রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ০৪:০৮ পূর্বাহ্ন

Notice :

সর্বশেষ বলি শিশু তুহিন : দিরাইয়ে প্রতিপক্ষ ফাঁসানো হত্যাকাণ্ড বাড়ছেই

শামস শামীম ::
হাওর অধ্যুষিত দিরাইয়ে নৃশংসতার মাধ্যমে অন্যকে ফাঁসাতে নিষ্ঠুর খুনের ঘটনা বাড়ছেই। প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামে। সাড়ে ৫ বছরের শিশু তুহিনকে পরিবারের লোকজন ঘুম থেকে তুলে জবাই করে, দুই কান ও লিঙ্গ কেটে হত্যা শেষে গাছে ঝুলিয়ে বর্বরতার নমুনা দেখিয়েছে। একই উপজেলার এই ইউনিয়নে এর আগে আরো দুটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানো হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। এছাড়াও উপজেলার অন্যান্য এলাকায়ও অতীতে এমন প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিষ্ঠুর খুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত হলে দোষীরা এমন নিষ্ঠুর কাণ্ড ঘটাতে পারতো না বলে জানিয়েছেন সচেতন মানুষজন।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিরাইয়ে এভাবে নৃশংস খুনের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে গ্রাম্য কোন্দলের জের ধরে মামলা, আধিপত্য বিস্তার সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ইতোমধ্যে একাধিক পরিকল্পিত খুনের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে দুটি ঘটনা জাতীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে। এর একটি হলো ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাতে এসএসসি পরীক্ষার্থী হোমায়রা আক্তার মুন্নিকে দিরাই পৌর শহরের আনোয়ারপুরস্থ বাসভবনে ঘোষণা দিয়ে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সাকিতপুর গ্রামের বখাটে মাদরাসা ছাত্র এহিয়া সরদার বসতঘরে গিয়ে মুন্নীর পেটে ধারালো ছুরি দিয়ে নৃশংসভাবে নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলে। পেটে ছুরিটি আটকে গেলে সে পালিয়ে যায়। দ্বিতীয় আলোচিত ঘটনাটি গত ১৫ অক্টোবর তুহিন হত্যাকাণ্ড। নিজ সন্তানের সঙ্গে বর্বরতার সীমা ছাড়ানো এ ঘটনাটিও চরমভাবে জাতিকে অবাক করেছে। সারাদেশ এখন ধিক্কার জানাচ্ছে এ নির্মম ঘটনার।
উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার সচেতন মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিরাই উপজেলার রায় বাঙালি গ্রামে দুই পক্ষের পুরনো দ্বন্দ্বের জের ধরে একাধিক সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও নিজে বৈঠক ডেকে সালিশ বসিয়ে গ্রামের কোন্দল নিরসন করতে ব্যর্থ হন। এর জের ধরে ২০০৮ সালে চমক আলী নামক এক বৃদ্ধ খুন হন। এলাকাবাসী জানিয়েছেন প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই চমক আলী নামক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল। ইতোমধ্যে এই ফাঁসানো খুনের ঘটনায় চার্জশিটও প্রদান করেছে পুলিশ। এলাকাবাসীর দাবি এই ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়ায় একতরফা চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।
একই উপজেলার রাজানগর গ্রামে ২০০৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর শিশুদের কেরাম খেলা নিয়ে সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। ওই দিন রাতে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইসমাইল নামের এক ব্যক্তি আহত অবস্থায় মারা যান। পরদিন সকালে গ্রামের মোস্তফা মিয়ার কাজের মেয়ে বেগম বিবি মোস্তফার উঠোনে খুন হন। এলাকাবাসীর অভিযোগ সংঘর্ষে নিহত ইসমাইল মিয়ার খুনের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে প্রতিপক্ষ মোস্তফা-আয়েজ আলী-মরতুজাগং পরিকল্পিতভাবে বেগমকে হত্যা করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্য। মামলায় বাদী করা হয় বেগম বিবির স্বামী কালু মিয়াকে। এদিকে এ ঘটনায় খবর পেয়ে বেগম বিবির পিতা কিতাব আলী কোর্টে মোস্তফা-মরতুজাদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ মামলা দায়ের করেন। পুলিশ পিতার মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে স্বামীর দায়েরকৃত মামলার পক্ষে চার্জশিট প্রদান করে। এতে নিরপরাধ লোকজনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে এখনো আদালতে শোনানি হচ্ছে। এদিকে এর আগে এই গ্রামেই ১৯৯৮ সালে ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি মরতুজা গ্রামের রহিমা নামক এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। রহিমার সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে খুন করে গ্রামের আবুল কালাম গ্রুপের লোকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। পরে রহিমা আদালতে মরতুজার বিরুদ্ধে তার সন্তানকে হত্যার অভিযোগ করলে আবুল কালাম গং রেহাই পান। এই মামলাটি আপসে নিষ্পত্তি হয়েছে।
বেগম বিবি হত্যা মামলাটিও যথাযথ তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ আছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রভাবে পরিকল্পিত খুনের ঘটনাটি নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছিল বলে নিরপরাধ লোকদের অভিযোগ। বর্তমানে এই মামলাটি চার্জ গঠন শেষে শোনানি চলছে।
এই মামলার আসামি জহিরুল ইসলাম জুয়েল বলেন, বেগম বিবিকে মোস্তফা গং নিজের বাড়িতে হত্যা করে আবুল কালাম গংদের বিরুদ্ধে তার স্বামীকে দিয়ে মামলা করিয়েছিল। এই মামলায় ফাঁসাতেই নিরপরাধ ৩৩ জনকে আসামি করা হয়েছিল। বিএনপি তখনকার দুইজন প্রভাবশালী নেতার প্রভাবে মামলাটির যথাযথ তদন্ত হয়নি। নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। তিনি বলেন, জুডিসিয়াল বা নিরপেক্ষ তদন্ত হলে এটা যে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড প্রমাণিত হবে।
রায়বাঙালি গ্রামের ইউপি সদস্য মনু মিয়া বলেন, আলিফ হত্যা মামলার সাক্ষীদের ফাঁসাতে বৃদ্ধ চমক আলীকে হত্যা করা হয়েছিল। এতে নিরপরাধ মানুষজনকে ফাঁসানো হয়েছে। এই মামলায়ও যথাযথ তদন্ত না করেই চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। এভাবে প্রতিপক্ষকে ফাসানোর ঘটনা দিরাই বেড়েই চলছে। এমন হলে আইনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অনেকে নিজের স্বজনদেরই হত্যা করছে।
দিরাই উপজেলার আইনজীবী ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুল ইসলাম রতন বলেন, দিরাইয়ে নৃশংস খুনের পাশাপাশি অন্যকে ফাঁসানোর জন্য একাধিক নির্মম খুনের ঘটনা ঘটছে। রায়বাঙালি, রাজানগরসহ সর্বশেষ কেজাউড়া গ্রামেও ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পিত খুনের ঘটনা ঘটেছে। যথাযথ তদন্ত না হওয়ায় এতে অনেক নিরপরাধ মানুষও ফেঁসে গেছেন। তিনি বলেন, আমরা তুহিন হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে প্রকৃত আসামিদের কঠোর শাস্তি চাই।
ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান বলেন, তুহিন হত্যা মামলায় বাবা চাচা ও চাচাতো ভাইসহ ৫জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আমরা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আসামিদের সামনে নিয়ে আসার শেষ পর্যায়ে আছি। তিনি বলেন, গ্রাম্য কোন্দল ও মামলার জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই এমন নিষ্ঠুর খুনের ঘটনা ঘটেছে। এই মামলায় কোন নিরপরাধ মানুষের ক্ষতি হবেনা।
উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর সোমবার ভোররাতে তুহিনকে ঘুম থেকে তুলে বাবা ও চাচা নাসির মিলে জবাই করে হত্যা করে তুহিনকে। পরে কান ও লিঙ্গ কেটে পেটে ছুরিবিদ্ধ করে লাশ ঝুলিয়ে রাখে কদম গাছে। এ ঘটনায় বাবা আব্দুল বাছির, চাচা জমসেদ ও মাওলানা আব্দুল মোছাব্বিরকে তিনদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। আরেক চাচা নাসির ও চাচাতো বাই শাহরিয়ার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী