শনিবার, ০৬ জুন ২০২০, ০২:০১ অপরাহ্ন

Notice :

হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিনিধি সভা : খেয়াল-খুশি মতো হচ্ছে বাঁধের কাজ

মোসাইদ রাহাত ::
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিনিধি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বক্তারা হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজের নানা অনিয়ম-অসংগতি তুলে ধরেন।
শুক্রবার সকালে শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠিত প্রতিনিধি সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহিন চৌধুরী শুভ’র সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন সংগঠনের উপদেষ্টা নারীনেত্রী শীলা রায়, বিকাশ রঞ্জন চৌধুরী, রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু, হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন সদর উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক চন্দন কুমার রায়, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব জালাল উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা মালেক হুসেন পীর, অ্যাডভোকেট স্বপন কুমার দাস, সুখেন্দু সেন, ইয়াকুব বখত, মো. রবিউল ইসলাম, ডা. মুর্শেদ আলম, সাংগঠনিক সম্পাদক একে কুদরত পাশা, এমরানুল হক চৌধুরী, প্রদীপ কুমার পাল, রাধিকা রঞ্জন তালুকদার, আবু সাঈদ, নজরুল ইসলাম প্রমুখ।
বাঁধ বিষয়ে বিভিন্ন উপজেলার রিপোর্ট উপস্থাপন করেন হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও দিরাই উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব শামসুল ইসলাম সরদার খেজুর, তাহিরপুর উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব গোলাম সারোয়ার লিটন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন, জামালগঞ্জ উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অঞ্জন পুরকায়স্থ, ছাতক উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব জাহাঙ্গীর চৌধুরী, ধর্মপাশা উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব চয়ন কান্তি, সদর উপজেলা কমিটির প্রভাষক দুলাল মিয়া।
সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান।
তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ২০১৭ সালে বাঁধ ভেঙে ফসলহানির পর আমাদের এই সংগঠনের জন্ম হয়। পরবর্তীতে আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে ২০১৮ সালে হাওরের কাজে তদারকি করার দায়িত্ব পেয়েছি। তার ফল আমরা গেল বৈশাখে পেয়েছি। ২০১৮ সালের ফসলের মাধ্যমে আমরা দেখিয়ে দিতে পেরেছি বাংলাদেশের খাদ্য যোগানে সুনামগঞ্জের ভূমিকা। কিন্তু একথা সত্য যে কৃষকরা তার ফসলের ন্যায্য দাম পায়নি। কিন্তু এবছর হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ ১৫ ডিসেম্বর শুরু করার কথা থাকলেও তা হয়নি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে জাতীয় নির্বাচন। তাছাড়া বাঁধের কাজে কোনো নীতিমালা মানা হচ্ছে না। বাঁধের কাজে সরকার দলীয় লোকদের প্রভাব রয়েছে। আমরা দেখেছি কাজের ধীরগতি ও ঠিকমতো কাজ না করায় কয়েকজনকে আটকের পর মুচলেকার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন হাওরে বাঁধের কাজ দেওয়া হয়েছে যার কোনো প্রয়োজনই নেই। অপ্রয়োজনীয় বাঁধ তৈরির মাধ্যমে টাকার অপচয় হচ্ছে। এই সকল দুর্নীতিগুলো যদি আমলে না নেওয়া হয় তাহলে আমরা আইনের আশ্রয় নেব।
স্বাগত বক্তব্য শেষে শুরু হয় বিভিন্ন উপজেলার ফসলরক্ষা বাঁধের কাজের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সংগঠনের উপজেলা প্রতিনিধিদের বক্তব্য।
শুরুতে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার বাঁধের কাজ নিয়ে বক্তব্য রাখেন ওবায়দুল হক মিলন। তিনি বলেন, দেখার হাওরের ৩১নং পিআইসি’র বর্তমান সভাপতি আরশ আলী। বিগত বছরেও অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ৩১নং পিআইসিতে গিয়ে দেখলাম বৃহস্পতিবার থেকে মাটি কাটা শুরু হয়েছে। সভাপতিকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, কাজ শেষ করতে সময় রয়েছে ৭ দিন। আমি ৭ দিনের ভিতরেই কাজ শেষ করে দিব। এই পিআইসিতে কোনো কাজ নাই। কাদা মাটি ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে ৩৫নং পিআইসিতে গিয়ে দেখলাম এটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ। এখানে আগের বছরের মাটির উপর কিছু মাটি ফেলে কাজ করা হচ্ছে। তাছাড়া বাঁশের বেড়া এবং বালু-মাটি দিয়ে কাজ করা হচ্ছে এবং ২১নং পিআইসির কাজ খুব ধীরগতিতে হচ্ছে যা ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কিছুতেই শেষ হবে না। তাছাড়া দেখার হাওরের জামখলা ইউনিয়নের ২নং পিআইসি কাজে এখনো মাটি ফেলা হচ্ছে এবং ৩নং পিআইসি’র অবস্থা আরো খারাপ। এখানে নতুন কোনো মাটি কাটা হয়নি। পুরনো মাটি দিয়ে কাজ হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ফসলরক্ষা হাওরের বাঁধের বর্তমান কাজ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন প্রভাষক মো. দুলাল মিয়া। তিনি বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সুনামগঞ্জের সদর উপজেলায় ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের জন্য ৯টি পিআইসির মাধ্যমে কাজ চলছে। এতে মোট বরাদ্দ ৬৬ লাখ টাকা। গৌরারং ইউনিয়নের ৩নং পিআইসি ও রঙ্গাচর ইউনিয়নের ৬নং পিআইসিগুলো পরিদর্শন করে যা জানতে পেরেছি এই পিআইসিগুলোকে স্থানীয়রা অপ্রয়োজনীয় বলে দাবি করেছেন। এগুলো হাওরে ফসলরক্ষার কোনো কাজে আসবে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাছাড়া ৭নং পিআইসি একটি ছোট ভাঙা বন্ধ করার জন্য ১৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই ভাঙার জন্য ১৬ লক্ষ টাকার কোনো প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাছাড়া কোনো বাঁধেই দুরমুজ করা হচ্ছে না। বাঁধে ঘাস লাগানোর কথা থাকলেও রঙ্গারচর ইউনিয়ের ৮নং পিআইসি ছাড়া আর কোথাও ঘাস লাগানো হয়নি।
দিরাই উপজেলার ফসলরক্ষা হাওরের বাঁধের বর্তমান কাজ নিয়ে বক্তব্য রাখেন শামছুল ইসলাম সরদার। তিনি বলেন, দিরাইয়ের মাছুয়া খা হাওরে বাঁধের কাজ করা হচ্ছে কালো মাটি দিয়ে। যা নিয়ম বহির্ভূত। তাছাড়া বরান হাওরে ১নং পিআইসিতে কালো মাটি দেওয়া হচ্ছে এবং রফিনগরে যে বাঁধের কাজ করা হচ্ছে তা অপ্রয়োজনীয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তাহিরপুর উপজেলার ফসলরক্ষা হাওরের বাঁধের বর্তমান কাজ নিয়ে বক্তব্য রাখেন গোলাম সারোয়ার লিটন। তিনি বলেন, এবছর তাহিরপুর উপজেলায় পিআইসি রয়েছে ৬৬টি। মাটিয়ান হাওরে আশেপাশে মাটি সংকট রয়েছে। মাটি কাটার যে মেশিন ২টি রয়েছে যার দু’টিই নষ্ট। যার ফল স্বরূপ পিআইসির ৩৮, ৪৬ এবং ৪৭-তে কাজ হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। আমাদের উপজেলায় রাজনৈতিকভাবে কোনো প্রভাব নেই। হাওরের কাজকে সবচেয়ে বেশি লাভজনক ব্যবসা মনে করেছেন অনেকে।
জামালগঞ্জ উপজেলার ফসলরক্ষা হাওরের বাঁধের বর্তমান কাজ নিয়ে বক্তব্য রাখেন অঞ্জন পুরকায়স্থ। তিনি বলেন, এবছর জামালগঞ্জে ৫২টি পিআইসি রয়েছে। যার মধ্যে পিআইসি নং ২৬, ৩৫, ৪২, ৪৪, ৫১ এবং ৫২। এই বাঁধগুলোতে কাজ হয়েছে ৩০ এবং ৪০ শতাংশ। যার মধ্যে ৫১ ও ৫২নং পিআইসির কাজ এলাকা লোকেরা পায়নি। পেয়েছে অন্য ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের লোক। দিরাই থানার ৪৭নং পিআইসির অবস্থা খুব খারাপ। যার সাথে জামালগঞ্জের ফসল জড়িত। এই পিআইসি’র কাজ সঠিকভাবে না হলে জামালগঞ্জের ফসল তলিয়ে যাবে। তাছাড়া খালিয়াজুড়ি এলাকার ৫ ও ৬ নং পিআইসির কোনো কাজ শুরু হয়নি। তাছাড়া বাঁধের কাছ থেকে মাটি তোলা দিচ্ছে। যার ফলে বাঁধগুলো বেশি দিন টিকবে না।
ছাতক উপজেলার ফসলরক্ষা হাওরের বাঁধের বর্তমান কাজ নিয়ে বক্তব্য রাখেন জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, নাইন্দার হাওরের ১, ২, ৩নং পিআইসির কাজ ধীরগতিতে হচ্ছে। যা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কখনো শেষ হবে না। তাছাড়া কাজের অনিয়মের কারণে চাউলের হাওরের পিআইসি ৭নং বাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলার ফসলরক্ষা হাওরের বাঁধের বর্তমান কাজ নিয়ে বক্তব্য রাখেন চয়ন কান্তি দাশ। তিনি বলেন, ধর্মপাশার ৮৭টি হাওরে ৪০ শতাংশ কাজ হয়েছে। যার মধ্যে চন্দ্র সোনার তালে ২০ শতাংশ হয়েছে। তাছাড়া আরো তিনটি বাঁধের কাজ ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে রইবিলের প্রকল্প মধ্যে কোনো সাইনবোর্ড লাগানো হয় নি।
সভাপতির বক্তব্যে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, আমরা সকল হাওরের অনিয়ম ও কাজের ধীরগতির কথা শুনেছি। খেয়াল-খুশি মতো হচ্ছে বাঁধের কাজ। হাওরের দুর্নীতির শুরু হয় প্রি-মেজারমেন্টের মাধ্যমে। প্রি-মেজারমেন্ট করেন ইঞ্জিনিয়াররা। গতবছর যে জেলা প্রশাসক ছিলেন তিনি থাকলে প্রি-মেজারমেন্টের সময় আমরাও থাকতে পারতাম। সেগুলো তিনি গণশুনানির মাধ্যমে করতেন।
তিনি আরো বলেন, আমাদের আন্দোলনের মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল হয়েছে। এই বছর জেলা প্রশাসককে আমরা বলেছিলাম প্রি-মেজারমেন্ট এর জন্য গণশুনানি করতে। কিন্তু তিনি সেটা করেন নি। তিনি এখন বলেন জাতীয় নির্বাচনের জন্য করতে পারেন নি। তিনি যদি আদেশ দিতেন তাহলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা কাজ করতেন। সেজন্য বাঁধের কাজে বরাদ্দ সব জায়গায় বেশি দেওয়া হচ্ছে। তাই মনিটরিং বাড়াতে হবে। আজকে আমরা যে কথাগুলো শুনলাম সেগুলো নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলন করবো। তাছাড়া আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পানিসম্পদ মন্ত্রী ও সচিব বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করবো।
সভার শুরুতে মহান একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার জন্য যারা শহীদ হয়েছেন এবং গেল বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানী ঢাকার চকবাজারে আগুনে পুড়ে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী