বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২০, ১০:৩৭ অপরাহ্ন

Notice :

আলফাত উদ্দিন মোক্তার সাব : হাওরবন্ধু থেকে জননেতা

তানভীর রেজা খান
প্রচলিত প্রভাব-প্রতিপত্তির রাজনীতির রেষারেষিতে আলোচনার টেবিলে যাঁদের ইতিহাস আমরা ভুলে যাচ্ছি, যাঁদের ত্যাগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমাদের ঝুলিতে থাকা সত্বেও ক্ষমতার রাজনীতির মারপ্যাঁচে সুকৌশলে তাঁদের আড়াল করার অপচেষ্টা চলছে তাঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন হাওরপাড়ের জননেতা আলফাত উদ্দিন আহমদ। লোকে যাঁকে ‘মোক্তার সাব’ হিসেবে চিনে।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাঁক ইউনিয়নের মুক্তাখাই গ্রামে ১৯৩১ সালের ২১ জুন জন্মগ্রহণ করেন ভাটি-বাংলার বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি আলফাত উদ্দিন আহমদ। হাজী আব্দুস সামাদ ও জমিলা খাতুন তখনও জানতেন না তাদের ছোট্ট ছেলেই একসময় ভাটির নিপীড়িত জনতার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হবেন। ১৯৪০ সালে গোবিন্দপুর এম.ই মাদ্রাসায় শিক্ষা জীবন শুরুর পর বুলচান্দ উচ্চবিদ্যালয়ে, সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়ে এবং সুনামগঞ্জ কলেজে অধ্যয়ন করেন তিনি। ১৯৪৮ সালে মেট্রিক, ১৯৫০ সালে আইএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন ক্ষণজন্মা এ মানুষটি।
রাজনৈতিক জীবনের সূচনালগ্নে ১৯৪৬-১৯৪৮ সালে মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারে দেশ যখন সোচ্চার তখন নিজের দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যের জায়গা থেকে সারাদেশের মতোই সুনামগঞ্জে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন আলফাত উদ্দিন আহমদ।
ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী আলফাত উদ্দিন আহমদ ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল ‘গণতন্ত্রী দল’-এ যোগদান করেন। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে সে বছরই দলের সুনামগঞ্জ মহকুমার আহ্বায়ক নির্বাচিত হন।
পাকিস্তানি শাসকদের বুর্জোয়া নীতির বিরুদ্ধে তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন হাওরের এই জননেতা। ১৯৫৭ সালে খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেবার মাধ্যমে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তিনি জোরালো ভূমিকা পালন করেন।
১৯৫৮ সালে তৎকালীন সংবিধানের ৯২-ক ধারা অনুযায়ী পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার মন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ প্রায় ১৬শ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে আইয়ুব বাহিনী। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তৎপর থাকায় কারাবন্দী হন জননেতা আলফাত উদ্দিন আহমদ। পরিবার-পরিজনহীন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠেই চলতে থাকে তাঁর জীবন।
তৎকালে শিক্ষা, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাষ্ট্রীয় অধিকার, গণতান্ত্রিক ও সামাজিক অধিকারসহ সকল ক্ষেত্রেই একে একে বঞ্চিত হতে থাকে পূর্ব পাকিস্তান। অত্যাচার-নিপীড়নের মাত্রা তুঙ্গে ওঠায় শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জণগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের মাধ্যমে। জননেতা আলফাত উদ্দিন আহমদ সুনামগঞ্জের আপামর জনতাকে সাথে নিয়ে এই গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেবার ‘অপরাধে’ দ্বিতীয়বারের মতো কারাবরণ করতে হয় তাঁকে। ১৯৭০-এর নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী দেওয়ান ওবায়দুর রাজা চৌধুরীকে সমর্থন দেন এবং তার পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর সারাদেশের ন্যায় সুনামগঞ্জেও স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হলে আলফাত উদ্দিন আহমদ সদস্য সচিব নির্বাচিত হন।
২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের পর সংগ্রাম কমিটির অনেকে শহর ছেড়ে নিরাপত্তার কারণে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিলেও সুনামগঞ্জে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন হোসেন বখত এবং আলফাত উদ্দিন আহমদ। পাকসেনাদের অত্যাচারে ভারত সীমান্তে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকা হাজার হাজার শরণার্থীদের তিনি লঙ্গরখানা খুলে স্বাধীনতার পক্ষের স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় একবেলা খাবারের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ে পাঠানো, শরণার্থীদের মধ্যে রিলিফ বিতরণ, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ সৎকার এবং সর্বশেষ স্বাধীন সুনামগঞ্জের শরণার্থীদের ঘরে ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে পালিত দায়িত্বের অবসান ঘটে তাঁর।
যুদ্ধের পর হাওরপাড়ের মানুষের অন্ন রক্ষায় মোক্তার সাব ছুটে গিয়েছেন হাওরবাসীর দ্বারে দ্বারে। ১৯৭৩ সালে পা-ারখাল বাঁধ নির্মাণে মোক্তার সাবের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেশাগত দায়িত্ব ছেড়ে তিন মাস পা-ারখালের পাশে অবস্থান করে সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে হাওরবাসীর মনে জায়গা করে নেন তিনি।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর ঘাতকগোষ্ঠী যখন মার্শাল-ল জারি করে প্রতিবাদী কণ্ঠগুলোকে থমকে দিতে চায় তখন প্রতিবাদ করেন জননেতা আলফাত উদ্দিন আহমদ। এ জন্য তাঁকে তৃতীয় বারের মতো কারাবরণ করতে হয়।
মামলা-হামলা, জেল-জুলুমের পরও থেমে থাকেননি মোক্তার সাব। জনগণের জন্য রাজনীতি করে আসা আলফাত উদ্দিন আহমদ শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শীতার পরিচয়ে ১৯৮৫ সালে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ পদে আসীন থাকেন।
স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার যখন সমানে রাজস্ব আদায়ের নাম করে দেশের সব হাওর-জলাভূমি ইজারা দিতে থাকে তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকা অবস্থায়ই ‘ভাসান পানি আন্দোলনে’ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এই হাওরবন্ধু। নিপীড়িত-খেটে খাওয়া জেলেদের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে স্বৈরশাসকের রোষানলে পড়ে চতুর্থ বারের মতো কারাবাস ‘উপহার’ পান জননেতা আলফাত উদ্দিন আহমদ।
তিনি গরিব দিনমজুর রিকসাচালকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবিকা নির্বাহ করে, যাদেরকে আমরা প্রতিনিয়তই অবজ্ঞা করি, সমাজের নিচুস্তরের মানুষ হিসেবে কল্পনা করতেই বেশি অভ্যস্ত তাদেরকেই তিনি বুকে টেনে নিয়েছিলেন। সুনামগঞ্জের দিনমজুর রিকসাচালকদের নিয়ে তিনি রিকসা শ্রমিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকা-সহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেয়া এই মহাপুরুষ ১৯৯৫ সালের ২৩ মে মাত্র ৬৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
একজন রাজনীতি সচেতন মানুষ হিসেবে প্রশ্ন জাগে, মোক্তার সাবের মতো ‘সেলফিহীন রাজনৈতিক যুগের’ ঘাম ঝরানো আলেকজান্ডারদের সঠিক মূল্যায়ন কি আমাদের যুগের প্রজন্ম করছে?
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী লাল-সবুজ বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেও কৌতূহল জাগে, স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, পরিবার-পরিজনের মায়া ত্যাগ করে শুধুমাত্র স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখা মানুষটির ত্যাগের ইতিহাস কি আমরা পৌঁছে দিতে পারবো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে? নিপীড়িত জনতার অধিকার আদায়ের জন্য বারবার কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিনাতিপাত করা মোক্তার সাবের স্বপ্নের বাস্তবায়ন কি বর্তমান প্রজন্ম করবে?
এই চাটুকারিতাময় রাজনৈতিক যুগে হয়তো আলফাত উদ্দিন আহমদকে নিয়ে হাজার হাজার মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভর্তি করবে না! হয়তো সারি সারি লাইন ধরে তাঁর কবরে ফুলের ডালি সাজাবে না! কিন্তু, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর আমরা কি আমাদের মূল ইতিহাস এড়িয়ে যাচ্ছি? সেলফি এবং তোষামোদীর রাজনীতির ভিড়ে আমরা কি এককালের রাজপথের প্রমিথিউসদের ভুলতে বসেছি? যদি আমরা এ পথেই হাঁটি তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ খুব বেশি সুখকর নয়। কারণ নিজের ইতিহাস ভুলে হয়তো সাময়িক রাজনৈতিক বলয় সৃষ্টি করা যায় কিন্তু একজন আদর্শিক কর্মী তৈরি করা যায় না। আলফাত উদ্দিন আহমদের মতো মানুষদের করে যাওয়া রাজনীতি বর্তমান যুগের অনেক রাজনীতিবিদদের শতবর্ষ রাজনীতির চেয়েও ক্ষুদ্র। কারণ, তাদের ত্যাগ দেশের জন্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাদের ত্যাগ-স্বার্থহীন নিপীড়িত মানুষের অধিকারের জন্য। তাদের ত্যাগ মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্য প্রতিষ্ঠার। এরকম পরোপকারী, সম্মোহনী শক্তির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে এযুগের রাজনীতিবিদদের অনেক কিছু শেখার আছে।
পরিশেষে আলফাত উদ্দিন আহমদকে নিয়ে সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের একটি বক্তব্য দিয়ে শেষ করতে চাই। তিনি বলেন, “আমি প্রতিকূল উজান বেয়ে বড় হয়েছি, রাজনৈতিকভাবে এতোবড় হওয়ার পিছনে আলফাত উদ্দিন মোক্তার সাবের অবদান রয়েছে। আমরা তাঁর স্নেধন্য ছিলাম। শাসকগোষ্ঠী মজুতদার-সুদখোর-ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। প্রতিটি আন্দোলনে-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।”
[লেখক : তানভীর রেজা খাঁন, সমাজকর্মী, বিতার্কিক]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী