বুধবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২০, ০১:১৭ পূর্বাহ্ন

Notice :
«» নিরুত্তাপ রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়াচ্ছে কোন্দল «» রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক হলেন চপল «» সাংহাই হাওর : গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজারে গ্রহণ করা হয়নি প্রকল্প «» আদর্শ জাতি গঠনে নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই : মেয়র নাদের বখত «» সুনামগঞ্জে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হবে : পরিকল্পনামন্ত্রী «» শেখ হাসিনায় আস্থা আছে ৮৬ শতাংশ নাগরিকের «» ১১ উপজেলায় নির্মাণ হচ্ছে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান «» হাওরাঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে শিশুদের ঝরে পড়ার বাস্তবতা ও গৃহীত উদ্যোগ : ইয়াসমিন নাহার রুমা «» বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না : পরিকল্পনামন্ত্রী «» হলহলিয়া দুর্গে মিলেছে প্রাচীন সভ্যতার সুসজ্জিত কক্ষের ধ্বংসাবশেষ

অলিউর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন

স্টাফ রিপোর্টার ::
গত ২১ জুলাই সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের লালপুর এলাকার সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়ক সংলগ্ন ডোবা থেকে অলিউর রহমান নামের এক যুবকের গলাকাটা ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত অলিউর দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের আসামমোড়া গ্রামের গোলাপ মিয়ার পুত্র।
রোমহর্ষক এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের শুরুতে কূলকিনারা করতে না পারলেও নিহতের পকেটে থাকা একটি বাস টিকেট ও মোবাইল কল লিস্টের সূত্র ধরে খুনি ও খুনের পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
ঘটনার পরপরই নিহতের পিতা ৬ জনকে আসামি করে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু পুলিশ যখন খুনের রহস্য উদ্ঘাটনে অধিকতর তদন্তে নামে তখন একের পর এক বেরিয়ে আসতে থাকে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও এর মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন নিহতের ভগ্নিপতি ফখর উদ্দিন। এই পরিকল্পনায় পাথারিয়া ইউপি সদস্য রওশন আলীসহ পরিবারের এক সদস্যের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি বালিশ চাপা দিয়ে হত্যার পর পুকুরে ফেলে দেয়া হয় অলিউরের স্ত্রী তানজিনা আক্তার তানিয়ার লাশ। ওই মামলায় অলিউরসহ ভগ্নিপতি ফখর উদ্দিন ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের আসামি করা হয়। মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। এরপর থেকেই শুরু হয় পারিবারিক কলহ। পথের কাঁটা অলিউরকে সরাতে পরিকল্পনা শুরু করেন ভগ্নিপতি, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও পরিবারের এক সদস্য। ব্যাপারটি বুঝতে পেরে অলিউর বাড়ি ছেড়ে গাঢাকা দেয়। পরিবারের সঙ্গেও সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তবে কিছুদিন পরেই তার শাশুড়িকে ফোন করে স্ত্রী হত্যায় সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করে অলিউর। এতে মামলার অপরাপর আসামি ফখরসহ তার পরিবারের সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এই দ্বন্দ্বের জেরেই অলিউরকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করায় তার ভগ্নিপতি ফখর উদ্দিন।
এদিকে, গতকাল সোমবার দুপুরে সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় পুলিশ অলিউর হত্যাকাণ্ড বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে জানানো হয়, নিরপেক্ষ তদন্ত করতে গিয়ে এজাহারের বাইরে থাকা দুই ভাড়াটে খুনি, ভগ্নিপতি, স্থানীয় ইউপি সদস্য ও অলিউরের পরিবারের এক সদস্যের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিশ্চিত হয় পুলিশ। পরে দুই ভাড়াটে খুনি সুনামগঞ্জ শহরের বড়পাড়ার বাসিন্দা এনাম ও কুতুবপুর গ্রামের রাজমিস্ত্রী মুহিতুল এবং খুনের পরিকল্পনাকারী ভগ্নিপতি দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া ইউনিয়নের ধলকুতুব গ্রামের ফখর উদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত তিনজনই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীন, সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুর রহমান, ওসি (তদন্ত) আব্দুল্লাহ আল মামুন, পরিদর্শক (অপারেশন) সঞ্জুর মুর্শেদ ও তদন্তকারী কর্মকর্তা জিন্নাতুল তালুকদার উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ আরো জানায়, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলমান রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আর কারো সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদেরও গ্রেফতার করা হবে।
পুলিশ আরো জানায়, লালপুর এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় অলিউরের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধারের পর মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় এসআই জিন্নাতুল তালুকদারকে। তিনি সুরতহাল প্রতিবেদনের সময় অলিউরের পকেটে সিলেট-সুনামগঞ্জ-ছাতক লাইনের ১৮ জুলাই তারিখের একটি বাসের টিকেট ও দুটি মোবাইল নম্বর (যার একটি নম্বর বোন জামাই ফখরের) পান। কিন্তু অলিউর মোবাইল ব্যবহার না করায় খুনের ক্লু বের করতে বেগ পেতে হয় তাকে। এ পর্যায়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রাধান্য দেন বাসের টিকেটের ওপর। বাসের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন ১৮ জুলাই অলিউর সুনামগঞ্জে আসেন। এদিকে অলিউরের ভগ্নিপতির মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে জানাযায় সার্বক্ষণিক দিরাই অবস্থান করলেও ১৮ জুলাই তিনি দিরাই থেকে সুনামগঞ্জে আসেন এবং ১৯ জুলাই পর্যন্ত সুনামগঞ্জ শহরে অবস্থান করেন। ফখর তার মোবাইল থেকে ভিন্ন দুই মোবাইল ফোনে ঘনঘন কথা বলেন। এতে প্রাথমিকভাবে তাকেই সন্দেহ করে পুলিশ। বিষয়টি ফখরকে বুঝতে না দিয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে আসামি ধরতে অভিযান চালানো হয়।
এদিকে তদন্তকারী কর্মকর্তা ক্লু বের করতে ফখরকে নিয়েই সিলেটে অলিউরের শ্বশুর বাড়ি যান। পুলিশ সেখানে গিয়ে নিশ্চিত হয় অলিউরই তার স্ত্রীকে খুন করেছিল। সেখান থেকে পুলিশ সিলেটে অলিউরের এক স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন তথ্য জানতে চায়। পরবর্তীতে ওই স্বজন পুলিশকে সিলেটে অবস্থানকালীন অলিউরের ঠিকানা দেন। সেখানে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে অলিউরের বোন জামাই ফখরই অলিউরকে সুনামগঞ্জে নিয়ে আসে। পুলিশ টিকেটের তারিখ মিলিয়ে ও ওই সময়ের মোবাইল ফোনের লোকেশন ট্র্যাকিং করে ফখরের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এবং এই ঘটনায় ফখরই জড়িত বলে প্রমাণ পেয়ে তাকে আটক করে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে খুনের ঘটনায় সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে ফখর। সে জানায়, তার চাচাতো ভাই এনাম ও তার বন্ধু নির্মাণ শ্রমিক মুহিতুলকে দিয়ে ৩০ হাজার টাকার চুক্তিতে অলিউরকে লালপুর এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়। অলিউরের স্ত্রী তানিয়া হত্যা মামলায় ফখর আসামি হওয়ায় তার টাকা-পয়সার ক্ষতি হয় এবং ওই ঘটনায় ফেঁসে যেতে পারে এমন ভয় থেকেই অলিউরকে খুন করে তানিয়া হত্যা মামলা ভিন্নখাতে নেওয়ার চেষ্টা করে সে। ফখরের এই ক্ষোভকে উস্কে দেন স্থানীয় ইউপি সদস্য রওশন আলী।
ফখর পুলিশকে জানায়, প্রতিশোধ নিতে অটোরিকসা কিনে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ১৮ জুলাই সুনামগঞ্জে অলিউরকে নিয়ে আসে সে। ফখর তার চাচাতো ভাই এনামের বড়পাড়ার ভাড়া বাসায় অলিউরকে রেখে যায়। যাওয়ার সময় বলে, বিশ্বম্ভরপুরে তার পাওনা আড়াই লক্ষ টাকা এনামের মাধ্যমে গ্রহণ করে সে অটোরিকসা কিনে দেবে। অলিউর এনামের বাসায় ১৮ ও ১৯ জুলাই অবস্থান করে। ২০ জুলাই তাকে বাসায় রেখে মধ্যবাজারে এসে এনাম ও মুহিতুল একটি গরু কাটার ধারালো ছুরি কিনে। পরে অলিউরকে নিয়ে ওইদিন এনাম ও তার বন্ধু কুতুবপুর গ্রামের নির্মাণশ্রমিক মুহিতুল সারাদিন শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। বিকেলে কোর্টের সামনে থেকে সিএনজি করে আব্দুজ জহুর সেতুতে নেমে হেঁটে হেঁটে লালপুর-রাধানগর পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানে সময়ক্ষেপণ করে। সাজানো পাওনা টাকা এখানেই অলিউরের কাছে দেওয়া হবে বলে তাকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হয়। রাত ১২টার দিকে গল্প করতে করতে এনাম ও মুহিতুলের কাছে অলিউর স্বীকার করে স্ত্রী হত্যার বিষয়টি। এই সময় মুহিতুল ইট দিয়ে অলিউরের মাথায় আঘাত করে। সাথে সাথে এনাম ছুরি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করলে এক পর্যায়ে ছুরি নিচে পড়ে যায়। এই ছুরি তুলে মুহিতুল বুকে পেটে আঘাত করে। পরে এনাম অলিউরের গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে। এসময় এনামের হাতের চারটি আঙুল কেটে যায়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ সড়কের পাশের ডোবায় ফেলে চলে আসে তারা। সকাল ৬টায় ফখরকে ফোন করে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করে হাত কেটে যাওয়ার বিষয়টি জানায় এনাম। ফখর তাকে দিরাই যাওয়ার কথা বলে। অপরদিকে শ্বশুরের কাছ থেকে জরুরি কাজের কথা বলে ১০ হাজার টাকা ধার নেয় ফখর। চুক্তি মাফিক খুনের জন্য আগাম ১৫ হাজার টাকা এনামকে দেয় ফখর।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এনাম জানায়, ৩০ হাজার টাকায় অলিউরকে খুনের চুক্তি হয় তার ভগ্নিপতি ফখরের সাথে। সেই টাকা থেকে অপর খুনি মুহিতুলকে দেওয়া হয় মাত্র ১ হাজার টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী