,

Notice :

মুখ দেখে নয়-যাচাই করে ভোট দিন : আফতাব চৌধুরী

নির্বাচন-অনেক বড় শব্দ, নামী-দামী গভীর শব্দ। জনগণের হাতে শক্তি তুলে দেওয়ার একমাত্র অস্ত্র। নির্বাচনের মাধ্যমেই জনপ্রতিনিধি ঠিক করে তাদের হাতেই তুলে দেওয়া হয় দেশের শাসনভার। গণতন্ত্রের নিয়ম এটাই। বিশ্বজুড়ে সব গণতান্ত্রিক দেশেই চলছে এ নিয়ম। ইউরোপ-আমেরিকাসহ আমাদের দেশেও চলছে। পদ্ধতিগতভাবে একটু হেরফের থাকলেও, জনগণই শেষ কথা। নির্বাচন মানেই জনগণের রায়।
নির্বাচনতো নয় একটি দেশের জাতীয় উৎসব। ওই দিনে ছোটরা আনন্দ করে, বড়রা নিজের পছন্দের মানুষকে দেশের শাসনভার অর্পন করার উদ্দেশ্যে অ্যাটম বোমার চেয়ে শক্তিশালী ভোট নামক হাতিয়ার ব্যবহার করে। কাতারে কাতারে মানুষ ছুটে পুরুষ-মহিলা-বৃদ্ধ নির্বিশেষে ভোটকেন্দ্রের দিকে-কতই না সুন্দর ও মজার ব্যাপারটা-কোনও ভোজের নিমন্ত্রণে নয়, কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নয়, তবু নামে মানুষের ঢল। নিজের অধিকার খাটাবে এই দিন মানুষ। বড় চমৎকার। এরই নাম গণতন্ত্র, এরই নাম নির্বাচন।
বাংলাদেশের মত একটি গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে এই চমৎকারিত্বের ফারাক নজরে পড়ে বড় বেশি। এক জায়গায় মানুষ সবাই চিন্তা করে ভোট দেয় আর অন্য দেশের মানুষ অনেকেই চিন্তা করে না বা চিন্তা করার বোধশক্তিও নেই। নির্বাচনে খরচ প্রচুর হয় উভয় দেশে-কিন্তু এক দেশে বাটাবাটি হয় না, অন্যখানে বাটাবাটি হয়।
এবারকার নির্বাচন আমাদের নির্বাচন কমিশনের যে খরচ হচ্ছে তা নাকি আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের খরচ থেকে অনেক বেশি। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত খরছের মোটামুটি একটা হিসেব পাওয়া যায় কিন্তু আমাদের দেশের নেতাদের ব্যক্তিগত খরচের হিসেব কোনও অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেলের পক্ষেও রাখা সম্ভব নয়। ওখানকার নেতারা যা বলেন তা রাখার চেষ্টা করেন আর আমাদের এখানে এসব তো কথার কথা।
নির্বাচন কমিশন যতই কড়া নজর রাখুন না কেন, খরচের মাপকাটি যতই নির্ধারণ করে দিক না কেন, আসলে খরচ হয় তার কয়েক’ গুণ বেশি, ধরারও উপায় নেই তা। আর এখানেই মার খায় জাতীয় উৎসব। আমেরিকায় তো ভোটে কোনও মারামারি হয় না, ইউরোপেও না। কিন্তু আমাদের দেশে তা পরস্পরা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হবে নাই বা কেন? টিকিট-ই তো আমরা দেই মুখ দেখে। অর্থশক্তি ও পেশীশক্তি যার বেশি , সেই তো হবে জননেতা। ওখানে নেতা হন মানের জন্য আর এখানে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই নেতা হন সম্পদ জমানোর জন্য।
নির্বাচন কমিশনের রক্তচক্ষুও যখন কাজ দেয় না এবং কথারও যখন কোনও দাম থাকে না এবং মানুষ যখন ভোট দেয় আবেগে ভেসে বা কম চিন্তা করে তখন মনে হয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের স্বাধীনতা দিয়ে দেওয়াই ভাল, যে যত পার খরচ কর। হয়তো নগদ লাভমান হবে সাধারণ মানুষ। কে, কী করতে পার, আগে কাজ করে দেখাও , তারপর ভোট। রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজের ঘর, কালভার্ট, ক্লাব ঘর, মসজিদ, এবং ব্যক্তিগত নগদ যা পার দাও-কাজের বিনিময়ে ভোট-ভোটের বিনিময়ে কাজ নয়। দু’একটা নির্বাচন যদি এভাবে খেলতে দেওয়া যায়, তাহলে সমাজের উন্নতি অনেকটা হবেই। চুপেচুপে তো কিছু হচ্ছে, খেলাধুলা হোক, দেখা যাক কী হয়।
আর একটা কথা, বহু দলীয় প্রথা আমাদের সংবিধানে স্বীকৃত হলেও প্রথম প্রথাটা যদি জেলাস্তরে সীমাবদ্ধ থাকে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে ত্রি-দলীয় প্রথা আইন করে চালু করা যায় তবে জাতীয় লাভ অনেক বেশি হবে মনে হয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে একটু চিন্তা করে দেখবেন প্রত্যাশা করি।
বর্তমানে নির্বাচনের যা অবস্থা তাতে সাধারণ মানুষ-ভীত, ভবিষ্যতে হবে আরও নিষ্ক্রিয়। জাতীয় উৎসব হয়ে উঠবে দলীয় উৎসব-যা আনবে হানাহানি ও অনৈক্য। ভোট মেরুকরণে জাতীয় ঐক্য হচ্ছে বিনষ্ট। এর প্রতিকারে কি কোনও আইন প্রণয়ন করা সম্ভব নয়?
আমরা বাংলাদেশী। বাংলাদেশের মঙ্গল চাই। আমরা চাই বাংলাদেশ রাজনীতি, অর্থনীতি এমনকি সর্বনীতিতে পৃথিবীতে এক নম্বর হোক। কোন্দলে হয় দেশ নষ্ট। কোন্দলের রাজনীতি যারা করে, বহিষ্কার করতে হবে এদের। রাজনীতি যে লোভের বস্তু নয় তা বুঝাতে হবে সবাইকে। বন্ধ করতে হবে আখের গোছানোর রাজনীতি। তবেই আমরা পাব কিছু সত্যিকারের নেতা। না হলে অতিষ্ট ভোটাররা আগামীতে ভোটে অংশগ্রহণ করা থেকে অনেকটা বিরত থাকবে, এমন ধারণা অনেকেরই। সর্বশেষে একটি কথা বলতে চাই, আমাদের শাসন করার জন্য আমরা কাকে পাঠাচ্ছি, একথা যেন আমরা চিন্তা করে দেখি। ভোট দেওয়ার সময় আমরা যেন মুখ দেখে নয়, যাকে ভোট দেব তাকে যেন যাচাই বাচাই করে দেই।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী