সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ০১:২৫ অপরাহ্ন

Notice :

চিঠি : সুখেন্দু সেন

ভারতীয় হিন্দি ছবির একজন প্রখ্যাত পরিচালক আছেন। জে.পি. দত্ত। তাঁর নির্মিত একটি ছবি আছে। ‘বর্ডার’। সেই ছবিতে একটা গান আছে। সেই গানে প্রাণের একটা টান আছে। সে টানে বড় আবেগ আছে। সে আবেগ উৎসরণে সততা আছে, মমতা আছে। যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানরত সৈনিকেরা অপেক্ষা করে থাকে কবে অনেক দূরের গ্রাম থেকে আপনজনের চিঠি আসবে। একদিন চিঠি আসে। একসঙ্গে অনেকগুলি, অনেক জনের। সবাই যার যার চিঠি বেছে নিয়ে আপন মনে পড়ে। সেই চিঠির ছত্রে-ছত্রে প্রিয়জনের মুখ ভেসে উঠে। সবুজ-শ্যামল গ্রাম, পথ-ঘাট-মাঠ-নদী মনের আয়নায় ছায়া তুলে। যেনো সবাই অপেক্ষা করে আছে, কবে ছেলে গ্রামে ফিরবে।
একসময় চিঠির জন্য এমন প্রতীক্ষা ছিল সকলেরই। ডাকপিয়নের জন্য অধীর অপেক্ষা, কখন এসে দরজায় কড়া নেড়ে বলবেÑ আপনার চিঠি। ব্যাকুল হৃদয়ে আবেগে উত্তেজনায় খামে পুরা চিঠি দ্রুত খোলে এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা চোখের আড়ালে, দূর প্রবাস-নিকট প্রবাসে থাকা প্রিয়জনের সব খবরা খবর। চিঠি ছুঁয়ে থাকা কত ভালোবাসা আবেগ-আবেশ। কখনও খুশির বার্তা, কখনও কষ্টের, কখনও রাগ-অনুরাগ-অভিমান-বিচ্ছেদের বেদনা মাখা সে চিঠিগুলি। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায়Ñ কত চিঠি লেখে লোকে। কত সুখে প্রেমে আবেগে স্মৃতিতে কত দুঃখে ও শোকে।
যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ মাধ্যম চিঠি। ভাব বিনিময়ে চিঠি ব্যতীত অন্য কোন মাধ্যমের অস্তিত্ব ছিল না। তাই চিঠির ছিল সার্বজনীন আবেদন। হৃদয়ের একান্ত কথা যা সরাসরি মুখে বলা যায় না, তা অনায়াসে প্রকাশ করা যায় চিঠিতে। তেমনি চিঠি লেখা, চিঠি পাওয়া এবং চিঠি পড়ার মধ্যে অন্য রকম অনুভূতি, অন্য রকম আবেগ আনন্দ। ‘চিঠি’ বলতেই হৃদয়ে ঝনঝন করা এক অনুভব।
বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, ট্যালেক্স, ফ্যাক্স, মোবাইল, ইন্টারনেট, ই-মেইল এবং হালের ফেসবুক ও টুইটারের ব্যাপক প্রচলনের সাথে ভাব বিনিময়ে সংবাদ আদান-প্রদানে চিঠির গুরুত্ব অনেক কমে গেছে। চিঠির সে সোনালী দিন ক্রমে বিলীন হওয়ার পথে। গ্রামে গঞ্জে আনাচে-কানাচে মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি ঘটায় চিঠির জন্য কেউ আর অপেক্ষায় থাকে না। নতুন প্রজন্মের কাছে ডাকপিয়ন, ডাকঘর অনেক ক্ষেত্রে অপরিচিত রয়ে গেছে। পোস্ট অফিসগুলিতেও এখন আর চিঠি আদান-প্রদানের ব্যস্ততা নেই।

২.
ঠিক কবে থেকে চিঠির প্রচলন হয়েছিল, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। চিঠি যদি হয়ে থাকে মানব মনের ভাব প্রকাশের অবলম্বন, বার্তা প্রেরণের মাধ্যম তবে মানব সভ্যতা বিকাশের আদি যুগেই এর প্রচলন শুরু হয়। আদিম মানুষ বিভিন্ন শব্দ সৃষ্টি করে ভাব বিনিময় করত। আগুন জ্বেলে, ধোঁয়া সৃষ্টি করে সংকেত পাঠাতো। বিভিন্ন শব্দই ক্রমে চিহ্নের জন্ম দিল। সেই চিহ্ন থেকেই বর্ণের সৃষ্টি। সে বর্ণ নিয়ে ভাষা লেখ্য রূপ পেল। কাগজ আবিষ্কারের পর লেখা এবং বার্তা আদান-প্রদানের বিপ্লব ঘটে। প্রাচীন রামায়ণ-মহাভারত মহাকাব্যে বার্তা বহনের জন্য ‘দূতের’ উল্লেখ রয়েছে। ৪ হাজার ৫শত বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় কাদা মাটির প্লেটে চিহ্নলিপিতে বার্তা প্রেরণের পরিচয় মিলেছে। গাছের ছাল, পশুর চামড়ার খাম আকৃতির ঢাকনায় এর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হত। এ ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার নিদর্শন রয়েছে প্রাচীন পারস্য, সুমেরিয়, ব্যবিলনীয় সভ্যতায়। পায়রার মাধ্যমে বার্তা প্রেরণের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস। হংস, বানর, পাখি এমনকি আষাঢ়ের মেঘও বার্তাবাহক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আদি কবি কালিদাসের কাব্যে বিরহী যক্ষ মেঘের মাধ্যমে অলকাপুরীতে প্রিয়তমার কাছে বার্তা প্রেরণ করেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব (৩২১-২৯৭) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শাসনামলে কিছুটা শৃংখলাবদ্ধ বার্তা প্রেরণের নিদর্শন পাওয়া যায়। রাজধানী হতে বিশাল সা¤্রাজ্যের সীমান্ত প্রদেশগুলিতে নিয়মিত বার্তা-নির্দেশনামা প্রেরণ করা হত। পরিব্রাজক ফা-হিয়েন এবং ইউয়েন সাং-এর বর্ণনায় পরবর্তী স¤্রাট অশোক, বিক্রমাদিত্য এবং হর্ষবর্ধনের শাসনামলে এরূপ বার্তা বিনিময়ের বিবরণ রয়েছে। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে যখন ভারতবর্ষে আগমন করেন, তখন মোহাম্মদ-বিন-তুঘলকের শাসনকাল। অনেক তুঘলকি কা-ের জন্ম দিলেও সুলতান মোহাম্মদ-বিন-তুঘলক ডাক ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল নিদর্শন রেখেছেন। সম্ভবত ভারতবর্ষের ডাক ব্যবস্থার ইতিহাস এখান থেকেই রচিত হয়েছিল। ইবনে বতুতার বর্ণনায় তখনকার বার্তা আদান-প্রদানের এক সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। তিনি যখন পাঞ্জাব নদী তীরে পৌঁছেন তখন সীমান্তের গোয়েন্দা রক্ষীরা মুলতানের প্রাদেশিক শাসনকর্তার নিকট রিপোর্ট পাঠায়। যা পরবর্তীতে দিল্লীর রাজ দরবারে প্রেরণ করা হয়েছিল। স্বাভাবিক অবস্থায় মুলতান থেকে দিল্লী যাতায়াত কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার। কিন্তু শৃংখলাবদ্ধ ডাক ব্যবস্থায় দিল্লী থেকে অনুমতিপত্র এসে পৌঁছে যায় মাত্র ৫ দিনের ব্যবধানে। তখন দু’ধরনের ডাক ব্যবস্থার প্রচলন ছিল। অশ্বারোহী বা মাউন্টেন কুরিয়ার, অন্যটি পদাতিক। চার মাইল অন্তর দ্রুতগামী অশ্বের অবস্থান কেন্দ্র ছিল। এক অবস্থান থেকে বিরতিহীনভাবে হাত বদল হয়ে বার্তা দ্রুত পৌঁছে যেত গন্তব্যে। পদাতিক ডাকবাহীর অবস্থান ছিল প্রতি তিন মাইল অন্তর এক একটি লোকালয়ের প্রান্তে। একটি দ-ে পিতলের ঘণ্টা বেঁধে বার্তাবাহী রানার যথাশক্তি দৌড়ে অতিক্রম করতো তিন মাইলের ব্যবধান। ঘণ্টাধ্বনি শুনে অগ্রবর্তী কেন্দ্রের অপেক্ষমাণ বার্তাবাহক প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে আসতো। কাল বিলম্ব না করে হস্তান্তরিত ডাক নিয়ে সে আবার ছুটতো ৩ মাইল অন্তর অন্য কেন্দ্রের উদ্দেশ্য। শের শাহের আমলে সিন্ধু থেকে বাংলার সোনারগাঁও পর্যন্ত নিয়মিত অশ্বারোহী ডাক যোগাযোগ ছিল। এই বিশাল দূরত্বে প্রতি দু’মাইল অন্তর ১৭শ’ টি বিরতি কেন্দ্র্র স্থাপিত হয়েছিল যাতে অশ্বগুলি পরিশ্রান্ত না হয়ে দ্রুততার সাথে নির্দিষ্ট গন্তব্য পৌঁছতে পারে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে বাংলার জমিদারেরা ১৭৬৫ সালে পৃথক ডাক লাইন চালু করেন। কোম্পানির যুগে জমিদারেরা সরকারের প্রতিনিধি এবং যথেষ্ট শক্তিশালী। রবার্ট ক্লাইভ নিয়মিত ডাক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। জমিদারেরা ডাক হরকরা নিয়োগ দিতেন। তখন পর্যন্ত এই ডাক ব্যবস্থা, চিঠিপত্রের আদান-প্রদান সীমাবদ্ধ ছিল রাজা-বাদশা, স¤্রাট, শাসনকর্তা, আমত্য পরিষদের আদেশ-নির্দেশ, রাজস্ব আদায়, সরকারি নিয়োগ প্রভৃতি বিষয়ের মধ্যে। সাধারণেরা এর সুবিধাভোগী ছিলেন না এবং এ নিয়ে তেমন কোন আগ্রহও ছিল না। লেখাপড়া জানা লোকের অভাবে পত্র লিখা ও পড়া সম্ভব হতো না। ক্রমে শিক্ষার বিস্তৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতি, শিল্প স্থাপন, চাকুরি পেশায় দূরবর্তী স্থানে অবস্থান, প্রবাসে পাড়ি দেয়া প্রভৃতি কারণে চিঠির ব্যাপক প্রচলন শুরু হতে থাকে এবং ডাক ব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে এক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পরিণত হয়। জনজীবনে ব্যবসা-বাণিজ্যে সরকারি কাজে, ব্যক্তিগত যোগাযোগে চিঠি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নেয়।
পোস্ট-অফিস বা ডাকঘর শব্দের প্রচলন হয় ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে। মূলত ব্রিটিশ ডাক ব্যবস্থার অনুকরণে এবং ব্রিটিশরাজ কর্তৃক পাক-ভারতে আধুনিক ডাক ব্যবস্থার বিন্যাস ঘটে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ যদিও পাকিস্তানি ডাকের উত্তরাধিকার তবুও এর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠে স্বাধীন বাংলাদেশ ডাক ও তার বিভাগ। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণের পর কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদকে পোস্ট মাস্টার জেনারেল নিয়োগ করে বাংলাদেশ ডাক ও তার অধিদপ্তর কার্যক্রম শুরু করে। মুক্তাঞ্চলে প্রায় ৪০টি ফিল্ড পোস্ট অফিস স্থাপন করা হয়েছিল। চুয়াডাঙ্গার ট্রেজারি থেকে আনীত পাকিস্তানি খাম ও ডাক টিকেটে বাংলাদেশ ছাপ দিয়ে তা ব্যবহার করা হতো। ২৬ জুলাই কলকাতার বাংলাদেশ মিশন এবং লন্ডনে হাউজ-অব-কমন্সের হারকোর্ট রুমে একযোগে স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন মুদ্রা মানের ৮টি মুদ্রিত ডাক টিকেট উন্মোচন করা হয় এবং ২৯ জুলাই থেকে তা চালু হয়।

৩.
বাংলা গদ্যের বিকাশ এবং সময়ের সাথে সাথে চিঠিপত্র ক্রমে জরুরি প্রয়োজনের সীমারেখা ছাপিয়ে প্রকাশ গুণ ও ভাবের ঐশ্বর্যে হয়ে উঠে নিখাদ গদ্য। উন্নীত হয় সাহিত্যে। বিশ্বসাহিত্যের বিরাট অংশ দখল করে আছে পত্রসাহিত্য। বিখ্যাত ব্যক্তিদের অনেক পত্র ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও স্বীকৃত। প্রাচুর্য্যরে দিক দিয়ে রবীন্দ্র রচনার একটি প্রধান অংশ চিঠি। কবির মানসলোকের অনেক রহস্য এই চিঠিপত্রের মধ্যেই নিহিত রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই ছিন্নপত্র, ভানুসিংহের পত্রাবলী এবং পথের প্রান্তে নামে তিন খ- চিঠিপত্র সম্পাদনা করে গিয়েছিলেন। ছিন্নপত্রাবলীতে তাঁর জীবনের গভীরতম ভাষ্যের উন্মেষ ঘটেছে। পরবর্তী সময়ে ‘চিঠিপত্র’ নামে বিশ্বভারতী থেকে ১৩ খ-ে রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলী প্রকাশিত হয়। যা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ৮০ বছরের জীবনে তিনি প্রায় ৫ হাজার চিঠি লিখেন। মুদ্রিত আকারে যা প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠা বইয়ের সমান। স্বজন, প্রিয়জন, কবি-সাহিত্যিক, সম্পাদকসহ বিশ্বের প্রখ্যাত মনীষীদের সাথে রবীন্দ্রনাথের পত্র যোগাযোগ ছিল। নির্মল কুমারী মহালনবীশ, জগদীশ চন্দ্র বসু, সুভাস চন্দ্র বসু, অন্নদা শংকর রায়, প্রভাত মুখ্যপাধ্যায়, কাদম্বীনি দেবী, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরী, মৃণালিনী দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, সুধীন্দ্রনাথের কাছে তিনি নিয়মিত চিঠি লিখতেন। এতে বিবৃত হয়েছে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রসঙ্গ, দেশ-বিদেশে ভ্রমণ, ঈশ্বর প্রসঙ্গ, আধ্যাত্মিক ভাবনা, সমসাময়িক ঘটনা, রাজনীতি, সমাজনীতি, সাহিত্যতত্ত্ব, মানব ধর্মের কথা। চিঠি লিখেই তিনি শুধু আনন্দ পেতেন না। চিঠির উত্তরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতেন। কবির ব্যগ্রতার তীব্রতা প্রকাশ পেয়েছে মানসী কাব্যের ‘পত্রের প্রত্যাশা’ কবিতায়Ñ চিঠি কই, কই চিঠি। মৃণালিনী দেবীকে তিনি একবার লিখেন ভাই, চিঠি বড় হোক, ছোট হোক, মন্দ হোক একটা করে চিঠি আমাকে রোজ লেখো না কেন? ডাকের সময়ে চিঠি না পেলে যে বড় খালি ঠেকে। ছোটদের কাছ থেকে পাওয়া চিঠির উত্তর দিতেও তাঁর বিলম্ব হতো না। পাঁচ বছরের ছোট ছেলে সালাউদ্দিন মাহমুদ মামুন পেনসিল দিয়ে চিঠি লিখেছিল ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ আগস্টÑ আমি তোমার সহজ পাঠ পড়েছি, বড় হয়ে তোমার সব বই পড়ব এবং শান্তিনিকেতনে তোমাকে দেখতে যাবো। ১৭ আগস্ট রবীন্দ্রনাথ চিঠির উত্তরে লিখেছিলেনÑ তোমাকে নিমন্ত্রণ দিয়ে রাখছি। …খুব শীঘ্র যদি বড় হতে পার তাহলে সাক্ষাৎ অসম্ভব নয়…। ইতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সুসাহিত্যিক শামসুন্নাহার মাহমুদের পুত্র মামুনের বড় হয়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ ঘটেছিল কিনা জানা নেই, তবে বিশ্বকবির সোনার বাংলা রক্ষায় স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্নেই জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ৭১’র ২৬ শে মার্চ পুলিশের ডিআইজি পদে থাকাবস্থায় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে তিনি শহীদ হন।
প-িত জওহরলাল নেহেরু আদরের কন্য ইন্দু’র কাছে অনেক অনেক পত্র লিখেছেন। শিশুকাল থেকেই পিতার পত্রগুলো ছিল ইন্দিরার নিকট একটি প্রিয় বিষয়। কখনো জেল থেকে, রাজনৈতিক ব্যস্ততায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থানকালে, দেশের বাইরে থেকে নেহেরু নিয়মিত কন্যার কাছে চিঠি লিখতেন। একইভাবে পড়াশোনার জন্য যখন ইন্দিরা ইউরোপে অবস্থান করছিলেন তখনও পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত চিঠিগুলি ছিল তার নিত্যসঙ্গী। এসকল চিঠি পরবর্তীকালে সংকলিত হয়ে ‘বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গে’ নামক একটি বিশাল গ্রন্থ প্রকাশিত হয় যার ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। গ্রন্থটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটিয়ে এবং গণতন্ত্রের সংজ্ঞায়নে অমর হয়ে আছেন। দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন না থাকলেও শিক্ষা কি তা তিনি ভালোই বুঝতে পেরেছিলেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় তার পুত্রকে বিদ্যালয়ে প্রেরণ করে প্রধান শিক্ষকের নিকট লিখিত এই ঐতিহাসিক পত্রটিতেÑ ‘মাননীয় মহাশয়, আমার পুত্রকে জ্ঞান অর্জনের জন্য আপনার কাছে প্রেরণ করলাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি। …। তাকে শিখাবেন ৫টি ডলার কুড়িয়ে পাওয়ার চেয়ে একটি উপার্জিত ডলার অনেক মূল্যবান। এও তাকে শিখাবেন কিভাবে পরাজয় মেনে নিতে হয় এবং কিভাবে বিজয় উল্লাস উপভোগ করতে হয়। হিংসা থেকে দূরে থাকার শিক্ষাও তাকে দিবেন। যদি পারেন নীরব হাসির গোপন সৌন্দর্য্য তাকে শিখাবেন। …। বইয়ের মাঝে কি রহস্য আছে তাও তাকে বুঝতে শিখাবেন। আমার পুত্রকে শিখাবেন বিদ্যালয়ে নকল করার চেয়ে অকৃতকার্য হওয়া অনেক বেশি সম্মানজনক। …। যারা নির্দয়, তাদের সে যেন ঘৃণা করতে শিখে। …। আমার পুত্রের প্রতি সদয় আচরণ করবেন। কিন্তু সোহাগ করবেন না। কেননা আগুনে পুড়েই ইস্পাত খাঁটি হয়। আমার সন্তানের যেন অধৈর্য্য হওয়ার সাহস না থাকে, থাকে যেন সাহসী হওয়ার ধৈর্য্য। তাকে এ শিক্ষাও দিবেন নিজের প্রতি তার যেন সুমহান আস্থা থাকে আর তখনই তার আস্থা থাকবে সমগ্র মানবজাতির প্রতি। ইতি- আপনার বিশ্বস্ত আব্রাহাম লিংকন।
বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন রণাঙ্গন থেকে পিতা-মাতা প্রিয়জনকে লেখা চিঠি নিয়ে প্রথম আলো প্রকাশ করে একাত্তরের চিঠি। রক্তে লেখা অশ্রু ভেজা চিঠিগুলিতে দেশপ্রেমের কি অপূর্ব দ্যুতি ছড়িয়ে আছে যা পাঠকের অন্তর ছুঁয়ে যায়, হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তুলে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মুক্তিযুদ্ধের সাথে যুগ-যুগান্তরের সেতুবন্ধন হয়ে থাকবে মর্মস্পর্শী এই চিঠিগুলি।
৫নং সেক্টরের টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে যুদ্ধরত কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র সিরাজুল ইসলামের পিতার কাছে লেখা একটি চিঠি সাচনাবাজার প্রত্যক্ষ যুদ্ধে শহীদ হবার পর সংগ্রহ করা হয়েছিল। সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন মর্মস্পর্শী এই চিঠিটি প্রায়ই মুক্তিযোদ্ধাদের পাঠ করে শোনাতেনÑ

‘টেকেরঘাট হইতে’
তারিখ : ৩০.০৭.৭১
প্রিয় আব্বাজান,
আমার সালাম নিবেন। আশা করি খোদার কৃপায় ভালোই আছেন। বাড়ির সকলের কাছে আমার শ্রেণিমত সালাম ও ¯েœহ রহিলো। বর্তমানে যুদ্ধে আছি। আলী রাজা, রওশন, সাত্তার, রেনু, ইব্রাহিম, ফুল মিয়া সকলেই একত্রে আছি। দেশের জন্য আমরা সকলেই জান কোরবান করিয়াছি। আমাদের জন্য ও দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য দোয়া করিবেন। আমি জীবনকে তুচ্ছ মনে করি। কারণ দেশ স্বাধীন না হলে জীবনের কোন মূল্য থাকিবে না। তাই যুদ্ধকেই জীবনের পাথেয় হিসাবে নিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে মাকে কষ্ট দিলে আমি আপনাদেরকে ক্ষমা করিব না। পাগলের সব জ্বালা সহ্য করিতে হইবে, চাচা-মামাদের ও বড় ভাইদের নিকট আমার সালাম। বড় ভাইকে চাকরিতে যোগ দিতে নিষেধ করিবেন। জীবনের চেয়ে চাকরি বড় নয়। দাদুকে দোয়া করিতে বলিবেন। মৃত্যুর মুখে আছি। যে কোন সময় মৃত্যু হইতে পারে এবং আমি মৃত্যুর জন্য সর্বদা প্রস্তুত। দোয়া করিবেন মৃত্যু হইলেও যেন দেশ স্বাধীন হয়। তখন দেখবেন লাখ লাখ ছেলে বাংলার বুকে পুত্রহারাকে বাবা বলে ডাকবে। এই ডাকের অপেক্ষায় থাকুন।
আর আমার জন্য চিন্তার কোন কারণ নাই। আপনার দুই মেয়েকে পুরুষের মতো শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবেন। তবেই আপনার সকল সাধ মিটে যাবে। দেশবাসী স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য দোয়া কর, মীরজাফরী করিও না। কারণ মুক্তিফৌজ তোমাদের ক্ষমা করিবে না এবং বাংলায় তোমাদের জায়গা দেবে না।
সালাম, দেশবাসী সালাম।
ইতি
মো. সিরাজুল ইসলাম।
মুক্তিযুদ্ধকালীন মুক্তিসংগ্রামী সংগঠকদের, মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতিসহ মন্ত্রিসভার সদস্যদের, রাজনৈতিক-সামরিক নেতাদের ব্যক্তিগত দাপ্তরিক পত্রেরও যথেষ্ট ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডন্টে নিকসন, সিনেটর কেনেডি, ব্রিটিশ এমপি জন স্টোন হাউজ, ফরাসি সাহিত্যিক ও দার্শনিক আন্দ্রে মালরো সহ বিশ্বের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের এবং ত্রাণসংস্থা অক্সফাম, ইউনিসেফ, ইউএনএইচসিআর, রেডক্রস এর লেখা বিভিন্ন পত্র সে সময়কার অভ্রান্ত দলিল রূপে গণ্য।

৪.
প্রেম চিরন্তন, মানব-মানবীর হৃদয়ের সুকুমার প্রেম জন্ম দিয়েছে শিল্প-সুন্দর। প্রেম ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে কাব্য, সংগীত, কলা। তেমনি পত্রসাহিত্যের বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে প্রেমিক-প্রেমিকার আকুতিগাঁথা অনেক শৈল্পিক প্রেমপত্র। মানব হৃদয়ের প্রেম ভালোবাসার কতো নিমগ্ন কথা প্রেমপত্রে প্রকাশিত হয়ে আসছে। হাতে প্রেমপত্র গুঁজে দেওয়ার কত রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, হৃদস্পন্দনের দু’একটি বিট মিস্ করার মতো মুহূর্ত এসেছে কতো জনের জীবনে। কাঁপা হাতে লেখা প্রথম প্রেমের চিঠিতে মূর্ত হয়ে উঠতো প্রেমানুভূতির প্রথম আলো। হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা নিবেদনের, নিঃশর্ত সমর্পণের কী উদারতা প্রকাশ পেত সে চিঠিগুলিতে। কতো বিচিত্র সম্বোধন, কত অনুরাগের প্রকাশ-উচ্ছ্বাস। নীল খামে পুরা বর্ণিল ফুল, পাখি, হৃদয়ছাপ লেটার প্যাডে প্রাণের আকুতি, হৃদয়ের স্পর্র্শ নিয়ে গোপন পথ সন্ধানে পত্রগুলি বিভিন্ন উপায়ে পৌঁছে যেত প্রিয়জনের কাছে।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গ্রেট ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। একাধারে রাজনীতিক, লেখক, সৈনিক, নোবেল বিজয়ী, ইতিহাসবেত্তা এবং সফল প্রেমিকও বটে। সিনিমেন্টাইন হুজিয়ার নামক এক নারীর প্রেমে পড়েন তিনি। ১৯০৮ সালে বিয়ে করে ৫৬ বছর সুখী দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছেন। দূরে গেলে চার্চিল প্রিয়তমাকে চিঠি লিখতেন ‘বিড়াল’ সম্বোধনে আর স্ত্রী প্রিয়তম চার্চিলকে সম্বোধন করতেন ‘পাগ’ নামে (বিশেষ ধরনের কুকুর)। চিঠিগুলি ইতিহাসের এক বিশেষ স্থান দখল করে ব্রিটিশ রয়েল মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। পাশ্চাত্য সংগীতের কিংবদন্তি জার্মানির লর্ড ইউগভ্যান বিটোফোন তার অজ্ঞাতনামা প্রেমিকার উদ্দেশ্য লেখা হৃদয়ছোঁয়া চিঠি শেষ করে লিখতেনÑ ইতি, চিরদিনই তোমার, চিরদিনই আমার, চিরদিনই আমাদের। ইংল্যান্ডের রাজা ৮ম হেনরি প্রথম বিয়ে করে সুখী হতে পারেননি। একসময় তিনি অ্যানি বনিয়ান নামে এক নারীর প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। ভালোবাসায় কাতর এই রাজা গোপন প্রেমপত্রে অ্যানিকে নিজের মালকিন এবং নিজেকে সেবক বলে উল্লেখ করতেন। ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দে গোপনে বিয়েও হয় তাদের এবং এক সময় অ্যানি ইংল্যান্ডের রাণী হয়েছিলেন। কিন্তু এই প্রেমের পরিণতি হয়েছিল বড় মর্মান্তিক। জনকিটস্ প্রতিবেশিনী ফ্যানি ব্রাউনকে কবিতার দ্যুতিময় ভাষায় প্রেম নিবেদন করে লিখেছেনÑ ভালোবাসা আমাকে স্বার্থপর করেছে, আমি সবকিছুই ভুলে যাই কিন্তু তোমাকে আরেকবার দেখার কথা ভুলতে পারি না। নেপোলিয়ানের মতো দুর্ধর্ষ যোদ্ধাও প্রেমে কাতর হয়ে প্রেমপত্র লিখেছেন।
রোমান্টিক চিঠি লেখার ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামকে গুরু মানতেই হয়। নজরুলের ছন্নছাড়া জীবনে প্রেম এসেছে, ব্যর্থতা এসেছে, নজরুল জীবন প্রভাবিতও হয়েছে। দু’জন নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন নজরুল। একজন নার্গিস বেগম দ্বিতীয় আশালতা সেনগুপ্তা (প্রমিলা কাজী)। প্রথম জনের সঙ্গে সম্পর্ক রহস্যজনক কারণে বিয়ের রাতেই শেষ হয়ে যায়। ১৬ বছর তাদের আর দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। দ্বিতীয় জনকে বিয়ে করেন প্রথম বিয়ের তিন বছর পর। কিন্তু নার্গিসকে নজরুল ভুলতে পারেননি। দীর্ঘ অদর্শনের পর বিচ্ছেদপ্রাপ্ত প্রথমা স্ত্রীকে নজরুল এক অবিস্মরণীয় পত্র লিখেছিলেনÑ
কল্যাণীয়াষু, তোমার পত্র পেয়েছি, …সেদিন নববর্ষার নবঘন সিক্ত প্রভাতে। ১৫ বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে, এমনি নবধারার প্লাবন নেমেছিলÑতা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পার। …এই আষাঢ় আমার কল্পনার স্বর্গরাজ্য থেকে টেনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত ¯্রােতে। …যাক, তোমার অনুযোগের উত্তর দিই। …তোমার উপর আমি কোন জিঘাংসা পোষণ করি নাÑএ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি। আমার অন্তর্যামী জানেন তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা। কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি। তোমাকে দগ্ধ করতে চাইনি। তুমি এই আগুনের পরশ মানিক না দিলে আমি অগ্নিবীণা বাজাতে পারতাম না। ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না। তোমার যে কল্যাণ রূপ আমার কিশোর বয়সে প্রথমে দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালোবাসার অঞ্জলি দিয়েছিলাম সে রূপ আজো স্বর্গের পারিজাত মান্দারের চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। …আজ আমি চলেছি জীবনের অস্তমান দিনের শেষ রশ্মি ধরে ভাটার ¯্রােতে। তোমাকে লেখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক। যেখানেই থাকি, বিশ্বাস কর আমার অক্ষয় আশীর্বাদ কবচ তোমায় ঘিরে থাকবে। তুমি সুখী হও, শান্তি পাওÑএই প্রার্থনা। আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস কর, আমি তত মন্দ নই। এই আমার শেষ কৈফিয়ত।
ইতি-
নিত্য শুভার্থী
নজরুল ইসলাম।

৫.
চিঠি নিয়ে কতো কবিতা, গান বাংলা সহিত্য-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে রেখেছে তার দীর্ঘ বিবরণ এ নিবন্ধে সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলীর কিছু পরিচয় পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। কাজী নজরুল ইসলামের দোলনচাঁপা মূলতঃ পত্রভাব নির্ভর। নিমাই ভট্টাচার্যের ‘মেমসাহেব’ উপন্যাসটিও চিঠি নির্ভর। পত্রে পত্রে শেষ হয়ে গেছে এমন গল্প-উপন্যাসও রয়েছে অনেক। সংগীত ভুবনে চিঠির জয়জয়কার। আধুনিক, ব্যান্ড, লোকগানেও চিঠির অবাধ বিচরণ। বিগত শতকের মধ্যভাগে গ্রামোফোন রেকর্ডে দুই খ-ে জগন্ময় মিশ্রের চিঠি-১, ২ গানের স্মৃতিমেদুর, শ্রুতিমধুর আবেদন এখনও অটুট।
‘বলেছিলে তাই চিঠি লিখে যাই, কথা আর সুরে সুরে
মন বলে তুমি রয়েছ যে কাছে আঁখি বলে কত দূরে।
… …. …. …… ….. …. ….
যত লিখে যাই তবু না ফুরায় চিঠি তো হয় না শেষ
স্মৃতির বীণার আজো বাজে হায় প্রথম দিনের রেশ।
… …. …. …… ….. …. ….
যাবার বেলায় হাত দুটি ধরে বলেছিলে চিঠি দিও, চিঠি দিও মোরে
দূর থেকে তাই গানের লিপিকা লিখে যাই সুরে সুরে…। ’
গানের সুর আর কথার পরতে পরতে ভরপুর দরদ। আবেগ, আকুলতা আর রোমাঞ্চময়তা। আমাদের শৈশবে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠকে চোখ বুঝে বিভোর হয়ে এ গান শুনতে দেখেছি। এমন বিভোরতার গুঢ় রহস্য ভেদের বুদ্ধি তখনো মগজে উৎপন্ন হয়নি। বনশ্রী সেনগুপ্তের কণ্ঠেÑ আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম, সাবিনা ইয়াসমিনেরÑ চিঠি দিও প্রতিদিন, চিঠি দিও/নইলে থাকতে পারব না/চিঠি গুলি অনেক বড় হবে/পড়তে পড়তে সকাল, দুপুর আর রাত্রি চলে যাবে। আরেকটি গানÑ চিঠি নিয়ে ওরে মেঘ চলনা, তার কানে কানে গিয়ে বলনা, চলনা। রুদ্রের লেখাÑ ভালো আছি ভালো থেকো আকাশের ঠিকানায় চিঠি দিও। মিতালী মুখার্জীরÑ ‘ও সাগর, ছোট্ট এ চিঠি নিয়ে ভেসে যাও’। এমন অসংখ্য আধুনিক গানে গানে বিরহী মনের কাতরতা চিঠিকে নির্ভর করে প্রকাশিত হয়েছে। সত্তর-আশি দশকে লোকগীতি শিল্পী মিনা বড়–য়ার জনপ্রিয় একটি গানÑ ‘যারে যা চিঠি লেইখ্যা দিলাম সোনা বন্ধুর নামে রে/আমার অন্তরের প্রেম ভইরা দিলাম ভালোবাসার খামে রে’। আরো কত গান প্রিয়দর্শনে আকুল হয়ে সুরে সুরে একাত্ম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘বিদেশ গিয়া বন্ধু তুমি আমায় ভুইল না/চিঠি দিও পত্র দিও জানাইও ঠিকানা।’ মমতাজের নিজস্ব স্টাইলের গানÑ ‘চিঠি এসেছে আমার নামে/পোস্ট করেছে রঙিন খামে/চিঠি আমি কোথায় রাখি কাঁপে হাত পাও’। অনেক দিন আগের লোকগীতির একটি লাইন আজো মনে পড়েÑ ‘আঙ্গুলও কাটিয়া কলমও বানাইয়া নয়নের জলে করলাম কালি।’ যাদের মুখে এ গানটি সচরাচর শোনা যেত তারা হয়তো লিখতে-পড়তে জানতো না কিন্তু চোখের আড়ালে থাকা প্রিয়জনকে একান্ত মনের কথা যে চিঠি লিখে জানানো যায় সে উপলব্ধি ছিল। কিন্তু অসহায়ের যে চিঠি লেখার কলম কালিই নেই।
নাগরিক লোকজ উভয় সংস্কৃতিতে চিঠির সমান অধিকার। ব্যান্ড সংগীতেও চিঠি বিষয়টির সরব যান্ত্রিক উপস্থিতি। জেমস্ এর ‘পত্র দিও’, ‘লেখলাম চিঠি’, শিরোনামহীনের ‘চিঠি’, বাপ্পা মজুমদারের ‘শেষ চিঠি’ এবং আরো অনেক শিল্পীর চিঠি বিষয়ক অ্যালবাম রয়েছে। চিঠির যুগ শেষ হয়ে এলেও চিঠি নিয়ে গানের জনপ্রিয়তার কোন কমতি নেই।
ভিন্ন আবেদনে চিঠি এসেছে কবিতায়। সমাজবাদী কবি সুকান্ত’র বিখ্যাত রানার কবিতাটি মূলত চিঠি আর খবরের বোঝা কাঁধে বয়ে চলা কর্তব্যনিষ্ঠ দরিদ্র রানারের জীবন বেদনার চিত্র। এ বেদনার অবসান ঘটিয়ে দিন বদলের চিঠি নিয়ে আসার জন্য রানার রূপী শ্রমজীবীদের প্রতি আহ্বান, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের দরদি গলায় প্রাণ পেয়েছে Ñ
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে মেলে…।
… …. …. …… ….. …. ….
এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোন দিনও
এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ।
… …. …. …… ….. …. ….
দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি
ওকে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি…।
ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ লেখেন, ‘মাগো ওরা বলে’ কবিতাটি। ‘চিঠিটা তার পকেটে ছিল/ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা/মাগো ওরা বলে, সবার কথা কেড়ে নেবে/তাই কি হয়?/তোমার জন্য কথার ঝুঁড়ি নিয়ে তবেই না বাড়ি ফিরব’। মহাদেব সাহা চিঠি নিয়ে লেখেনÑ ‘চিঠি দিও’
“করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙ্গুলের মিহিন সেলাই, ভুল বানানেও লিখো প্রিয়
বেশি হলে কেটে ফেলে তাও,
একটু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড় বোনা একখানা চিঠি…।”
কবি কুমার সৌরভের চিঠি অনুষঙ্গটি ‘আকাশ নীল হবে’ কবিতায় রূপ পেয়েছে এভাবেÑ ‘আকাশে নীল চাঁদুয়া লাগিয়ে দিলে সূর্য গোলাপী হবে/এরপর রূপালী চাঁদ হাসবে বাড়ির আঙ্গিনাতে/আমি কমনীয় আলোর গায়ে পত্র লিখে দিব/তোমাকে আমন্ত্রণের’।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র কেবল গদ্য সাহিত্যকেই সমৃদ্ধ করেনি। কাব্যেও ঠাঁই পেয়েছে রৈবিক বাঙ্গময়তায়। পুনশ্চঃ কাব্যের ‘পত্র লেখায়’ কবি লেখেনÑ দিলে তুমি সোনা মোড়া ফাউন্টেন পেন/কতমত লেখার আসবাব/ছোট্ট ডেক্সো খানি আখরোট কাঠ দিয়ে গড়া/ছাপমারা চিঠির কাগজ নানা বহরের/ রুপোর কাগজ কাটা এমামেল করা/কাচি, ছুরি, গালা, লাল ফিতে/…বলে গিয়েছিলে তুমি চিঠি লেখা চাই একদিন পরে পরে।’
চিঠিকে উপজীব্য করে লেটার অব জুলিয়েট’ দি লেটার রাইটার, মেরি এন্ড মার্কস, ডিয়ার জন নামে বেশ কয়েকটি মুভিও নির্মিত হয়েছে।
একসময় উড়োচিঠির কথা শোনা যেতো। নিজ পরিচয় গোপন রেখে কাউকে বিব্রত বা বিপদে ফেলার জন্য কোথা থেকে উড়ে আসতো সে চিঠি তার হদিস পাওয়া যেতো না। দুর্ধর্ষ ডাকাতরাও নাকি চিঠি লিখে জানান দিয়ে ডাকাতি করতে আসতো এমন গল্প গোয়েন্দা সিরিজে এবং লোকমুখেও প্রচলিত ছিল। অনেক চিঠি আবার ডাকপিয়ন কিংবা বাহক ছাড়াই শর্টকাট দূরত্বে ছোড়ে দেওয়া হতো প্রাপকের উদ্দেশ্যে। লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে বিপদের সম্ভাবনাও ছিল। স্কুল জীবনে আমার সহপাঠী চার বন্ধু, একেবারে রাজযোটক। গলায় গলায় ভাব। বন্ধুত্বে দৃঢ়তার কারণ চারজনই সিনেমা পাগল। স্কুল পালিয়ে একসঙ্গে ম্যাটিনি-শো দেখা হতো সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে। পূর্ব যোগাযোগের অভাবে পরিকল্পিত ম্যাটিনি-শো দেখার দিনে একজন চলে আসে ক্লাসে। বাকি তিন বন্ধু তো মহাবিভ্রাটে। এক বন্ধুকে ফেলে রেখে সিনেমা দেখাÑ অসম্ভব, জীবন গেলেও নয়। কিন্তু পরবর্তী সপ্তাহে যে এমন ফাইটিং ছবি আর থাকছে না। বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি ইঙ্গিত-ইশারা যখন ব্যর্থ হলো তখন হঠাৎ শূন্যে ভেসে উড়ে এলো চিঠি। অব্যর্থ লক্ষ্য। লঞ্চঘাটমুখী রাস্তা থেকে ছোড়া কাঠের পাটাতনের ব্লকে অবস্থিত ক্লাস সেভেনের বি সেকশনে বসা প্রাপকের মাথায়। তৃতীয় পিরিয়ডে স্কুল পালানোর বার্তা নিয়ে ছোট নুড়ি-পাথর পুরে গোল করে মোচড়ানো চিঠি বাউন্স করে শেষ ঠিকানা খুঁজে পেলো স্যারের পায়ের কাছে। হঠাৎ প্রাপ্তি মোচড়ানো বস্তুটি খুলে স্যার পড়ে শোনালেন ভুল বানানে লেখা সেই ঐতিহাসিক চিঠিটি। প্রাপক তখন বই দিয়ে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়েÑ পিও বনদু, (নাম উল্লেখ করা হলো না) তাড পিরডে ভাগিয়া আসিবায়। আমরা লনচ গাটে আছি। মেটিনিতে যাইব। কুব ভাল ছবি। পাইটিং আছে। ইতিÑ। তারপর থেকে প্রাপক বন্ধুটিকে আমরা সবসময়ই ‘পিও বনদু’ বলে ডাকতাম। অসম্ভব রকমের বন্ধু বৎসল প্রিয়বন্ধুটি আজ আর ইহজগতে নেই (তাঁর বিদেহী আত্মা শান্তি পাক)।
এক সময় পত্রমিতালীর খুব প্রচলন ছিল। দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিদেশী মিতার সন্ধানও মিলতো । খবরের কাগজে থাকতো পত্রমিতালীর পৃথক কলাম। এতে নেশা ছিল অনেকেরই। মিতালীর মাধ্যমে বন্ধুত্ব গভীর হয়ে অনেকে ঘরও বেঁধেছেন। প্রেমের চিঠি লেখার ক্ষেত্রে কেউ কেউ ছিলেন বিশেষজ্ঞ। অনেকে তার কাছ থেকে গোপনে চিঠি লিখিয়ে নিয়ে আসতো। অনেক সময় কয়েকজন মিলে রীতিমতো গবেষণা করে বিভিন্ন বইপত্র ঘেঁটে সুন্দর ভাষা, শব্দ নিয়ে একজনের প্রেমপত্র লিখে দিতো। একজনের ভাষা, একজনের সুন্দর হাতের লেখা, কবি মতন একজনের দ্বারা হতো কবিতার লাইন সংযুক্ত। বিজ্ঞ যে জন সে আবার কোন শব্দ, লাইন কেটেকুটে সম্পাদনা করে দিতো। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হতো পত্র লিখন। প্রেমিক প্রবর তখন চোখ বুজে আবেগ, উদ্বেগে প্রেমভাবে বিভোর। প্রেমপত্রের বইয়ের তখন বেশ কদর। পাওয়া যেতো ফুটপাতে, লাইব্রেরিতেও।
স্কুল ও কলেজ জীবনে ছাত্রদের চিঠিপত্র লেখার প্রচলন ছিল সাধারণত যারা হোস্টেলে থাকতো বা গ্রাম হতে এসে শহরে থেকে পড়াশোনা করতো। চিঠির বিষয়বস্তুগুলি মোটামুটি একই রকম। বাবা বা অভিভাবকের কাছে ইনিয়ে-বিনিয়ে কত ফর্দ দিয়ে যথার্থতা নিশ্চিত করে টাকা চেয়ে এবং লেখাপড়ার অসামান্য অগ্রগতি আর কুশল সংবাদ জানিয়ে চিঠি। অভিভাবকের চিঠি আসতো মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনার উপদেশ এবং ছুটিতে বাড়ি আসার কথা মনে করিয়ে দিয়ে।
আমার ছাত্রজীবন শেষ হয়েছে নিজের বাড়িতে থেকেই। চিঠি লেখার আবশ্যকতা তেমন ছিল না। চাকুরি জীবন শুরু হয় শাল্লা থেকে। ’৮০ সালে। নিজ মহকুমায় হলেও অনেক দূরের, অপরিচিত, হাওরের মাঝখানে এক ভীতিকর জায়গা। জলের মাছ ডাঙায় তোলে আনা রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টারের মতোই আমার বিপরীত অবস্থা। ডাঙার প্রাণী জলে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি। পৃথিবীর সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতায় দ্বীপের মতো ভেসে থাকা না হাট, না বাজার, না গঞ্জ। নামেই থানা সদর। নতুন খোলা ব্যাংক শাখায় প্রথম যোগদান। চাকুরি নিয়ে তেমন আগ্রহ বা উচ্ছ্বাস না থাকলেও ছোট শহর থেকে বড় শহরে যাওয়ার বাসনা হয়তো অবচেতন মনে পোষ মেনে চুপচাপই রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এমন গ্রাম্য অবস্থানে পোস্টিং, মন খারাপের কারণ হয়ে গেল। উড়ো উড়ো মনের যুবক। ঘোরাঘুরি, আড্ডা, বন্ধু-বান্ধব ছেড়ে দ্বীপান্তরিত বন্দি জীবন। মন টিকে না। সেই বিচ্ছিন্নতায় প্রায় প্রতি সপ্তাহে সাত দিনের দূরত্ব অতিক্রম করে বাবার একখানা পোস্টকার্ড কত মমতা নিয়ে আমার কাছে পৌঁছে যেতো। শান্তির একটা প্রলেপ দেহ মনে ছড়িয়ে পড়তো, তা বর্ণনার কোন ভাষা নেই, কেবল অনুভবের। মা-বাবার কাছাকাছি থেকেই বড় হয়েছি। দূরত্ব মমতার স্পর্শটাকে স্পষ্ট করে দেয়। তা’ই ছোঁয়ে যেত চিঠির প্রথম সম্বোধনেÑ ‘বাবারে হারান’, (আমার পারিবারিক নাম)। তখনকার সময়ে বাবা বলতেই একটু দূরে দূরে থাকা কিছুটা এড়িয়ে যাওয়া। এমন ভাবে তো মুখে ডাকা যায় না। চিঠিতেই সম্ভব। ভিতরটা মুচড়ে উঠতো। ‘…ভগ্ন হৃদয় পিতার আশীর্বাদ নিও’। আমার চোখটা ঝাপসা হয়ে উঠতো। ‘…তোমাকে ছাড়া এবার আমাদের পূজা নিরানন্দেই কেটেছে’। চোখের কোণ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তো। ‘…খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধা হলে, শরীর নষ্ট করে চাকুরী করার দরকার নাই’…। চিঠি পড়া বন্ধ করে দিতাম। প্রতিদিনই একবার করে পড়তাম, আরেকটা না আসা পর্যন্ত। আশি বছর বয়সী বাবার হস্তাক্ষর তখনো সুন্দর-স্পষ্ট। একটু কাঁপাকাঁপা রেখা। তা হাতের নয় মনের। বাসায় থাকা বৃদ্ধ মা-বাবা দু’জনের একাকিত্ব ঘুচতো আমার উত্তর পেলে। চিঠিতে এর তাগিদ থাকতো বরাবরই। বন্ধু, স্বজন, প্রিয়জনের চিঠিও আসতো মাঝে মধ্যে। ঢাকা থেকে সরাসরি ডাকে আসতো ব্যাংকের পত্রিকা। প্রতিদিন সন্ধ্যার আগে দিগন্ত রেখায় অস্পষ্ট বিন্দু হাওরের ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে পোস্ট অফিসের ঘাটে এসে ভিড়ত, রানারের ডাক নৌকা। এর অপেক্ষায় থাকতাম।
৬.
ছোট হয়ে এসেছে পৃথিবী। আন্তর্জাল আর আন্তঃডাকের যুগে চিঠিপত্রের প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। প্রাপকের নাম, বাড়ি নম্বর, সড়ক নম্বর, পোস্ট অফিস, গ্রাম আর জেলার ঠিকানায় এখন চিঠি পৌঁছে না। পৌঁছে ডটকমে। পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে অপ্রান্তে মুহূর্তে সে মেইলে ভালোবাসার স্পর্শ পৌঁছে কিনা জানি না। তবে প্রেরকের লাইভ ছবিটা পৌঁছে যায় প্রাপকের চোখের সামনে। বড় পৃথিবীর মতো এখন আর কাগজ-কলম নিয়ে দরকারি-অদরকারি কথার বহরে দু’তিন পৃষ্ঠার চিঠি লেখে না কেউ। প্রিয় মানুষের হাতের ছোঁয়া আন্তরিকতা আর প্রাণময়তার প্রকাশ চিঠি ছাড়া কি এই যান্ত্রিকতায় সম্ভব।
বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ। সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে অনুভূতির প্রকাশ। প্রিয় মানুষের বিরহ যাতনায় হৃদয় তোলপাড় হলেও মিস্ য়্যু, লাব্বু কয়েকটি ছোট শব্দের মধ্যেই ভাবের প্রকাশ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট, ই-মেইল, ম্যাসেঞ্জার প্রয়োজন মেটায় ঠিক কিন্তু বিরহী হয় না। আবেগে আপ্লুত হয় না। একাকিত্ব নিঃসঙ্গতার প্রকৃত প্রকাশ ঘটে না। চিঠি লেখার মুহূর্তে একান্ত আবেগ, আবেগর যে তাড়না তাতেই সৃষ্টি হতো ভাবময় নিখাদ গদ্য। পৌঁছে যেতো সাহিত্যের মাত্রায়। তার অবসান ঘটেছে। ছড়াকার, জিন্না চৌধুরীর ছড়ায়Ñ ‘প্রেম আগের চেয়ে অনেকটা সোজা/চিঠিতে মিতালী নয় ই-মেইলে খোঁজা/মোবাইলে কাঁদা যায় মোবাইলে হাসে/ম্যাসেজ দ্রুত যায়, চিঠি ফিরে আসে/কি-বোর্ডে সুইচ টিপে মন ভরে যায়/ সকালের ভালোবাসা বিকালে পালায়’।
[সুখেন্দু সেন : সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা, লেখক ও গ্রন্থকার]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী