শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ১০:১৪ অপরাহ্ন

Notice :

উন্নয়ন প্রকল্পকে উৎপাতে পর্যবশিত করবেন না

গতকালের দৈনিক সুনামকণ্ঠ থেকে একটি ঘটনার ঘনঘটা উদ্ধৃত করে সম্পাদকীয় শুরু করছি। সম্পাদকীয়র স্বাভাবিক আঁটসাট পরিসরে উদ্ধৃতিটি একটু লম্বা হয়ে যাচ্ছে, তা হোক। যা নিয়ে বলতে চাই সে প্রসঙ্গটির সন্নিবেশন আপাতত জরুরি। ‘অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণে উপকারভোগীদের প্রাথমিক তালিকায় বাহারা ইউনিয়নে ১৭টি ঘর বরাদ্দ হয়েছে। ইউনিয়নের ভাটগাঁও গ্রামের মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী মমিনা বেগমের নাম প্রাথমিকভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু তার ভাইপো হুমায়ুন মিয়া ২ লাখ ৫৮ হাজার টাকা মূল্যমানের এই ঘর নির্মাণের জন্য তার ফুফু মমিনার নামের ঘর নিজের বাড়িতে তৈরির চেষ্টা করেন। এই খবর লোক মারফত জানতে পেরে মমিনা প্রতিবাদ করলে উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আজিজুল ইসলামকে ম্যানেজ করে হুমায়ুনের চাচী হোসনা বেগমের নামে নতুন করে তালিকা ভুক্ত করান। এখন হুমায়ুনের ভিটায় সেই ঘর তৈরির চেষ্টা চলছে। এদিকে ওই ভুক্তভোগী নারী গত ৩ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে লিখিত অভিযোগ করলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হুমায়ুনকে নিয়ে দ্রুত হুমায়ুনের চাচীর নামে হুমায়ুনের দেওয়া দানকৃত জায়গার রেজিস্ট্রি তৎপরতা শুরু করেছেন। কয়েক দিনের মধ্যেই হোসনার নামে জায়গা রেজিস্ট্রি হবে বলে জানা গেছে।’ এমন প্রতারণা হরদম চলছে সারা দেশে, সেটা সর্বজনবিদিত, বুঝিয়ে বলার কোনও দরকার আছে বলে মনে হয় না। ব্যক্তিমালিকানা স্বীকৃত আছে এবং পুঁজিতান্ত্রিকতার দৌরাত্ম্য চলছে এমন যে-কোনও দেশে এমন হতেই পারে। কিন্তু পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রণেও স্বভাবতই একটি তথাকথিত আপেক্ষিক আইনি নৈতিকতা গড়ে উঠে এবং প্রশাসন সেটা প্রয়োগ করে থাকে এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশে সেটা যথার্থভাবেই কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়। সেখানে দুর্নীতি হয় না এমন নয়, হয়। তারপরও অন্তত সিংহভাগ ক্ষেত্রে তারা দুর্নীতিমুক্ত থাকে, দুর্নীতিতে আমাদের মতো তারা আপাদমস্তক নিমজ্জিত নয়। সেখানে দুর্নীতি না হওয়ার একটি কারণ বোধ করি তারা তাদের প্রশাসনটিকে শতভাগ না হলেও বেশিরভাগ দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছে। কোনও দেশে দুর্নীতি হওয়া না হওয়ার বিষয়টি বোধ করি সে-দেশের প্রশাসনের সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্কের মাত্রার উপর নির্ভরশীল। যেখানে পারতপক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক ব্যক্তিকে প্রতারিত করার ষড়যন্ত্রে অন্য ব্যক্তিকে মদদ দেয়া হয় না সেখানে দুর্নীতি সংঘটনের হার হ্রাস পাবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অতীতের যে-কোনও সময়ের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশে ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপকতা এতো বেশি বেড়েছে যে, প্রকারান্তরে প্রশাসন ব্যক্তি বিশেষের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে একাত্ম হয়ে পড়ছে। এই সামাজিক-প্রশাসনিক বাস্তবতারই প্রকাশ মেলে শাল্লার উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার আচরণে।
এদিকে দেশান্তপ্রাণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলেছে ২০৪০ সালের উন্নত অর্থনীতির দেশে পরিণত হওয়ার অভিমুখে। কিন্তু শাল্লায় কিংবা শাল্লার মতো দেশের অন্যান্য জেলা-উপজেলার প্রশাসনের ভেতর দুর্নীতিকে সঙ্গী করে কিংবা জিইয়ে রেখে কতোক্ষণ সার্থকতা অর্জনের পথে চলতে পারবে দেশের উন্নয়নের এই অভিযাত্রা। মমিনার মতো গরিব মানুষেরা যদি ধনী ও প্রশাসনের যৌথ ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে গরিবই থেকে যায়, ‘জমি আছে ঘর নাই’ প্রকল্পের আওতায় সামান্য একটি ঘর পায় না, তবে দেশের উন্নয়নটা হবে কোথায়? দুর্নীতিকে নির্মূল করতে না পারলে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কার্যত প্রতারণায় পর্যবশিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাবে। এমতাবস্থায় যদি প্রশাসনে এইরূপ ষড়যন্ত্রমূলক বেআইনি কাজের সঙ্গে প্রশাসনের ব্যক্তি জড়িত থেকে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করার কাজে লিপ্ত থাকেন প্রতিনিয়ত এবং এই করে প্রকারান্তরে ২০৪০ সালের প্রতিশ্রুত উন্নয়নের বিরোধিতা করেন, যা এমকি অনেকটাই অন্তর্ঘাতমূলক বলে বিবেচিত হচ্ছে, তাহলে সরকারের প্রতিশ্রুত উন্নয়ন ব্যর্থতায় পর্যবশিত হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। এই বিশেষ ঘটনাটিই কেবল নয়, এমন আরও অনেক ঘটনা অবগত হয়ে বাস্তব অবস্থাদর্শনে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, সাধারণ মানুষের জন্য উন্নয়ন প্রকল্পকে একটি মূর্তিমান উৎপাতে পর্যবশিত করা হয়েছে। এমন হোক দেশের মানুষ অবশ্যই তা চান না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী