বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ১০:১৭ অপরাহ্ন

Notice :

শ্রদ্ধেয়া দিপালী দিদিকে নিয়ে স্মৃতিচারণ : অধ্যাপক পরিমল কান্তি দে

শ্রদ্ধেয়া দিপালী চক্রবর্তী’র কর্ম ও জীবন চির অম্লান। আমরা প্রতিনিয়ত তাঁর কর্ম ও জীবন শ্রদ্ধা সহকারে আলোচনা করি। তিনি স্মরণীয় ও বরণীয়। আমার বড় বোন প্রয়াত আরতি দে শ্রদ্ধেয়া দিদি’র অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও স্নেহধন্য ছিলেন। এই জন্য দিদি’র পরিবারের সাথে আমাদের সম্পর্কও ছিল ঘনিষ্ঠ ও অত্যন্ত আন্তরিকতাপূর্ণ। আমাদের পারিবারিক নানাবিধ সমস্যা-সমাধানে তাঁর পরামর্শ, সাহায্য-সহযোগিতা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি।
শ্রদ্ধেয়া দিপালী দি’র পরিবার ছিল সংস্কৃতিমনা। প্রতিদিন পরিবারের প্রায় সবাই সংগীতচর্চায় অংশগ্রহণ করতেন। তখনকার সময়ে অর্থাৎ ষাটের দশকে সংস্কৃতিচর্চা প্রায় নিষিদ্ধই ছিল। কিন্তু এই অবস্থায়ও তাদের বাসায় নিয়মিত সংগীত সাধনা অব্যাহত থাকতো। দিদি’র বড় মেয়ে রত্না চক্রবর্তী সুনামগঞ্জের অন্যতম নামকরা শিল্পী হিসেবে সর্বমহলে প্রশংসিত। বেতারের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করতো। দিদি’র দ্বিতীয় ছেলে ড. মৃদুল চক্রবর্তী বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী এবং লোকসংস্কৃতির গবেষক। তাঁর উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত ও নাট্যকলা বিভাগ খোলা হয়। তিনি এই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। আমাদের এই কৃতী সন্তানকে নিয়ে সুনামগঞ্জবাসী গর্বিত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি অকালে পরলোক গমন করেন।
শ্রদ্ধেয়া দিপালী দিদি সমাজের অবহেলিত ও অসহায় মানুষের কথা সবসময় চিন্তা-ভাবনা করতেন এবং কিভাবে এদের উন্নতি করা যায় তার উপায় নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই উদ্দেশ্যে মহিলা সমিতির সহযোগিতায় নিজ বাড়িতেই সেলাই শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এতে বহুসংখ্যক অসচ্ছল মেয়েরা সেলাই শিক্ষার সুযোগ পায় এবং নিজেরা স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। এই সেলাই শিক্ষাকেন্দ্রটি এখনো চালু আছে।
ষাটের দশকে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামেও দিদি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রথমে ছাত্র ইউনিয়ন, পরবর্তীতে ন্যাপ-এর একজন সক্রিয় কর্মী-নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সকল পর্যায়ে নিজে অংশগ্রহণ করেন। এই সময় দিদি’র বাড়িটি ছিল প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মীদের আশ্রয়স্থল। এ বাড়িতে অনেক কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের আগমন ঘটে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মহিলাদের বঞ্চনা, নির্যাতন ইত্যাদি থেকে উত্তরণের নিমিত্তে এবং নারী ও পুরুষের সমঅধিকার আদায়ের লক্ষ্যে স্থানীয় প্রগতিশীল মহিলাদের নিয়ে সুনামগঞ্জ জেলা মহিলা পরিষদ গঠন করেন। মহিলা পরিষদের সকল কার্যক্রমকে গতিশীল করার জন্য নিজেকে সর্বদাই নিয়োজিত রাখতেন। সভানেত্রী হিসেবেও গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সঠিক দিকনির্দেশনায় মহিলা পরিষদ মহিলাদের অবস্থানের উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ’৭৫ পরবর্তী সময়ে দিপালী দিদি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।
তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন এবং সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন। শ্রীরামকৃষ্ণের “যত মত, তত পথ” মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের সকল সেবাকাজে নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং নিজে মহিলাদেরকে সংগঠিত করে আশ্রমে সারদা সঙ্ঘ গঠন করেন। তিনি আমৃত্যু এই সংগঠনের সভানেত্রী ছিলেন। তাঁর কর্মতৎপরতায় সারদা সঙ্ঘের মাধ্যমে আশ্রমে একটি সেলাই শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং বয়স্কদের শিক্ষাদানেরও ব্যবস্থা করেন। আশ্রমের সকল কাজে তাঁর অংশগ্রহণ সার্বিকভাবে আশ্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।
শ্রদ্ধেয়া দিদি কর্মযোগী। সকল ব্যাপারে তিনি নিজ থেকে সমাজের উন্নয়নের জন্য কাজ করতেন। আমরা অত্যন্ত শ্রদ্ধা সহকারে দিদিকে স্মরণ করি। তিনি স্মরণীয় হয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন এবং তাঁর আদর্শ আমাদের ও পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে – এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
[অধ্যাপক পরিমল কান্তি দে, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী