রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন

Notice :

সুনামগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগ অন্তর্ভুক্ত করা হোক : এনাম আহমেদ

সুনামগঞ্জে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হতে যাচ্ছে। এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে অত্যন্ত কষ্ট করে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য এর চেয়ে ভালো খবর আর কিছু হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়টি যেহেতু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নির্ভর, এ জন্য আমাদের আশাবাদ আরো বেশি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নিয়মমাফিক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষা দেয়ার জন্য নয় অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কেবল চার দেয়ালের মধ্যে থেকে নিরস স্টিলের বেঞ্চিতে বসে পুঁথিগত বিদ্যা নয়, আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে বহুমাত্রিক আয়োজন। বিশ্বচিন্তা, বিশ্বদর্শন, গবেষণার ব্যাপক চর্চা হয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করলে সুনামগঞ্জ নবযুগে পদার্পণ করবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এই জেলাটি বড় দুখি। এ জেলার কৃষকগণ জেলাকে দেশের অন্যতম খাদ্যভা-ারে পরিণত করলেও তাঁরা নিজেরা খাদ্য পান না। এ জেলার মৎস্যজীবীরা বিস্তীর্ণ হাওর-বিলে মাছ ধরতে পারেন না ইজারাদারদের দৌরাত্ম্যে। উপযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় এ জেলার শিক্ষার্থীরা বাইরে পড়াশোনা করে এসে নিজ জেলায় তাদের উপযুক্ত কাজ পায় না। এ জন্য তারা আর ফিরে আসতে চায় না। এক পর্যায়ে তাদের পরিবার-পরিজনকেও নিয়ে যায়। এভাবে সুনামগঞ্জ ধীরে ধীরে মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে। এ জেলাকে নিয়ে কেউ ভাবে না। ভাবার প্রয়োজনও অনেকে মনে করেন না।
এসব কিছুর পরিবর্তন ঘটাতে পারে আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। এটিকে যদি আমরা সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারি তবে সুনামগঞ্জের দুয়ার খুলে যাবে বিশ্ব দরবারে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের অবারিত সম্ভাবনার ক্ষেত্র হাওর নিয়ে বিভিন্ন বিভাগ খোলা হবে। পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো নতুন প্রজাতির ধান উদ্ভাবনের চেষ্টা করা হবে এবং এতে সুফল পাওয়া যাবে। হাওরের মৎস্য সম্পদ নিয়ে গবেষণা করা হবে ‘মৎস্য বিভাগে’। আমরা জানি মিঠাপানির অনেক মাছ এখন বিলুপ্ত হওয়ার পথে। সেগুলো কিভাবে ধরে রাখা যায় সেই চেষ্টাও হবে।
বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম মিঠাপানির আধার। আর সুনামগঞ্জ হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির ক্ষেত্র। এই পানিকে কিভাবে সদ্ব্যবহার করা যায় সেই চেষ্টা করা যেতে পারে। আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে বাংলাদেশে বিক্রিত খাবার পানির শতকরা ৯৭ ভাগ পানি বিদেশি কোম্পানির। আমাদের হাওরের বিশাল জলরাশিকে একেবারে কম খরচে খাবার পানি হিসেবে প্রস্তুত করে বিদেশে রপ্তানি করা যেতে পারে। দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পানি বিজ্ঞান বিভাগ’ চালু আছে কিনা আমার জানা নেই। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পানি বিজ্ঞান বিভাগ’ খোলা যেতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত সুনামগঞ্জের হাওরের এই বিশাল জলরাশিকে বর্তমান যুগে হেলায় হারানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত।
সুনামগঞ্জে স্থাপিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংগীত বিভাগ’ অবশ্যই খুলতে হবে। কারণ সংগীত আবহমান কাল থেকে অঞ্চলের মাটি, পানি ও মানুষের সাথে মিশে আছে। এ অঞ্চলের মানুষ ছয় মাস কাজ করে ও ছয় মাস কোনো কাজ না থাকায় গান গায়, সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এই হাওরাঞ্চলে যে পরিমাণ লোকশিল্পী, গণসংগীত শিল্পী, বাউলশিল্পী, গীতিকার, সুরকার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে রয়েছেন তা সারাদেশেও খোঁজে পাওয়া যাবে না। এখানে অনেক লোকসংগীত রয়েছে যেগুলো কাগজে-কলমে এখনো লিখা হয়নি। কিন্তু এখনো লোকের মুখে মুখে আছে। সেগুলো খোঁজে বের করে সংরক্ষণের সময় এখনো আছে। আমরা লোকগানে এতো সমৃদ্ধ যে, হাসনরাজা, রাধারমণ, দুর্বিণ শাহ, শাহ আব্দুল করিমের নামে চারটি আলাদা বিভাগ খোলা যায়। সঙ্গে সংযুক্ত করা যায় আমাদের হাওর অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিগত শত শত বছরের আপাত হারিয়ে যাওয়া হাজারো লোককবি, গীতিকার, সুরকার, বাউল শিল্পীদের। সুনামগঞ্জের সংগীতের ভা-ার আমাদের হাওরের চেয়েও বিশাল। কিন্তু সঠিক পরিচর্যার অভাবে তা ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। মৎস্য, পাথর, ধান একবার হারিয়ে গেলেও আবারও তাতে সমৃদ্ধ করার সুযোগ থাকে। কিন্তু আমাদের অলিখিত গীতিকবিতাগুলো হারিয়ে গেলে সেগুলো আর খোঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।
আমাদের সুনামগঞ্জ অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে গোলাভরা ধান ছিল, পুকুর ভরা মাছ ছিল। এখানে কোনো চোর ছিল না, সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। বারো মাসে ছিল তেরো পার্বণ। ধানে, প্রাণে, গানে মুখরিত এ অঞ্চলের গানগুলো নিয়ে কাজ করলেই এর সত্যতা পাওয়া যাবে। আর এ কাজ করার জন্য, গবেষণা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া ভাল কিছু হতে পারে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংগীতের কোনো বিরোধ নেই বরং সম্পর্ক রয়েছে। সাহিত্য-সংস্কৃতি যদি সত্যই মানুষের জীবন ও পরিবেশের এক শৈল্পিক প্রতিচ্ছবি হয় এবং বিজ্ঞান যদি হয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তবে বিজ্ঞান ও সংগীতের মধ্যে অবশ্যই একটা যোগসূত্র থাকা দরকার। সংস্কৃতি হচ্ছে জীবন প্রণালী যা মানুষ হতে শেখায়। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ হতে শেখায়। সুনামগঞ্জ হচ্ছে দেশের সম্ভাব্য সাংস্কৃতিক রাজধানী। সেটি জোর গলায় বলা যাবে যদি আমাদের গানগুলো নিয়ে আমাদেরই হাওরে প্রতিষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগ থাকে। বিশেষজ্ঞ সংগীত শিক্ষকও আমাদের রয়েছেন। সম্প্রতি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে এসেছেন সুনামগঞ্জের সংগীত ওস্তাদ দেবদাস চৌধুরী রঞ্জন। এছাড়াও জেলায় রয়েছেন অনেক গুণী ওস্তাদ। রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীত বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে ডিগ্রি নেয়া আমাদের ছেলে-মেয়েরা। এসব মেধাবী তারুণ্যকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। এ বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন বাদ্যযন্ত্র উদ্ভাবন করতে পারেন। পৃথিবীর নামকরা সব প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত বিভাগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি থাকার অজুহাতে ‘সংগীত বিভাগ’টি যেন বাদ না দেয়া হয় এটি আমাদের প্রত্যাশা।
[লেখক : অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, সম্পাদক জেলা সিপিবি]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী