মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ০৯:২৪ অপরাহ্ন

Notice :

বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. আব্দুল মজিদ মাস্টার একজন প্রাণবন্ত মানুষ : সৈয়দ মহিবুল ইসলাম

সাবেক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ মাস্টার গত ২০ এপ্রিল শনিবার সকাল ৮টা ৪২ মিনিটে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর অকাল মৃত্যুতে সুনামগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হবার নয়। শিক্ষক, আইনজীবী, আইন প্রণেতা, রাজনীতিবিদ ও সমাজকর্মী হিসেবে এক বহুমাত্রিক বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন আব্দুল মজিদ। কিংবদন্তীর মত নানা ঘটনার স্মৃতিতে জাগরুক ছাতক, দোয়ারাবাজার ও সুনামগঞ্জ এলাকার বিস্তীর্ণ জনপদ। এ অঞ্চলের মাটি ও মানুষের অন্যতম প্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি ছিলেন সাধারণের মধ্যে অসাধারণ।
তাঁর প্রসঙ্গে অনেক স্মৃতি, অনেক কথা মনে পড়ছে। অনেকেই তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণমূলক লেখায় বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। আমার সাথে প্রথম পরিচয়ের সঠিক দিনক্ষণ আজ মনে নেই। সম্ভবত ১৯৭৫ সালের কোন এক সন্ধ্যায় গোধূলি লগনের আলো-আঁধারির খেলায় আমাদের বৈঠকখানায় তাঁকে দেখেছিলাম। চাচাত ভাই অ্যাডভোকেট সৈয়দ শামসুল ইসলাম পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেনÑ ইনি আমাদের মজিদ ভাই। টগবগে তারুণ্যে ভরা সুদর্শন মানুষটিকে একজন প্রাণবন্ত বিপ্লবী নেতার মতই লাগছিল। পরে জানতে পারলাম তিনি গোপন বিপ্লবী সংগঠনের নেতা। তাঁর প্রত্যয়দীপ্ত অবয়ব আমাকে চেগুয়েভারার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল।
স্কুল জীবনেই বিদ্রোহীর খাতায় নাম লিখিয়ে ঘর ছাড়া হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে আব্দুল মান্নান ভূইয়ার মতো রাজনৈতিক নেতার সাহচর্য পেয়েছিলেন। আমার সাথে অনেক দিন গল্পচ্ছলে বলেছেনÑ একসাথে ঘুমিয়েছি আমরা। মাটি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ থেকেই ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে একই পরিবারের আপন ৪ ভাই অংশগ্রহণ করেন। তাঁর যুদ্ধদিনের কিছু কিছু স্মৃতি মাঝে মাঝে আলাপচারিতায় আসত।
গোপন বিপ্লবী সংগঠনের দায়িত্ব নিয়ে নরসিংদীর মনোহরদী থেকে অবহেলিত এক জনপদ দোয়ারাবাজারে থিতু হন। জীবনে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝা অতিক্রম করে অবশেষে শিক্ষকতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন ‘দোয়ারাবাজার মডেল উচ্চ বিদ্যালয়’। এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে বেশ কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেন। ইতোমধ্যে আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইনজীবী হিসেবে সুনামগঞ্জ বারে তালিকাভুক্ত হন। আইন পেশায় সম্পৃক্ত হওয়ায় মানুষের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় অনেক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পরাজিত হন। অবশেষে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের সুনামগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মহান জাতীয় সংসদে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের মানুষের কথা তুলে ধরেন। অবহেলিত দোয়ারাবাজারের উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। দোয়ারাবাজারবাসী নানা আলোচনায় আজও তাঁকে স্মরণ করেন।
রাজনীতির বাইরে আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ। অনেক নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন কিন্তু পরাজয়কে আমলে না নিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠেছেন। ‘পরাজয়ে ডরে না বীর’Ñ এ প্রবাদের সার্থক প্রয়োগ দেখেছি তাঁর জীবনে। পারিবারিক পরিম-লে ছিলেন একজন ¯েœহবৎসল পিতা ও কর্তব্যপরায়ণ অভিভাবক। আমরা বেশ ক’জন ভায়রা ভাইয়ের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। তাই সকলে মিলে তাঁকে ভায়রা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত করেছিলাম। হাসি-ঠাট্টায়, গল্পে সারারাত পার করে দিতে পারতেন। একবার নির্বাচনে পরাজিত হবার পর বিডি হলে নাটকে নিষ্ঠার সাথে অভিনয় করতে দেখলাম। সংগীতে, উৎসবে তাঁর ছিল অফুরন্ত উৎসাহ। সবসময় জীবনের জয়গান গেয়েছেন। এরকম একজন মানুষ সত্যিই ছিলেন অফুরন্ত প্রেরণার উৎস।
চিরপ্রস্থানের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত দোয়ারাবাজারের মাটিতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের পাশে মুরাদপুর কবরস্থানে শায়িত হয়েছেন। পরম করুণাময় তাঁকে অসীম শান্তি দান করুন।
[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী