বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২০, ০৮:৫৪ অপরাহ্ন

Notice :

আইএসে যোগ দেওয়া তরুণী শামীমার বাবার দাবি : নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়ে বৃটেন তার বিচার করুক

শামস শামীম, দাওরাই, জগন্নাথপুর থেকে ফিরে ::
প্রায় চার বছর আগে বৃটেন থেকে সিরিয়ায় পালিয়ে গিয়ে আইএস (ইসলামিক স্টেইট) জঙ্গি সংগঠনে যোগদান, জঙ্গিকে বিয়ে, পরবর্তীতে সন্তান জন্মদানসহ বৃটেনের নাগরিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আলোচিত তরুণী শামীমা বেগমের জন্য লজ্জিত তার পিতার জন্মস্থান জগন্নাথপুর উপজেলাবাসী। ১৯৯৯ সনে বৃটেনে জন্ম নেওয়া এই তরুণী জন্মের পর কখনো বাংলাদেশে আসেননি। বাংলাদেশ নিয়ে তার কোন টানও ছিলনা। সেখানকার নাগরিক হিসেবেই শামীমা স্কুলে ভর্তি হয়ে সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। তার পিতা প্রবাসী আহমদ আলী সন্তানের এমন ঘৃণিত কর্মের জন্য লজ্জিত ও বিব্রত। মেয়ের পরিচয় প্রকাশের পর এখন বাড়ি থেকেও বের হননা তিনি। বৃটেন শামীমার নাগরিকত্ব বাতিল না করে ওই দেশে ফিরিয়ে এনে তাকে প্রচলিত আইনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাক Ñ এটাই চান বিব্রত পিতা আহমদ আলী।
সরেজমিন শামীমা বেগমের বাবার বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার আশারকান্দি ইউনিয়নের উত্তর দাওরাই গ্রামে গিয়ে তার পিতা, স্বজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এসব কথা জানা গেছে। পাশাপাশি পিতা আহমদ আলী তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে কিভাবে এই পথে পা বাড়ালো তা তদন্তসহ কিভাবে অন্যজনের পাসপোর্টে বৃটিশ ইমিগ্রেশনকে ফাঁকি দিয়ে পালালো এবং একই স্কুলের এক মাসের ব্যবধানে কিভাবে চার মেয়ে পালিয়ে জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিল তাও জোর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। শামীমার বয়স বিবেচনায় তাকে বৃটেনে ফিরিয়ে এনে তার বিচারের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
দাওরাই বাজার থেকে খাড়া পূর্ব-উত্তরে আহমদ আলীর বাড়িটি। বাড়িটিতে আভিজাত্যের ছাপ লক্ষণীয়। পাকা সড়ক থেকে বাড়ি পর্যন্ত বৃক্ষশোভিত সাদারঙের আকর্ষণীয় দীর্ঘ তোরণ বাড়ির নান্দনিকতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৯০ সনে তিনি গ্রামের আসমা আক্তারকে বিয়ে করেন। শামীমাসহ চার কন্যা সন্তানের মা আসমা বেগম। শামীমাদের চার বোনের মধ্যে দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। এক বোন পড়ালেখা করে। ১৯৯৫ সনে তার বাবা বাংলাদেশে নিজ গ্রামে আরেকটি বিয়ে করেন। এসময় ‘শাহী ভিলা’ নামের বাড়িটি নির্মাণ করেন। তখন থেকেই মূলত তার দেশে ঘনঘন আসা শুরু হয়। দ্বিতীয় স্ত্রীর কোন সন্তান নেই। বাড়িটির মাঝখানে একটি উঠোন রেখে একদিকে অর্ধপাকা একটি ভবন এবং আরেকদিকে দ্বিতল একটি ভবন। নিঃসন্তান স্ত্রী ও দুই কাজের সহযোগী নিয়ে দেশে আসলে এই বাড়িতেই থাকেন আহমদ আলী।
১৯৭৫ সনে স্থায়ী বসবাসের জন্য বিলেত গিয়েছিলেন আহমদ আলী। পরবর্তীতে তার অন্য দুই ভাই ও দুই বোনও সেখানে চলে যান। তিনি বছরের একটা সময় দেশে এসে দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছে থাকেন। দ্বিতীয় পক্ষে তার কোন সন্তান নেই। বাড়িটিতে আভিজাত্য ও নান্দনিকতা থাকলেও মানুষের কোলাহল নেই। তবে সম্প্রতি শামীমার জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় তারা পিতা আহমদ আলী লজ্জায় বাড়ি থেকে বেশি বের হচ্ছেন না। নীরবেই বাড়িতে বসে থাকেন তিনি। দুই সংসারের দ্বন্দ্বের কারণে শামীমা, তার মা ও বোনদেরও কোন ছবি নেই বাড়িতে। দ্বিতীয় সংসারের পর শামীমার মাও এই বাড়িতে আর আসেননি।
শামীমা বেগমের বাবা আহমদ আলী জানান, তার চার মেয়ের মধ্যে সবার ছোট শামীমা। সে অত্যন্ত মেধাবী। ছোটবেলা থেকেই সে গম্ভীর প্রকৃতির। নীরবে বাসায়ই সময় কাটাতো। খেলাধুলা করতোনা। তার অন্য তিন মেয়ের বন্ধু-বান্ধব বিভিন্ন সময় বাসায় আসলেও ব্যতিক্রম ছিল সে। স্কুলের সবাইও তাকে ভালোবাসতো। স্কুলের প্রতিবেদনেও তার কোন মন্দ রিপোর্ট নেই। আইএসে যোগ দেবার পরপরই তার স্কুলের জিসিএসই পরীক্ষার ফলাফল বের হয়। এতেও ভালো ফলাফল করেছিল সে।
শান্তশিষ্ট এই মেয়ে কিভাবে এমন সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগ দিল তাই নিয়ে বিস্মিত আহমদ আলী বলেন, ‘ছোট বেলায় শামীমা খুব বালা আছিল, লেখাপড়ায়ও। কোনো ইসলামি সংগঠনো আছিলনা। তবে এই বাচ্চাটার একটা দোষ আছিল। সহজে বালাবুরা যাছাই করতে পারতোনা। কেউ বাদ খউক, বালা খউক তার কথা সঠিক মনে করতো।’ আহমদ আলী বলেন, ‘বৃটেন তার নাগরিকত্ব বাতিল করাটা ঠিকনা। সে দোষ করছে। ফিরত নিয়া তারে শাস্তি দেউক। তারতো আর কোন দেশোর নাগরিকত্ব নাই। সে বাংলাদেশের নাগরিক নায়। হে কোনদিন বাংলাদেশোও আইছেনা।’
আহমদ আলী জানান, শামীমা যখন সন্ত্রাসী সংগঠনে যোগদানের উদ্দেশ্যে বৃটেন ছাড়ে তখন তিনি বাংলাদেশে ছিলেন। শামীমাসহ তিনজন দেশ পালিয়ে সিরিয়া যাওয়ার আগে একই স্কুল থেকে আরেকটি মেয়ে একমাস আগে দেশ ছেড়েছিল। একমাস পরেই একই স্কুলের আরো তিনজন দেশ ছাড়ে। কিছু সময়ের ব্যবধানে স্কুলপড়–য়া চারটি মেয়ের দেশ থেকে পালিয়ে জঙ্গি সংগঠনে যোগদানের আগে অবশ্যই তারা একসঙ্গে চলাফেরা ও কথাবার্তা বলেছে। স্কুলের এই বিষয়টা তদন্ত হওয়া উচিত। তিনি জানান, পালানোর সময় শামীমার কোন পাসপোর্ট ছিলনা। আরেকজনের পাসপোর্ট দিয়ে সে বৃটেনের মতো শক্তিশালী দেশের ইমিগ্রেশনকে ফাঁকি দিয়ে কিভাবে পালালো এটাও তদন্তের দাবি রাখে। এই দুইটা বিষয়টি বৃটিশ সরকার তদন্ত করলে কারা শামীমাসহ কিশোরীদের সহযোগিতা করেছে এই তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি।
গ্রামের ইউপি সদস্য ছানু মিয়া বলেন, শামীমা বেগমের সঙ্গে আমাদের গ্রামের কোন সম্পর্ক নেই। বৃটেনেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও পড়ালেখা। কখনো সে দেশে আসেনি। বাংলাদেশের প্রতিও তার কোন আগ্রহ নেই। তবে আইএসে যোগদানের কারণে এখন মানুষ তার বাবার সূত্রে কিছুটা জানতে পেরে লজ্জাবোধ করছে। তার কৃতকর্মকে আমরা ঘৃণা করি।
গ্রামের যুবক মো. নুনু মিয়া বলেন, বৃটেনের নাগরিক শামীমার বাবার বাড়ি আমাদের গ্রামে। এটাই আমাদের জন্য এখন বড় লজ্জার। আমরা এ কারণে লজ্জাবোধ করলেও তার কৃতকর্মের দায় আমাদের নয়। কারণ সে বৃটেনের নাগরিক। বৃটেন তার নাগরিককে কি করবে তা নিয়ে আমাদের মাথা ঘামানোর সময়ও নেই।
জগন্নাথপুর থানার ওসি মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, শামীমার বাবা এখন বেশিরভাগ সময়ই বাংলাদেশে থাকেন। এখানে তার আরেকটি সংসার রয়েছে। শামীমা বৃটেনে বৃটেনের নাগরিক হিসেবে জন্ম নিয়েছে। কখনো দেশে আসেনি। সেখানেই বৃটিশ সরকারের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী