সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:০২ পূর্বাহ্ন

Notice :

জল জ্যোৎস্নায় হাওরে : সুখেন্দু সেন

নিশিরাত। না, বাঁকা চাঁদ নেই। নক্ষত্ররাও নেই জেগে। ঘোর অমানিশা। দূরের মেঘালয় সীমান্তে মিটমিট কিছু বাতি ছাড়া বিশ্ব সংসারে আর কিছু আছে- এ মুহূর্তে তা ঠাহর হচ্ছে না। জল থৈ থৈ টাঙ্গুয়ার হাওরে উত্তরের মাতাল হাওয়ার মাতামাতি আর নিকষ কালো অন্ধকারের অনির্বচনীয় যুগলবন্দি। সুন্দর ভয়ঙ্কর।
জল জ্যোৎস্নার জন্মসূত্র গাথা পড়ে আছে ভাটিবাংলার প্রকৃতিতে। সুনামগঞ্জ জেলার উত্তর সীমান্তজুড়ে জলহাওর আর বনপাহাড়ের মিতালী। ভরা পূর্ণিমার রাঙা জ্যোৎস্নায় টাঙ্গুয়ার হাওরে ঘুরে বেড়ানো চন্দ্রভুক পর্যটকের ভিড় লাগে বর্ষায়, শরতে। তবে কিশোর রহস্য উপন্যাসের রোমাঞ্চ নায়কের মতো ঘোর অমাবস্যায় আঁধার বিলাসে হাওর অভিযান কিছুটা ব্যতিক্রমী। আর অভিযাত্রীরা যদি সবাই হয় প্রবীণ, তবে তো কথাই নেই। শরতের প্রথম অমাবস্যাতেই সময় নির্ধারণ। আয়েশি যাত্রায় ঘণ্টাখানেকের বিলম্ব। বিকেল ৫টায় সুনামগঞ্জ থেকে তাহিরপুরের পথে দুটি সিএনজিতে ছ’জন। আধঘণ্টা দূরত্বের পলাশ বাজারে পৌঁছাতেই চা-তৃষ্ণা। এখানে নাকি ভালো দুধসর মেলে। গোপন বাসনা ছিল। কাছাকাছি খুঁজে না পাওয়ায় রসনা তৃপ্ত হলো না। টাঙ্গুয়ার হাওরে নৈশ অভিযানের নৌকা আগেই প্রস্তুত হয়ে আছে তাহিরপুরের ঘাটে। কেবল পৌঁছেই চেপে বসা। তাই ঢিলেঢালা ভাব। এ কারণে সূর্যাস্তের দৃশ্যটা মিস করলেও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অনুজপ্রতিম করুণাসিন্ধু চৌধুরী বাবুলের আন্তরিক আমন্ত্রণ এড়ানো গেল না। ঘাম রোদের বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যায় দই, চিড়া, কলার অপূর্ব আপ্যায়ন। সঙ্গে চা, ঠাণ্ডা দুটিই।
আমাদের রাত্রি আবাস কাম বাহন ইঞ্জিনের নৌকায় যখন চেপেছি, তখন অমানিশার আঁধার জেঁকে বসেছে হাওরের বুকে। নিরেট আঁধার কেটে ছোটা। দেড় ঘণ্টা পর জলে ভাসা গ্রাম গোলাবাড়ি। পারিবারিক পরিচালনায় আঁটসাঁট ডাঙায় বাঁশবেতের কুটিরে জলধারা। রাতের খাবার এখানেই। মুরগী, মসলা, চাল, ডাল পাটাতনের নিচ থেকে বের করা হল। আগেই মজুদ করে রেখেছিলেন তাহিরপুর থেকে সঙ্গী হওয়া শ্রীপুরের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম। পৌঁছে দিলেন যথাস্থানে। হাওর বাংলা, হাওর বিলাস নামে এ রকম আরও কিছু খাবারের জায়গা আছে এখানে। রেডিমেড পাওয়া যায় না। আগে বলতে হয় বা সরঞ্জাম জোগান দিতে হয়। রাত তখন সাড়ে ৯টা। ১২টার আগে খাওয়ার আশা নেই। আপাতত নৌকার ছাদে বসে আঁধারের রূপ-অপরূপের মুগ্ধতায় বজলুল মজিদ খসরু ভাই, ভানুদা, রোকেস লেইস, নুরুল হক আফিন্দী এবং আমি।
রাত্রি দ্বিপ্রহর। নৌকা নোঙর করল গ্রাম থেকে দূরে। গভীর নির্জনতা। নিñিদ্র আঁধার। ডুবছি অতল অন্ধকারে। গা ছমছম রোমাঞ্চকর অনুভূতি। পৃথিবীর তাবত বাধাধরা নিয়মকানুন আর অভ্যস্ত জীবনের বাইরে যেন নিঃসঙ্গ এক বিচ্ছিন্নতা। তবে সঙ্গ দিলেন রবীন্দ্রনাথ। বোটে করে রাতের বেলা পদ্মার বুকে অনেক ঘুরে বেড়িয়েছেন। হাওরে ঘুরেছেন কি-না জানা নেই। আর এমন টইটম্বুর অমানিশায় তো নয়ই। যদি ঘুরতেন তবে এই আঁধারের পরশটুকু কীভাবে নিতেন, তাই ভাবছি। বড় মিস করেছেন গুরুদেব। ট্যাবভর্তি রবীন্দ্রসঙ্গীত। ধীরলয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে অসীম আঁধারে, অথৈ পাথারে। নৈঃশব্দ্য ভেদ করে সুরের আকুলতা আঁধারকে আরও নিবিষ্ট করে তোলে। কে বলে শূন্য আঁধার। রাতের গভীরতা পূর্ণ হয় এ আঁধারেই।
অমানিশার গল্পটা শেষ হয়ে যেত রাত পোহালেই। ঘুম না আসা ভারি চোখ রাতভোরে জড়িয়ে আসার আগেই টাঙ্গুয়ার হাওরে সূর্য ওঠার বেলা। পূর্ব দিগন্তে আগুন হোলির রঙ ছড়িয়ে জলে ভাসা গাঁয়ের ওপাশ থেকে সূর্য মাথা তোলে। আড়াল থাকায় ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। রাতভর আঁধার-সহা চোখে জলভোরে প্রথম আলোর তৃষ্ণা। টাঙ্গুয়ার হাওরে সূর্যোদয় দর্শন ব্যর্থ হতে যাচ্ছিল যদি বছর দশেকের জুনায়েদ ইচ্ছা পূরণে এগিয়ে না আসত। ছোট একখান নৌকা নিয়ে তরতর করে এগিয়ে এলো সেই সূর্যদূত আমাদের নিশাশ্রম বড় নৌকার কাছে।
– স্যার সূর্য দেখবেন?
মনের কথা জানল কেমনে, তা না খুঁজেই অনিদ্রা আড়ষ্ট শরীরের টাল সামলে চাপলাম ছোট্ট সে তরীতে। ছবি তুলছি। সূর্য, ভোর, ঘুমজাগা হাওর। জুনায়েদ বৈঠা টানছে আর অফুরন্ত জ্ঞান দিয়ে যাচ্ছে। জুম করে তুলুন স্যার, এই অ্যাঙ্গেল থেকে, ওই দিকে ঘুরে।
দিগন্তরেখায় গলে পড়ছে আগুন আগুন রঙ। জলে-স্থলে-দিগন্তে লাল আলো ভোর।
জুনায়েদ কচিকণ্ঠে গান ধরে- ‘আমি তো ভালা না, ভালা লইয়া থাইক্কো…।’ মিষ্টি লাগে। এবার আমার হাতে বৈঠা ধরিয়ে মোবাইলটা সে নেয়। অভিজ্ঞ হাতে টপাটপ ছবি তোলে। কথাও বলে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ওর বয়সী আরও কয়েকজন এমন ছোট ছোট নৌকায় পর্যটকদের নিয়ে কাছাকাছি ওয়াচ টাওয়ার, করচবাগে ঘুরে গান শোনায়, ছবি তুলে দেয়। বখশিশ পায় কখনও একটু বেশি, কখনও অল্পস্বল্প।
জিজ্ঞেস করি বাপ আছে তোর? কী করে। সহজ উত্তর- আছে। ঘরেই বসে থাকে। এখন তো কোনো কামকাজ নাই। অসুখও আছে। স্কুলে যাস না। মাথা ওপর নিচ করে বলে, যাই। তবে মনে হলো বর্ষার এ দু-তিন মাস ওরা স্কুল মাড়ায় না। আর এ মৌসুমে হাওর এলাকার কৃষিজীবী, শ্রমজীবী মানুষের কোনো কাজ থাকে না। জীবন সংগ্রামের পাঠ নেওয়া ছেলেটির হাসি হাসি মায়ামুখটি কেমন করুণ লাগে। ভোরের সূর্যও যেন আলো ছোঁয়াতে পারেনি এই সূর্যদূতের মুখটিতে। সকালের ঘুমজাগা নিরুত্তাপ হাওরের বুকে কেমন বিষণ্নতার ছায়া। শরতের মেঘ সকালের রোদটুকু আড়াল করে নেয়। জল হাওরের কত রূপ, কত না রূপান্তর। টাঙ্গুয়ার হাওরের এক প্রান্ত ছুঁয়েছে মেঘালয়ের পাদদেশে। টেকেরঘাট স্বাধীনতা উপত্যকা, শহীদ সিরাজ লেক (নীলাদ্রি), কাছাকাছি লাখমাছড়া।
রাতজাগা ক্লান্তি নিয়েও না দেখে ফেরা গেল না। সিরাজ লেকের পাশেই একাত্তরের শহীদ বীরবিক্রম সিরাজের সমাধি। আরেকজন নাম না-জানা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধিও রয়েছে এখানে। তবে যাওয়া গেল না কিছুটা দূরে সীমান্তের জিরো পয়েন্ট বড়গোপ টিলা (বারেকের টিলা)। অনেকবারই গেছি। তবু বারবারই বন-পাহাড়ের সবুজ টান লেগে রয় মনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী