বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২০, ১২:৫৩ পূর্বাহ্ন

Notice :

আগস্ট শোকের বহতা নদী : সুখেন্দু সেন

বেদনার এক দীর্ঘতম নদী। বয়ে যায় বুক চিরে। মিশে রয় মধুমতি, ধলেশ্বরী, পদ্মা, মেঘনা, সুরমা, বুড়িগঙ্গা, যমুনার ধারায়। সে নদীতে অশ্রু শোণিতের স্রোত, ক্ষোভ-প্রতিরোধের ঢেউ, তীর ভাঙা দ্রোহবিদ্রোহ, চেতনায় জাগা জোয়ার, হীনতার এক ভাটা। সে এক দীর্ঘ নদী- নাম আগস্ট। আগস্ট শোকের মাস। শোকের বহতা নদী। শোকাচ্ছন্ন প্রকৃতির অন্তরাত্মার ক্রন্দন অশ্রু হয়ে ঝরে বৃষ্টিধারায়।
শতাব্দীর প্রবাদ পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, হৃদয়ের রবীন্দ্রনাথ, চেতনার নজরুল। বাঙালির অস্তিত্বে মিশে থাকা তিন মহামানবের প্রয়াণ ঘটেছিল এই বুকভাঙা মাসে। কি দৈব যোগসূত্র নির্দিষ্ট করে রেখেছিল নিয়তি।
রবি ঠাকুরের সৃষ্টিতে বাঙালির হৃদয়ের উদ্বোধন, জীবন বোধের সন্ধান। গভীর অন্তর্দৃষ্টিতে আবিষ্কার সোনার বাংলার ছায়া ঢাকা মায়া মাখা মলিন মুখ খানি। নজরুল বাঙালির সুপ্তচেতনায় আঘাত হেনে শিখালেন শেকল ভাঙার গান। অন্তর দিয়ে কামনা করলেন বাংলার জয়, বাঙালির জয়। আরেকজন, তিনিও যে কবি। রাজনীতির কবিশ্রেষ্ঠ। কোটি জনতার হৃদয়ের বেদনা অন্তরে ধারণ করে জাগালেন চিরকালের বঞ্চিত বাঙালিকে। বার বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও জয়বাংলার উজ্জীবনী মন্ত্রে স্বাধীনতার দীক্ষা দিলেন ঘুমন্ত জাতিকে। তাঁর বজ্রকণ্ঠের অমোঘ বাণীতেই বাঙালির স্বদেশ আবিষ্কার। ইতিহাসের প্রথম বাঙালি জাতি রাষ্ট্র। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান।
বিগত শতকের প্রথম দশকে দেশপ্রেমের পরাকাষ্টায় জীবন দানের অপার মহিমা প্রতিষ্ঠিত করে পরবর্তী সময়ে লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগী প্রেরণার উৎস হয়েছিলেন কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম। তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল ১৯০৮-এর ১১ আগস্ট। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল মানব ইতিহাসের এক মর্মান্তিক বীভৎস ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে। লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটিয়ে, লক্ষ লক্ষ মানব সন্তানকে পঙ্গু করে, পরবর্তী বংশধরদের জন্য তেজষ্ক্রিয়তার মরণ ছোবলের হুমকি রেখে হিরোশিমা এবং নাগাসাকি শহর দুটিকে ধূলিস্মাৎ করে আণবিক বোমা বর্ষিত হয়েছিল ১৯৪৫-এর অভিশপ্ত আগস্টের ৬ ও ৯ তারিখে। মারাত্মক সব ধ্বংসযজ্ঞ ঘটিয়ে ২য় বিশ্বযুদ্ধের অবসান হলো। যুদ্ধ নয় শান্তির অন্বেষায় ছুটলো মানব জাতি। ইংরেজ সরকার প্রতিশ্রুত ছিল যুদ্ধ শেষে উপমহাদেশ থেকে তাদের উপনিবেশ গুটিয়ে নিতে। ক্রিফস মিশনের সাথে আলোচনায় দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রস্তাব যখন ঝুলে রইলো তখন লেড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানের জন্য জিন্নাহর ডাইরেক্ট অ্যাকসন ডে’র আহ্বানে কোলকাতায় শুরু হলো ভয়াবহ দাঙ্গা। রক্ত¯্রােতে প্লাবিত হলো অলিগলি রাজপথ। সে দিনটি ছিল ৬ আগস্ট ১৯৪৬। আগস্টেই দাঙ্গার তীব্র তাপ ছড়ালো নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিহারে। এ দাঙ্গাই দেশ ভাগ নিশ্চিত করে এবং পরবর্তী বছর ১৪ আগস্ট পাকিস্তান নামক অভিশপ্ত উদ্ভট এক রাষ্ট্রের জন্ম।
১৯৩৭ সালে সিলেট জেলার বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জ, ধর্মপাশাসহ কয়েকটি থানায় দানা বেধে ওঠে নানকর আন্দোলন। এর কেন্দ্র ছিল বিয়ানীবাজার থানার শানেশ্বর এলাকা। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট শানেশ্বর গ্রামের মাটি তাজা রক্তে রঞ্জিত করে জমিদারের লাঠিয়াল, পুলিশ, ইপিআর-এর সম্মিলিত হামলা প্রতিরোধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন কুটুমণি দাস, প্রসন্ন দাসসহ ছয় জন। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হয়।
এক সময়ে পাকিস্তানের জন্য জান কোরবানকারী বাঙালির উপরই একাত্তরে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ঘটায় বর্বর এবং নৃশংসতম গণহত্যা। ভাটি অঞ্চলের নৃশংসতম গণহত্যা সংঘটিত হয় একাত্তরের মধ্য আগস্টে। নাজিরপুর, মাকালকান্দি, হারুণী, সেকান্দরপুর, আজমিরীগঞ্জ, জলসুখা, কাগাপাশা, কৃষ্ণপুরে হত্যা, লুটপাট, ধর্ষণে মাতে নরপশুরা। নাজিরপুরে নিহত ২৪ জন হতভাগ্যের মধ্যে ৬০ বছরের বৃদ্ধা, এক বছরের শিশু মালতী। মাকালকান্দিতে পড়ে থাকে ৯০ জনের লাশ। ৪১ জনই নারী। সৎকার করা যায়নি। বাকি গ্রামগুলিতে ঝরে শতাধিক প্রাণ। শুটা নদী আর হাওরের জল রক্তে লাল।
৩১ আগস্ট ১৯৭১। সুনামগঞ্জ জেলার বৃহত্তম গণহত্যা জগন্নাথপুরের শ্রীরামসিতে। হাতবেঁধে চোখবেঁধে মেশিনগানের গুলি চালিয়ে হানাদার এবং দোসররা একই সঙ্গে হত্যা করে শতাধিক নিরীহ গ্রামবাসী। কয়েকদিন জনশূন্য গ্রাম। কেবল শেয়াল শকুনের মহোৎসব। রক্তের সাগরে ভেসে স্বাধীনতা আসে। পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে সপরিবারে নিহত হন জাতির জনক। ৮ বছরের শিশু রাসেল, গর্ভবতী বধূরাও রক্ষা পায়নি সামরিক তস্করদের হাত থেকে। বিশ্বাসঘাতকতা আর অকৃতজ্ঞতার কলঙ্ক লেপন হলো যুদ্ধজয়ী জাতির কপালে।
পনেরো আগস্টের সুফলভোগী সেই এক লক্ষ্মীটেরা জেনারেল অকৃতজ্ঞতার ষোলকলা পূর্ণ করে পাপের মাত্রা যোগ করেছিলেন খুনীদের রক্ষা এবং পুরস্কৃত করে। পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরে যেতে হেন অপকর্ম এবং নিষ্ঠুরতা নেই যা তিনি করেননি। তারই সুযোগ্যা বেগম যিনি একসময় ব্যক্তিজীবনে বঙ্গবন্ধুর স্নেদাক্ষিণ্যে কৃতার্থ হয়েছিলেন, তিনিও ৯১-এ প্রধানমন্ত্রী হয়ে আকস্মিকভাবে ৯৬-এর ১৫ আগস্ট সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে নিজের জন্মদিন পালনের বিকৃত উল্লাসে মেতে উঠলেন এবং সে বিকৃত ধারা পরবর্তীতেও বহাল রাখলেন। অকৃতজ্ঞতা আর শিষ্টাচারহীনতার এমন দ্বিতীয় নজির বিরল এ কারণেই যে, ৯১-এ দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণের পর সরকারি তথ্য বিবরণীতে যে জীবন বৃত্তান্ত দেশের সকল পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাতে জন্মতারিখ উল্লেখ করা হয়েছিল ১৯ আগস্ট ১৯৪৫। জন্মের আরো তিনটি তারিখ মজুত সত্বেও এই অভিশপ্ত দিনটিতেই জন্মদিন পালনে তিনি আহ্লাদিত হয়ে কি বিকৃত সুখ লাভ করেন মানবিক চরিত্রের কোন সংজ্ঞাতেই তা নিরূপিত হবার নয়। (এবারের ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন হয়নি)। হীনতার ভাটা এখানেই শেষ নয়। ২০০৪-এর ২১ আগস্ট বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দিয়ে শেখ হাসিনার সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী প্রকাশ্য জনসভায় পরিকল্পিত এবং বীভৎস গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আইভী রহমানসহ ২৪জন নেতাকর্মী। আহত হন শতশত। চিরজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে নিতে হয় অনেককেই। মঞ্চে আসীন কেন্দ্রীয় নেতারা নিজেদের দেহঢালে স্প্রিন্টার এবং গুলির আঘাত সহে কোনক্রমে বাঁচিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে। একটি ঐতিহ্যবাহী বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের প্রধানসহ সকল কেন্দ্রীয় নেতাদের একই সঙ্গে হত্যা করার বর্বরতম ও নারকীয় অপচেষ্টা এবং তার সাথে সরকারি দলের প্রভাবশালীদের সহযোগিতা সভ্য জগতে অকল্পনীয়। প্রকৃত হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করতে আক্রমণকারীদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা এবং আলামত বিনষ্টকরণসহ সকল অপকর্মই সাধিত হয়েছিল তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে। শরীরে স্প্রিন্টারের যাতনা, আহত নেতাকর্মীদের আর্তনাদ, নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার বিমূঢ় স্তব্ধতা কাটাতে না কাটাতেই ষড়যন্ত্রকারীদের নিষ্ঠুর ঠাট্টা বিদ্রুপ, অমানবিক উপহাস, কাল্পনিক মনগড়া তথ্য প্রকাশ করে সকল ভব্যতা-সভ্যতার নির্লজ্জ লঙ্ঘনেও তৎকালীন সরকারি দলের দায়িত্বশীলরা অপতৎপরতা প্রদর্শনে পারমঙ্গতা দেখিয়েছিলেন।
পাপ চাপা থাকে না। সত্যের জয় হবেই। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার স¤পন্ন করে আত্মস্বীকৃত খুনীদের সাজা কার্যকর হয়েছে। জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। তবে ষড়যন্ত্রকারীরা বিলম্বিত বিচারে আইনের ফাঁক-ফোকরে পার পেয়ে গেছে। একুশে আগস্টের বর্বরতম গ্রেনেড হামলাকারীদের যথার্থ বিচার হোক। বিচার হোক ষড়যন্ত্রকারী যোগসাজশকারীদের। জঘন্যতম হিংসা, হত্যার রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হোক।
একাত্তরে এ আগস্টের ৩০ তারিখ পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে যায় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র অমর সুরস্রষ্টা, গণসঙ্গীত শিল্পী মুক্তিযুদ্ধের বীর গেরিলা যোদ্ধা আলতাফ মাহমুদকে। তিনি আর ফিরে আসেন নি। মুক্তিযুদ্ধের আরেক কণ্ঠসৈনিক অসংখ্য জনপ্রিয় গানের শিল্পী আব্দুল জব্বারকেও আমরা হারিয়েছি ২০১৭-এর আগস্টের ত্রিশ তারিখে। শেষ হল আগস্ট। শোকের নদী, রক্ত নদীর বাঁকে বাঁকে জীবনের জয়গান ধ্বনিত হোক। তীরে তীরে জীবনের ফুল ফুটুক। ভাটার টানের যত আবর্জনা ধুয়ে মুছে যাক। মরণ বাংলাদেশ আর নয়, জীবনের হোক জয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী