,

Notice :

সাবেক ও বর্তমান ১২ এমপির হলফনামা : প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিতে পোকা

শামস শামীম ::
কেউ লিখেছেন, কাক্সিক্ষত কাজ হয়েছে। কেউ লিখেছেন, শতভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। আবার কেউ লিখেছেন, যথেষ্ট উন্নয়ন। কিন্তু বাস্তবে ভোটাররা তা মানতে নারাজ। সাবেক ও বর্তমান সংসদ সদস্যদের (এমপি) প্রতিশ্রুতি পূরণ নিয়ে তাই প্রশ্ন উঠেছে। সুনামগঞ্জে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন সাত সাবেকসহ ১২ এমপি। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামার ৭ নম্বর ঘরে প্রতিশ্রুতি ও এর বাস্তবায়ন বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
সুনামগঞ্জ-১ : এ আসনে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি বাংলাদেশ মুসলিম লীগ মনোনীত প্রার্থী বদরুদ্দোজা আহমদ সুজা প্রতিশ্রুতিতে লিখেছেন, আওয়ামী লীগের দলীয় ইশতেহার অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে দেওয়া তাঁর সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়েছে। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নজির হোসেন উল্লেখ করেছেন, স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজে অংশগ্রহণ-এ শতভাগ অর্জন করেছেন। এর বেশি কিছু লেখেননি। এ আসনে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মনোনয়ন জমা দিয়েছেন সাবেক এমপি বদরুদ্দোজা আহমদ সুজা। তিনি উল্লেখ করেছেন, শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, কৃষি উন্নয়ন ও অপরাধ দমন করেছেন। অর্জনে একটি করে উল্লেখ করলেও কী অপরাধ দমন করেছেন তার উল্লেখ নেই।
সুনামগঞ্জ-২ : এ আসনে আওয়ামী লীগের হয়ে মনোনয়ন জমাদানকারী এমপি ড. জয়া সেনগুপ্তা আগের দুটি প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করেছেন। দিরাই-মদনপুর সড়ক সংস্কার কাজ স¤পন্ন এবং শতভাগ বিদ্যুতায়ন। তবে ভোটাররা জানায়, সড়কের কাজ শেষ হলেও হাওরবেষ্টিত এই দুই উপজেলায় এখনো শতভাগ বিদ্যুতায়ন হয়নি।
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি নাছির উদ্দিন চৌধুরী। তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে ৮০ শতাংশ অর্জন করার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ভোটাররা জানায়, এ এলাকার সার্বিক অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি কাজ
করেছেন প্রয়াত এমপি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত।
সুনামগঞ্জ-৩ : এ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। এলাকার যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন করেছেন তিনি। বিএনপি সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বিকল্প জগন্নাথপুর-আউশকান্দি সড়ক একনেকে অনুমোদন। পরে এ সড়কের কুশিয়ারায় দেড় শ কোটি টাকা ব্যয়ে সেতু নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করেছেন।
এ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী সাবেক এমপি মাওলানা শাহীনুর পাশা চৌধুরী তাঁর প্রতিশ্রুতিতে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা বাস্তবায়ন উল্লেখ করেছেন। তবে এটি সত্য নয় বলে ভোটাররা জানিয়েছে। ২০০৪ সালে উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আগেই এ আসনের সাবেক এমপি প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদ এ উপজেলার গোড়াপত্তনের আনুষ্ঠানিক কাজ শেষ করেন।
একইভাবে জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজকে ডিগ্রিতে উন্নীতকরণ উল্লেখ করলেও এলাকাবাসী জানিয়েছে, এ কলেজকে ডিগ্রিতে উন্নীত করতে কাজ করেছেন আব্দুস সামাদ আজাদ। প্রতিশ্রুতির মধ্যে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ বললেও সেটিও পূর্ণ সত্য নয় বলে এলাকার ভোটাররা জানিয়েছে।
এ আসনের ভোটার ওবায়দুর রহমান কুবাদ বলেন, বিএনপি আমলে ফজলুল হক আছপিয়া, শাহীনুর পাশা আমাদের রানীগঞ্জ-জগন্নাথপুর সড়কের কাজ বাতিল করেছিলেন। এ দুজনই হলফনামার প্রতিশ্রুতিতে মিথ্যা বলেছেন।
সুনামগঞ্জ-৪ : এ আসনে মহাজোট মনোনীত প্রার্থী জাতীয় পার্টি নেতা অ্যাডভোকেট পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ এলাকার বিদ্যুতায়ন, যোগাযোগ উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবায় যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফজলুল হক আছপিয়া বিশ্বম্ভরপুর-কাচিরগাতি সড়ক নির্মাণে ৭০ শতাংশ অর্জন, সুরমা সেতু নির্মাণে ২০ শতাংশ অর্জন, বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ৬০ শতাংশ অর্জন, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে ৫০ শতাংশ অর্জন বলেছেন। তবে ভোটাররা জানিয়েছে, সুরমা সেতুর মতো বৃহত্তর প্রকল্পের কাজে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে কোনো বরাদ্দ ছাড়াই বিএনপি সরকার লোক-দেখানো উদ্বোধন করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর গুচ্ছ প্রকল্প থেকে সামান্য বরাদ্দ দিয়ে শুধু উদ্বোধন করা হয়েছিল। পরে আওয়ামী লীগের এমপি মতিউর রহমান একনেকে প্রকল্পটি পাস করিয়ে কাজ শেষ করেন। ফজলুল হক আছপিয়ার সময়ে সুনামগঞ্জের সঙ্গে ঢাকার বিকল্প সড়ক জগন্নাথপুর-আউশকান্দি সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারে ১২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেটি পরে মৌলভীবাজারের শেরপুর সড়কে চলে যায়। একইভাবে তাঁর সময়ে নার্সিং ইনস্টিটিউট সুনামগঞ্জে অনুমোদনের পরও সেটিও মৌলভীবাজারে চলে যায়।
সাবেক এমপি মতিউর রহমান উল্লেখ করেছেন, নদীর উত্তর পারে মহাবিদ্যালয় স্থাপন করে প্রতিশ্রুতি
বাস্তবায়ন করেছেন। সড়ক-সেতু নির্মাণেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শতভাগ অর্জন হয়েছে বলে উল্লেখ করে
সদর উপজেলার পৈন্দা নদীতে প্রতিশ্রুতি দিয়েও সেতু নির্মাণ করতে পারেননি। প্রতিশ্রুতিতে তিনি সন্ত্রাস ও অপরাধ দমনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জিত হওয়ার কথা বললেও সফলতার একটিও উল্লেখ নেই।
সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ উল্লেখ করেছেন, তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতির মধ্যে এলাকার যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে সর্বোচ্চ উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই।
সুনামগঞ্জ-৫ : এ আসনের এমপি মুহিবুর রহমান মানিক উল্লেখ করেছেন, দলীয় ইশতেহার অনুযায়ী সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেছেন। বিএনপির প্রার্থী সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন উল্লেখ করেছেন অবকাঠামো উন্নয়ন ৮০ শতাংশ, কৃষি খাতে উন্নয়ন ৮০ শতাংশ, শিক্ষায় ৭০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যে ৬০ শতাংশ উন্নয়ন করেছেন। এ আসনে সুরমা নদীতে ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল। বৃহৎ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন না করে প্রধানমন্ত্রীর গুচ্ছ প্রকল্প থেকে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উদ্বোধন করিয়ে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। সম্প্রতি সেতুটি একনেকে অনুমোদন করিয়েছেন আওয়ামী লীগের এমপি মুহিবুর রহমান মানিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী