সোমবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

Notice :

অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থা : ঝুঁকিতে টাঙ্গুয়ার হাওর

বিশেষ প্রতিনিধি ::
বিশ্ব ঐতিহ্য টাঙ্গুয়ার হাওর একটি সংরক্ষিত এলাকা। কিন্তু এই সংরক্ষিত এলাকার পরিবেশ-প্রতিবেশ বিবেচনায় না নিয়ে উচ্ছৃঙ্খল পর্যটক প্রকৃতিবিনাশী কাজে লিপ্ত রয়েছে। হাওরে পর্যটকদের অবাধ যাতায়াত, প্লাস্টিকের বর্জ্য ফেলা, শব্দদূষণ করা এখন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি সচেতন সাংস্কৃতিক সংগঠনও মাইক বাজিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওরের সংরক্ষিত এলাকায় আনন্দে মাততে দেখা গেছে। তাদের এমন কাণ্ডে সমালোচনা করেছেন সুধীজন। এদিকে পরিবেশবাদীরা বলছেন, বর্তমানে পরিবেশগত ঝুঁকিতে রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওর। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থাই হাওরটির জন্য দুঃসংবাদ বয়ে আনবে।
ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার ১৮টি মৌজার ৫২ বিলের সমন্বয়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওর। ১৯৯৯ সালে হাওরটির আয়তন ৯ হাজার ৭২৭ হেক্টর ছিল। ২০১৬ সালের সর্বশেষ জরিপে হাওরটির আয়তন দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর। আগে হাওরের সীমানা চিহ্নিত না হলেও ২০১৬ সালে ১৪৪টি সীমানা পিলার বসিয়ে হাওরের সীমানা দেওয়া হয়েছে। ১৯৯৯ সালে হাওরকে পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২০ জানুয়ারি সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় রামসার এলাকাভুক্ত করা হয় টাঙ্গুয়ার হাওরকে। ২০০৩ সালের নভেম্বর থেকে ইজারা প্রথা বিলোপ করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় হাওরটি সংরক্ষণে নামে। এই সময় থেকেই জেলা প্রশাসন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আনসার পুলিশ দিয়ে হাওর পাহারা দিচ্ছে। ২০০৬ সাল থেকে প্রশাসনের সঙ্গে সুইস দাতা সংস্থা এসডিসি (সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট এন্ড কো-অপারেশন) পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের পক্ষে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন টাঙ্গুয়ার হাওর সমাজভিত্তিক টেকসই ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি পরিচালনায় নামে। হাওরপাড়ের ৭৬টি গ্রামে ৭৩টি মৎস্যজীবী সমিতি করে হাওরে তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে তারা প্রকল্প শেষ হওয়ায় তারা চলে গেছে। ব্যবস্থাপনার সময়ও প্রকৃতি সংরক্ষিত হচ্ছেনা এমন অভিযোগ ওঠে। ২০১৬ সালে সংরক্ষণের মেয়াদ শেষ হয়।
২০১৫ সালে আইইউসিএন টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের রেডডাটা বুক জরিপ পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, বর্তমানে এই হাওরটিতে ১৩৪ প্রজাতির মাছ, ১৯ প্রজাতির স্তন্যপ্রাণী, ২১৯ প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখি, ২৪ প্রজাতির সরিসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী এবং ১০৪ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। হাওরে ১০৯টি জলাশয় কাগজে কলমে থাকলেও ৫২টি জলাশয়ের অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেন সংশ্লিষ্টরা।
টাঙ্গুয়ার হাওর ৮৮টি গ্রাম বেষ্টিত। প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মধ্যে ৩০ ভাগ মৎস্যজীবী, ৬০ ভাগ কৃষিজীবী এবং অন্যান্য ১০ ভাগ মানুষ বসবাস করে। হাওরে ৫২টি বিল, ১২০টি কান্দা-জাঙ্গাল রয়েছে। ১৪১ প্রজাতির মাছ, ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২১৯ প্রজাতির পাখি, ৯৮ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি, ১২১ প্রজাতির দেশীপখি, ২২ প্রজাতির পরিযায়ী হাঁস, ১৯ প্রজাতির স্তন্যপ্রায়ী প্রাণী, ২৯ প্রজাতির সরিসৃপ, ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণীসহ অসংখ্য স্থলজ, জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র রয়েছে রয়েছে। ২০১১ সালে এক জরিপে এই হাওরে ৬৪ হাজার পাখির জরিপ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ৮৬ জাতের দেশি এবং ৮৩ জাতের বিদেশি পাখি ছিল। ২০১৫ সালে প্রায় দুই লাখ অতিথি পাখি এসেছিল। ২০১৮ সালে বার্ডস ক্লাবের জরিপে মাত্র ৫০ হাজার অতিথি পাখির আগমন ঘটেছে বলে জানানো হয়।
২০১৩ সালের ৯ জুলাই প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে পর্যটন স্থাপনার জন্য ১০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়। এভাবে জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক নান্দনিকতার কারণে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর আন্তর্জাতিক পরিচিতিও পায়। ফলে পর্যটকদের স্রোতও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ২০০৪-২০০৫ সাল থেকে পর্যটক আসা শুরু হয়। ২০১০ সালের পর এই ¯্রােত বাড়তে থাকে। টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র নিয়ে মিডিয়ার নানা মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। ২০১৫ সালে সুরমা নদীর উপর আব্দুজ জহুর সেতু চালুর পরই সরাসরি তাহিরপুরে চলে যাচ্ছেন পর্যটকরা। সেখানে যানবাহন রেখে হাওর ঘুরে বেড়ান তারা। এখন প্রতি শুক্রবার ও শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে বিভিন্ন স্থান থেকে দলে দলে পর্যটকরা আসছেন। তাদের ব্যবহৃত নানা বর্জ্য এখন দূষণ ডেকে আনছে টাঙ্গুয়ার হাওরের।
এদিকে সচেতন এলাকাবাসী জানিয়েছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের ‘অত্যাচার’ বাড়ছেই। ভ্রমণে গিয়ে প্লাস্টিকের থালা, পলিথিন, চিপস-চানাচুরের পলিথিনজাত প্যাকেটসহ প্রকৃতিবিনাশী উপকরণ ছুড়ে ফেলছেন হাওরে। ইঞ্জিন চালিত নৌকা, স্পিডবোট নিয়ে প্রবেশ করছেন পর্যটকরা। এছাড়াও অনেক পর্যটক উচ্চ শব্দের মাইক নিয়েও সংরক্ষিত এলাকায় গান-বাজনায়ও মাতছেন। এতে জলজ-স্থলজ জীবের ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান পরিবেশবিদরা। সম্প্রতি একটি প্রসিদ্ধ সাংস্কৃতিক সংগঠন উচ্চ শব্দের মাইক নিয়ে নাচ-গান-বাজনায় ভ্রমণ করে এসেছে টাঙ্গুয়ার হাওর। তাদের এমন কাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন লোকজন।
তাহিরপুরের বাসিন্দা বাবরুল হাসান বাবলু বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষিত এলাকা। এর সৌন্দর্য্য দেখতে এসে পর্যটকরা প্রাণ ও প্রকৃতির বিনাশ করছেন। সংরক্ষিত এলাকায় উচ্চশব্দে মাইক বাজাচ্ছেন। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও স্পিডবোট নিয়ে প্রবেশ করছেন সংরক্ষিত এলাকায়। এতে জীববৈচিত্রের ক্ষতি হচ্ছে। শব্দদূষণ ও কোলাহলের কারণে জীব-জন্তু ও সরিসৃপও এখন বিপাকে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে টাঙ্গুয়ার হাওর থেকে এসব বিরল প্রাণী হারিয়ে যেতে পারে।
গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর বিরল প্রাণবৈচিত্রের আধার। আস্তে আস্তে নানা আঘাতে এই প্রাণবৈচিত্র এখন হুমকির মুখে। এখন পর্যটকদের উৎপাতে ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে টাঙ্গুয়ার হাওরের। সংরক্ষিত এলাকায় এভাবে প্রকৃতিকে উৎপাত করা অনৈতিক। প্রশাসন সচেতন না হলে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাণবৈচিত্র প্রাণ হারাবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষিত এলাকা। এখানে যারা যান তাদের অবশ্যই প্রকৃতি রক্ষা করে ঘোরাঘুরি করতে হবে। আমরা পর্যটকদের জন্য গাইডলাইন করার চেষ্টা করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী