি স্কুলে আমাদের নিয়ে রাখে। সেখানেই রাতে থাকি আমরা। চোখে ঘুম নেই। আমাদের মুখে খাঁটি সিলেটি ভাষা শুনে তাদের ভুল ভাঙে। তারা সুনামগঞ্জ টাউনের বিভিন্ন পয়েন্ট মাঠঘাটের কথা জিজ্ঞাসা করে আমাকে। আমরা উত্তর দেই। বুঝতে পারে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান। বাড়ির উদ্দেশ্যে প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছি। তাই একসময় তারাও আমাদের নানা পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেয়।
তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবারও পথচলা শুরু হয়। আমরা শেরপুর হয়ে সেখান থেকে দুই রাত পরে আসি আজমিরিগঞ্জে। সেখানে আমাদের আবারও স্থানীয় লোকজনের জেরার মুখে পড়তে হয়। আমি তখন বলি- আমি জুবিলী হাইস্কুলের ছাত্র। স্কুলের স্যারদের নাম বলি। আমাদের জেলার ছাত্রনেতাদের নাম বলি। আজমিরিগঞ্জের সঙ্গে তখন সুনামগঞ্জের ভালো যোগাযোগ ছিল। অনেকে পড়ালেখা করতো সুনামগঞ্জে। তাই শহরের সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতো। আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তারাও বুঝতে পারে আমরা সাধারণ মানুষ। তারা একরাত স্কুলে রেখে আমাদের বিদায় করে দেয়। তখন চারজনের দলের মধ্যে আমরা দুইজন। আমি আর দিরাইয়ের পুলিশ সদস্য। রাজারবাগের সেই পলাতক পুলিশ সদস্যের নামটি মনে পড়ছে না। তিনি আমাদেরকে সারা পথ সাহস দিয়েছেন।
আজমিরিগঞ্জ থেকে আবারও পায়ে হেঁটে আমরা বাড়ির দিকে ছুটি। একরাত ওই পুলিশ সদস্যের বাড়িতে অবস্থান করি। সকালে তার বাড়ি থেকে রওয়ানা দেই আমি একা। চেনা পরিবেশে এখন কিছুট হাল্কা লাগছে। তখন বৈশাখ মাস। হাওরে ধান কাটা হচ্ছে। আইলগুলো জেগে আছে। ক্ষেতে ক্ষেতে মানুষ। একাই বাড়ির উদ্দেশ্যে আসছিলাম বৈশাখের ফসলি হাওর পাড়ি দিয়ে। মাঠে মাঠে সোনার ধান। ধানী গন্ধ বাতাসে নাকে অন্যরকম ঘ্রাণ এনে দেয়। দীর্ঘ ক্লান্তিতে ধানীগন্ধ কিছুটা সজীবতা আনে প্রাণে। হাঁটতে কিছুটা জোর পাচ্ছিলাম।
২ এপ্রিল। পথের ও বিভিন্ন এলাকার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বাড়ি ফিরি। তখন বৈশাখ মাস। হাওরে ধান কাটছিলেন কৃষকরা। তাদের মুখেও যুদ্ধের কথা, শেখ মুজিবের প্রতিধ্বনি লক্ষ করি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গানও গাইছেন অনেকে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার মন্ত্রে যেন কৃষক শ্রমিক মজুর সবাইকেই জাগ্রত করতে পেরেছেন। আমার সাহস ও ভরসা বাড়ে। মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা লক্ষ করি। এই আকাক্সক্ষাই স্বাধীনতা এনে দেবে হলফ করেই বলা যায়।
২৫ মার্চের আগে আমি সিএসপি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকাতেই অবস্থান করছিলাম। ২৫ মার্চ জেনোসাইডই আমাকে বাড়ি আসতে বাধ্য করে। ১৯৭১ সনের আগস্ট মাস পর্যন্ত আশঙ্কা-উত্তেজনায় বাড়িতেই লুকিয়ে অবস্থান করি। যুদ্ধের মধ্যেই আগস্টের শেষ দিকে সিএসপি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। আমি উত্তীর্ণ হই। আমার বাড়ির ঠিকানায় চিঠি আসে। কিন্তু দেশের এই অবস্থায় খুশির বদলে অশান্তিই ছিল মনে। এত বড় সাফল্যেও খুশি ছিলাম না। সাধারণ পরিবারের সন্তান। কাজে যোগ দিতে হবে তাই পরিবারের এবং এলাকার সচেতন ব্যক্তিদের পরামর্শে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। ভীরু পায়ে বের হই বাড়ি থেকে। আবারও আশঙ্কা মনে। বিপদসংকুল পথ।
ঢাকায় তখন তুমুল যুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধের কারণে ঢাকা যাওয়ার রাস্তাঘাট এবং সেতুও বিধ্বস্ত। গাড়িও একটানা চলেনা। তাই বিমানেই সিলেট এয়ারপোর্ট থেকে ঢাকায় রওয়ানা দেই। আবারও সেই আরামবাগের ডা. জিল্লুল হকের সেই মেস বাসায়। সেখানে গিয়ে সরাসরি ওঠি। চাচার সঙ্গে দেখা করে আমার ফলাফলের কথা জানাই। তিনি খুব খুশি হন। ঢাকা সিএসপি কার্যালয়ে গেলে অফিসের সংশ্লিষ্টরা আমাকে বাড়ি থেকে পুলিশ রিপোর্ট নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তাই আবারও বাড়ির পথ ধরতে হয়। বিমানে ঢাকা থেকে সিলেট আসার সিদ্ধান্ত নিলাম।
পুলিশ রিপোর্টের জন্য বাড়ি আসতে ঢাকা বিমানবন্দরে উপস্থিত হই। বিমানবন্দরে পৌঁছার পর আমাকে পাকিস্তানী আর্মিরা আটকায়। পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দারা আমাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সোর্স মনে করে। তাদের চাহনিতে নানা প্রশ্ন ও সর্বনাশের প্রতিধ্বনি লক্ষ করি। কথোপকথনে বাঙালিদের প্রতি তারা কতটা বিদ্বেষ পোষণ করে অনুভব করি। আমি ভয় পেয়ে যাই। তবে মনোবল হারাইনি। তারা নানা প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। আমি তাদের প্রতিটি কথার কথার উত্তর দিচ্ছিলাম। আমাকে জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যে আশ্বস্ত হতে পারছিলনা সামরিক গোয়েন্দারা। তাই গোপন ও খাসকক্ষে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। শুনেছি এই কক্ষ থেকে কেউ সাধারণ জীবিত ফিরেনি। সেই কক্ষের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমি আজো ভুলতে পারিনি। সেই মানসিক নির্যাতন আমাকে যুদ্ধের পুরোটা সময় অস্থির রেখেছিল। আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম।
পাকিস্তানী গোয়েন্দা আর্মিরা খাস কক্ষে নিয়ে আমাকে তখন আওয়ামী লীগ, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও ছাত্রনেতাদের সম্পর্কে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে। একাধিকজন কড়া মেজাজে আমাকে পালাক্রমে প্রশ্ন করছিল। একসময় মেজর পদের কর্মকর্তা আমার শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন করে। তার প্রশ্নের উত্তরে জানাই আমি বৃত্তি নিয়ে পাকিস্তানে পড়ালেখা করেছি। আমি যে প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছি ওই সেনা কর্মকর্তাও ওই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র এবং ‘আমার জুনিয়র’ বলে আমাকে অবগত করে। এই কথায় আমার শুকিয়ে যাওয়া গলাটা ভিজে ওঠলো। ক্যাম্পাসের কিছু স্মৃতিচারণও করলো। সে আমাকে আশ্বস্ত করে চলে গেল। গিয়ে হয়তো তার সিনিয়র অফিসারদেরকে আমার সম্পর্কে পজেটিভ বলছিল। কিন্তু জুনিয়র হওয়ায় তার কথায় সিনিয়র অফিসাররা মনে হয় তেমন পাত্তা দিল না। আমি তখন ভয়ে দুর্বল হয়ে যাই। শুনেছি ওই সময়ে যারা পাকিস্তানী সেনাগোয়েন্দাদের ইন্টারগেশন সেলে গেছে কেউ আর ফেরেনি। তাদের পরস্পরের কথোপকথনেও সেই আভাস পাচ্ছিলাম। ভয় আমাকে ঘিরে ধরেছিল। এক ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করছিলাম। আমার চেহারায়ও আতঙ্ক ছিল।
সে এক দুঃসহ স্মৃতি। মৃত্যু যেন দুয়ারে উঁকি দিয়ে ডাকছে। যে কোন সময়ই তারা আমাকে হত্যা করতে পারে। ভাবছি কেউ জানবেনা আমার কি হয়েছিল। মৃত্যু পরিণতির কথা ভাবতে ভাবতে কান্না পাচ্ছিল খুব। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা আমাকে দফায় দফায় ৭-৮ ঘণ্টা বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। ভয়ে ক্ষুধাও চলে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনীতির বিষয়ে জানতে চাইছিল বেশি। এক পর্যায়ে আমার অবস্থান কোন পক্ষে সেটা জানতেই কৌশলে চেষ্টা করেছিল। আমাদের নেতাদের কথাও জানতে চাইছিল বারবার। কিন্তু আমি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না থাকায় এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারছিলাম না। এক পর্যায়ে একজন সিনিয়র আর্মি অফিসার জানতে চায় আমি ঢাকায় কোথায়, কার বাসায় থাকি, আসলে কি করি। তার কণ্ঠ গভীর ও ভারী। মৃত্যুদ-সহ যে কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারে এমন দৃঢ়তা ছিল তার কণ্ঠে-বক্তব্যে। তার প্রশ্নের উত্তরে তখন আমি ডা. জিল্লুল হকের নাম বলি। এবং তিনি যে পাকিস্তানপন্থী লোক সেটাও জানাই। ওই অফিসার আমার কাছে তার বাসার ঠিকানা ও ফোন নম্বর আছে কি না জানতে চায়। আমি ডা. জিল্লুল হকের বাসার ফোন নম্বর দেই। নম্বর নিয়ে আগে তারা কথা বলে। পরে আমাকেও কথা বলিয়ে দেয়। তিনি আমাকে অভয় দেন, ভাতিজা চিন্তা করোনা, তোমার আর কিছু হবেনা। আমি আসছি। ডা. জিল্লুল হক ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বিমানবন্দরে এসে আমাকে জল্লাদদের খাঁচা থেকে বের করে পুনর্জন্ম দেন। আমি নতুন জীবন পেয়ে সারাদিনের দুঃসহ স্মৃতির কথা ভাবছিলাম। সেদিনের কথা মনে হলো এখনো গায়ে কাটা দেয়। জল্লাদদের খাঁচায় সেই ৭-৮ ঘণ্টা সময় আমার চোখে এখনো ভাসে। তবে বিজয়ের পর এই আনন্দ ভুলে যাই। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করি। স্বাধীন দেশে এটা আমার পরম পাওয়া।
[২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর শান্তিগঞ্জস্থ হিজল বাড়িতে এই স্মৃতিকথা অনুলিখন হয়েছিল]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী