রবিবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২০, ১১:১৪ অপরাহ্ন

Notice :

ঢাকার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে

শামস শামীম ::
রাজধানী ঢাকার সঙ্গে হাওরবাসীর যোগাযোগ আরো সহজ হচ্ছে। আড়াই ঘণ্টা পথের দূরত্ব কমে যাবে। বাঁচবে সময় ও অর্থ। ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। সুনামগঞ্জের মদনপুর পয়েন্ট থেকে দিরাই-শাল্লা অতিক্রম করে হবিগঞ্জের জলসুখা হয়ে আজমিরিগঞ্জ মহাসড়কে গিয়ে পড়বে নতুন অনুমোদিত মহাসড়কটি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৬৯ কোটি টাকা।
মঙ্গলবার রাজধানীর শেরেবাংলানগর এনইসি সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সভা শেষে হাওরাঞ্চলের জনপ্রিয় নেতা পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন। এদিকে এই প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন লাভ করায় যাতায়াতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে বলে মনে করেন যোগাযোগ উন্নয়নে পিছিয়ে থাকা হাওরবাসী।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে হবিগঞ্জে একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। হাওর এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার ভিত্তিক একটি প্রকল্প।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হবিগঞ্জের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে এই সড়ক নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। এই প্রতিশ্রুতির পরে সুনামগঞ্জ-হবিগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগ যৌথভাবে একটি ডিপিপি তৈরি করে দুই বছর আগে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। পরিকল্পনা কমিশন ও সড়ক উইংয়ের ‘সুনামগঞ্জ-মদনপুর-দিরাই-শাল্লা-জলসুখা-আজমিরিগঞ্জ-হবিগঞ্জ মহাসড়কের শাল্লা-জলসুখা মহাসড়কাংশ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, সুনামগঞ্জ-মদনপুর-দিরাই-শাল্লা-জলসুখা-আজমিরীগঞ্জ হয়ে হবিগঞ্জ মহাসড়কে মিলিত হবে। ওই এলাকায় এর দৈর্ঘ্য হবে শাল্লা-জলসুখা অংশে ১৫.৮৩ কি.মি.। দু’টি জেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলে আর্থ-সামাজিক অবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হবে বলে বিশিষ্টজনদের ধারণা।
এদিকে বর্তমানে সুনামগঞ্জ অংশে মদনপুর থেকে দিরাই পর্যন্ত ২৭ কিলোমিটার সড়ক ‘জেলা সড়ক উন্নয়ন’ (সিলেট জোন) প্রকল্পভুক্ত রয়েছে। এই সড়কটিও গত জাতীয় নির্বাচনের আগে সংস্কার ও সম্প্রসারিত হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়েছে। ঢাকা থেকে দিরাই সরাসরি বাস সার্ভিস চালুও আছে। দিরাই থেকে শাল্লা পর্যন্ত আরো ১৯ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীনে ‘মদনপুর দিরাই শাল্লা’ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজ গত কয়েক বছর ধরে বাস্তবায়ন হচ্ছে। অনুমোদিত নতুন প্রকল্পে শাল্লা থেকে হবিগঞ্জের জলসুখা (আজমিরীগঞ্জ) পর্যন্ত ১৫.৮০ কিলোমিটার সড়কটিই আজমিরিগঞ্জ মহাসড়কে গিয়ে যুক্ত হবে। এই অংশটিই মূলত দু’টি জেলার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করবে। যাতে সহজেই রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন হয়। এই প্রকল্পে আজমিরীগঞ্জ (জলসুখা) থেকে বানিয়াচং পর্যন্ত আরো ১৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ প্রকল্পভুক্ত করা হয়েছে। এভাবে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার সংযোগ স্থাপনকারী মহাসড়কটির নির্মাণপ্রক্রিয়া রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দূরত্ব ঘুচাতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদিত হওয়ায় সব বাধা-বিপত্তি দূর হয়ে এখন বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার আশা জাগিয়েছে হাওরবাসীর মনে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বিকল্প সংযোগ স্থাপনকারী সড়কটির অনুমোদন নিয়ে তাই উচ্ছ্বসিত হাওরবাসী।
একটি বিশেষ সূত্র জানিয়েছে, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে হাওরের বুক চিরে বিকল্প সড়কটির পরিকল্পনা তখনই শুরু হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলেন, হাওরের শীর্ষ দুই নেতা রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যান হাওরের নেতা পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। ২০১৫ সনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হবিগঞ্জে রাজনৈতিক জনসভায় এই প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি প্রদানের সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রকল্পটি অনুমোদন লাভ করায় হাওরবাসী আনন্দে উদ্বেলিত।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হওয়ার পর প্রশাসনিক ডিও সম্পন্ন হতে প্রায় মাস খানেক সময় লাগবে। ডিও সম্পন্ন হলেই কর্তৃপক্ষ সড়কের প্রাক্কলন কাজ করবে। পরে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় চলে যাবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন বছর খানেকের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এই সড়কটি প্রকল্পভুক্ত হওয়ায় দিরাই-শাল্লায় আনন্দ উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। তারা সরকারের সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন জানিয়ে যথাসময়ে কাজ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।
শাল্লা উপজেলা যুবলীগ নেতা পীযুষ দাস বলেন, আমি গত ১৬ আগস্ট পরিকল্পনামন্ত্রী মহোদয়কে এ বিষয়ে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আজ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হওয়ায় যোগাযোগ অবস্থায় পিছিয়ে থাকা দিরাই-শাল্লাসহ পুরো সুনামগঞ্জবাসীর রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বিকল্প ও সহজ সড়ক যোগাযোগের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়ে ধরা দিয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হওয়ায় হাওরাঞ্চলের মানুষ উচ্ছ্বসিত।
দিরাই পৌরসভার মেয়র মোশাররফ মিয়া বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন লাভ করায় দিরাই-শাল্লাবাসীসহ আমাদের জেলাবাসীই আনন্দিত। এটি নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে আমাদের সহজ বিকল্প সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে সময় ও অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি ব্যবসা বাণিজ্যও সম্প্রসারিত হবে। তিনি বলেন, এই সড়কটি নিয়ে আমাদের প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত স্বপ্ন দেখেছিলেন। প্রাথমিক কাজও রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ মহোদয়কে নিয়ে শুরুও করেছিলেন।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, এই প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ভিত্তিক একটি প্রকল্প। প্রায় দুই বছর আগে আমরা ডিপিপি তৈরি করে পাঠিয়েছিলাম। আজ একনেকে অনুমোদন লাভ করেছে। এখন দ্রুতই আমরা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাব। তিনি বলেন, সড়কটি নির্মিত হলে হাওর উপজেলা দিরাই-শাল্লাসহ পুরো জেলাবাসীই আড়াই ঘণ্টা কম সময়ে রাজধানী ঢাকায় যেতে পারবেন।
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, এই প্রকল্পটি ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। অনুমোদনের আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি এই প্রকল্প বাংলাদেশের একটি বিচ্ছিন্ন ও গভীর জলাভূমির জায়গায় বাস্তবায়িত হবে। তিনি আমাকে বলেছেন, হাওরের জন্য এসব সড়ক নির্মাণ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও স্থানীয় মানুষের সহজ যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য জরুরি। এই সড়কগুলোতে যেখানে দুটি সেতুর দরকার সেখানে আরো বাড়িয়ে সেতু করে সড়ককে যেন আরো টেকসই করা হয়। মন্ত্রী আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী হাওরের উন্নয়নের প্রতি খুবই আন্তরিক। আমাদের কোনো প্রকল্প তিনি ফেলে দেন না। তিনি আমাকে বলেছেন, মান্নান সাহেব আমার গোপালগঞ্জের উন্নয়ন হলে আপনার হাওরেরও উন্নয়ন হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী