শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৩:৫৫ অপরাহ্ন

Notice :

সুনামগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে মাল্টিমিডিয়া ও আমার ভাবনা : রোকসানা ইয়াসমিন

যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্ব এগিয়ে চলছে। হাইটেক প্রযুক্তি প্রভাব ফেলেছে শিখন ও জীবন যাপনে। প্রযুক্তির কল্যাণে মুক্ত পৃথিবীর বাসিন্দারা এখন সহজেই কাঙ্ক্ষিত সেবা নিতে পারছেন। কিন্তু আমরা কতটুকু এগোচ্ছি; বা আমাদের সুনামগঞ্জ কতটুকু অগ্রসর সেদিকে? এই প্রশ্ন আজও আমাদের ব্যক্তি ও সামষ্টিক জীবনে প্রাসঙ্গিক। শিক্ষায় মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারে বলতে গেলে এখনো আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রয়োগ হচ্ছে না। অনেকে অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞানও কাজে লাগাতে পারছেন না। তাই বলে আমাদের হাল ছেড়ে বসে থাকলে হবে না। প্রযুক্তির হাওয়া শিক্ষার পালে লেগেছে; আমাদেরকেও একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুতি নিতে হবে।
উন্নত বিশ্বের মানুষেরা যখন ডিজিটাল বই বা ই-বুক নিয়ে পড়াশুনা করে আমরা তখনও চক আর স্লেইট দিয়ে আঁকিবুকি করি। প্রশ্ন ওঠছে, সেই সনাতন পদ্ধতি আর কতদিন। তবে আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতিতেও খুব কম সময়ের মধ্যেই আসছে আমূল পরিবর্তন। সময়ের প্রয়োজনেই একজন শিক্ষক হিসেবে ২০১২ সালের ১২ মে আমাকে মল্লিকপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ICT বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। প্রশিক্ষণের পর প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ইন্টারনেট সুবিধার অপর্যাপ্ততার কারণে প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহার করতে পারছিলাম না। তাই একটি আক্ষেপ থেকেই গেলো।
২০১৪ সালে ডিজিটালের হাওয়া লেগেছিল জনাব আহমেদ উল্লাহ স্যারের নেতৃত্বে, সেদিন Facebook আড্ডাও হয়েছিল শহরের শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে। কিন্তু আমার কাজ আর কতটুকু এগোতে পারলাম! তাই অতৃপ্তি রয়েই গিয়েছিল। আমার ব্যক্তিগত ল্যাপটপ না থাকায় এবং স্কুলের ল্যাপটপের মাদারবোর্ডে সমস্যা থাকায় আমি তাই পেছনেই রয়ে গেলাম।
২০১৬ সাল। আমার সামনে মাল্টিমিডিয়ার দ্বার উন্মুক্ত করে দিল। আমি তখন, বিএড কোর্স করছি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ ঢাকায়। সেখানে পরিচয় হয় দেশের সেরা কনটেন্ট নির্মাতাদের সঙ্গে। এই বিষয়ে অনেক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গুণীজনের সান্নিধ্য পাই। সেই থেকে শিক্ষায় তথ্য ও প্রযুক্তি আমায় মাথায় চেপে বসলো। প্রস্তুতিমূলক কিছু কাজ শিখেও ফেললাম। কিন্তু অসাবধানতাবশত হারিয়ে ফেললাম শিক্ষক বাতায়ন নামক শিক্ষকদের জন্য তৈরি সর্ববৃহৎ ওয়েব পোর্টালে প্রবেশে আমার ব্যক্তিগত পাসওয়ার্ড। তাই আবারও পিছিয়ে গেলাম। কিন্তু থেমে যাইনি। এরপর মুক্তপাঠ নামক একমাত্র শিক্ষামূলক ওয়েবপোর্টালের মাধ্যমে আমি আমার ব্যক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাই। অর্জন করি কীভাবে একটা মানসম্মত কনটেন্ট তৈরি করতে হয়। শিক্ষক বাতায়নে আপলোড করতে হয়। বাতায়নে প্রতি সপ্তাহের সেরা কনটেন্ট নির্মাতা, সেরা উদ্ভাবক ও সেরা নেতৃত্ব নির্বাচন আমাকে আকৃষ্ট করে। তাদের কাজগুলো ফলো করি। এভাবে মাল্টিমিডিয়ায় কিছুটা দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হই। ধীরে ধীরে Microsoft থেকে অর্জন করি Microsoft Innovative Educator সার্টিফিকেটসহ আরও অনেক ব্যাজ ও সার্টিফিকেট। এই কাজের কল্যাণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিচালিত a2i – Access to Information আমাকে পরবর্তিতে জেলা অ্যাম্বাসেডর হতে সহায়তা করে।
একদিন Facebook-এ দেখলাম দিলরুবা খাতুন আপু একজনের শিক্ষক বাতায়ন পাসওয়ার্ড ঠিক করে দিচ্ছিলেন। তারপর দিলরুবা আপুকে মেসেজ পাঠালাম ইনবক্সে। তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকায় বেশ কিছুদিন পরে আমাকে রিপ্লাই দিলেন। আমি আপুর মাধ্যমে আবার সক্রিয় হলাম শিক্ষক বাতায়নে। ভাবছি বাতায়নে একা একা কাজ করে কোন আনন্দ নেই। কি করি? এদিকে আমি চাচ্ছিলাম সুনামগঞ্জ থেকে এমন কেউ এগিয়ে আসুক যাকে নিয়ে আমার ICT যাত্রা শুরু করতে পারি।
একদিন ছাতকের মো. মিসবাহ উদ্দিন স্যার আমাকে বললেন একটা ইনহাউজ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায় কিনা। একসময় শহর বালিকার প্রধান শিক্ষক নাসরীন আক্তার খানম আপার সাথে যোগাযোগ করি। একই সাথে যোগাযোগ করি আমাদের উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনামুর রহিম বাবর স্যার ও উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাকটর সৈয়দ আহমেদ শাহলান স্যারের সাথে। সকল স্যার আমাকে উক্ত বিষয়টি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য সার্বিক সহযোগিতা করলেন। আমাদের ইনহাউজ প্রশিক্ষণটি আরও বেশি আনন্দময় ও শিক্ষনীয় করতে আমাদের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান স্যারও বিশেষ সহযোগিতা করেন।
দীর্ঘদিন কাজ করার ফলে আমি আজ শিক্ষক বাতায়নের অ্যাম্বাসেডর। গত ৩০ অক্টোবর ২০১৯ খ্রি. আমাকে নির্বাচিত করা হয়। তাই স্বাভাবিকভাবে আমার দায়িত্ব বেড়ে গেছে। ভেতরে তাড়া অনুভব করছি আইসিটি জ্ঞান অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার। অন্যান্য জেলার দিকে তাকালে আমরা দেখি ICT-র ক্ষেত্রে আমরা এখনো অগ্রসর নই। তাই জেদ নিয়েই কাজ শুরু করি। তারা পারলে আমরা পারবো না কেন? সেই থেকেই আমার মাথার মধ্যে মাল্টিমিডিয়ার ভাবনা তোলপাড় করছে।
আমি চাই আমার উপজেলা তথা পুরো সুনামগঞ্জ জেলাকে আইসিটি ক্ষেত্রে এগিয়ে নিতে। আমাদের উদ্যমী শিক্ষকদের তৈরি করে আমরাও অন্যান্য জেলার মতো মাল্টিমিডিয়ায় সফলতা নিয়ে আসতে চাই। আমার স্বপ্ন আমার সকল সহকর্মীবৃন্দ ICT দক্ষতায় পারদর্শী হয়ে উঠুন। সুনামগঞ্জ জেলার প্রতিটি বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাস চালু হোক এবং mmc app-এর মাধ্যমে প্রতিবেদন জমা দিন সবাই।
[লেখক : রোকসানা ইয়াসমিন, জেলা অ্যাম্বাসেডর, a2i – Access to Information, এবং সহকারী শিক্ষক, মল্লিকপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জ সদর।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী