,

Notice :

লাউড় রাজ্যের হাউলি দুর্গ খনন শুরু : দুর্গের নিচে পাওয়া গেছে প্রাচীন স্থাপনার চিহ্ন


শামস শামীম::

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তে অবস্থিত প্রাচীন লাউড় রাজ্যেরে ঐতিহাসিক হলহলিয়া (হাউলি) দুর্গ খনন শুরু হয়েছে। প্রথম দিন খনন শেষে খননদলের প্রধান, প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর চট্টগ্রাম-সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান কালের জনিয়েছেন দুর্গের নিচে সারি সারি পুরাতন ইট পাওয়া গেছে। যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে লাউড় সভ্যতার আগেও এখানে অন্য কোন সভ্যতা ছিল। মেঘালয়ের পাদদেশের এই স্থানে এক সভ্যতার ওপর আরেক সভ্যতা গড়ে ওঠেছে। খনন কাজ শেষ হলে কয়েকটি সভ্যতার নির্দশন এখান থেকে পাওয়া সম্ভব। তিনি আরো জানান, একাধিকবার জরিপ শেষে এবং এখন খনন শুরু করে কয়েকটা যুগের অস্তিত্ব পেয়েছি আমরা। এখানে একটার ওপর আরেকটা সভ্যতা গড়ে ওঠেছে। মেঘালয় পাহাড় ও সীমান্ত নদী যাদুকাটাকে কেন্দ্র করে এখানে কয়েকটি সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল বলে মনে করেন খননদলের প্রধান ড. মো. আতাউর রহমান।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা আনুষ্টানিকভাবে বুধবার সকাল থেকে ঐতিহাসিক এই স্থানটি খনন শুরু হয়। প্রথমে হলহলিয়া দুর্গ ও প্রাচীর দিয়ে খনন শুরু হলেও পরবর্তীতে পাশের ব্রাম্মণগাও রাজবাড়িও খনন হবে। রাজবাড়ির দৃষ্টিনন্দন ধ্বংসাবশেষ এখনো সভ্যতার চিহ্ন বহন করছে। উৎখনন কাজে অংশ নিয়েছেন প্রতœতত্ব অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক মো. মাহবুব আলম, ময়নামতি জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান ড. আহমেদ আবদুল্লাহ্, ময়নামতি জাদুঘরের সহকারি কাস্টোডিয়ান মো. হাফিজুর রহমান, প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক অফিসের সিনিয়র ড্রাফটসম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম, সার্ভেয়ার জালাল আহমেদ, আলোকচিত্রি মো. নুরুজ্জামান মিয়া, পটারী রেকর্ডার মো. ওমর ফারুক ও অফিস অফিস লক্ষণ দাস। তারা দুই মাস তাহিরপুরের হলহলিয়া গ্রামে অবস্থান করবেন। সুনামগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান খননকাজের উদ্বোধন করেন।
খনকারীরা দল জানিয়েছে প্রথম দিন হলহলিয়া দুর্গের প্রধান ফটকের পূর্ব দিকের প্রাচীরের দক্ষিণ অংশ থেকে খনন শুরু হয়। প্রধান ফটক থেকে দুর্গটি উত্তর-দক্ষিণে গেছে। প্রাচীরের উপরের অংশ পাথর দিয়ে মোড়ানো। দেখে বুঝার উপায় নেই এর নিচে কিছু থাকতে পারে। কিন্তু খননদল সেখান থেকেই খনন করে সেগুলো সরিয়ে নিচের দিকে কিছু দূর খনন করার পরই পাওয়া গেছে ৫০০ বছর আগের পুরনো রঙিন ও অক্ষত অনেকগুলো ইট। যা তরে তরে সাজানো। প্রথম দিন দুর্গ খননের মাধ্যমে শুরু হলেও পরবর্তীতে পাশের ব্রাম্মণগাও রাজবাড়ি খনন করার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। সেখানেও সভ্যতা ও ঐতিহাসিক নিদর্শন প্রাপ্তির প্রাপ্তির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় গবেষক ও সুধীজন জানিয়েছেন প্রায় ৭শ বছরের পুরনো এই পুরাকীর্তী স্থাপনা খননের ফলে ইতিহাসের অজানা অধ্যায়ের উন্মোচন হবে। নতুন করে রচিত হতে পারে প্রাচীন লাউর রাজ্যের ইতিহাস। বেরিয়ে আসতে পারে লাউড় সভ্যতার আগের কোন সভ্যতার ইতিহাসও।
ঐতিহাসিক ও স্থানীয় গবেষকদের সূত্রে জানা গেছে, লাউড় রাজ্য পৌরাণিক যুগের রাজ্য। এর স্থপতি রাজা ভগদত্ত। ভগদত্তের ১৯ জন বংশধর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে রাজ্য স্থাপন করেছেন। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রাচীন লাউড় রাজ্য কামরূপ রাজ্য থেকে আলাদা হয়। দশম শতক থেকে স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন শুরু হয়। ঐতিহাসিকদের মতে বর্তমানে সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ময়মনসিং পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল লাউড় রাজ্য। মহাভারতের যুদ্ধে অর্জনের পক্ষে লড়তে গিয়ে নিহত হন রাজা ভগদত্ত। অর্জুনের পক্ষে সৈন্য সামন্ত পাঠিয়েছিলেন ভগদত্ত। দ্বাদশ শতাব্দীতে রাজা বিজয় মাণিক্য লাউড় রাজ্য পরিচালনা করেন। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষে তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরেও রাজ্য স্থাপন করেন। এসময় বঙ্গের ব্রাম্মণরা বল্লাল সেন কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে রাজা বিজয় মাণিক্যের রাজ্যে এসে আশ্রয় নেন। তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন বিজয় মাণিক্য। বিজয় মাণিক্যের পরে কারা লাউড় শাসন করেন ইতিহাসে এখনো অজানা রয়ে গেছে। তবে বিজয় মাণিক্যের সময়ে অনেক গুণীজন পৃষ্টপোষকতা লাভ করেন। প্রাচীণ ইতিহাসে লাউড় রাজ্য সব সময় স্বাধীন ছিল বলে জানা যায়। খননের ফলে লাউড় রাজ্যের ইতিহাসের নতুন অনেক কিছু উন্মোচন হবে বলে মনে করেন স্থানীয় গবেষক ও ঐতিহাসিকরা।
জানা গেছে সুনামগঞ্জের কৃতী সন্তান বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)’র চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ সাদিক ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও প্রতœতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষষ্ট দফতে সুনামগঞ্জের এই ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও ইতিহাস সংরক্ষণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লিখিত আবেদন জানান। ড. মোহাম্মদ সাদিক তাঁর পত্রে উল্লেখ করেছিলেন, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় প্রাচীণ লাউড় রাজ্যের রাজধানী ছিল। লাউড়ের রাজা ভগদত্ত মহাভারতের যুদ্ধে অর্জুনকে সৈন্য পাঠিয়ে সাহায্য করেছিলেন। মহাভারতের প্রথম বাংলা অনুবাদকারী মহাকবি সঞ্জয়ও ওই এলাকার বাসিন্দা। সাধক শাহ জালালের সঙ্গী শাহ আরেফিন, মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্যের প্রধান সহচর শ্রী অদ্বৈতাচার্যর বাড়িও এখানে। ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিন মূল্যবান নিদর্শনের এই এলাকাকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতœতত্ত্ব বিভাগের মাধ্যমে ইতিহাসের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের আহ্বান জানিয়েছিলেন ড. মোহাম্মদ সাদিক। তার আবেদনের প্রেক্ষিতেই অবশেষে খননকাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। খননকাজ উদ্বোধনকালে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন হললিয়া দুর্গ ও ব্রাম্মণগাও রাজবাড়ি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন প্রতœ নিদর্শনের চিহ্ন বহন করছে। খননের মাধ্যমে তা নতুন করে উন্মোচিত হবে।
সুনামগঞ্জের গবেষক কবি ইকবাল কাগজী বলেন, আমাদের সামনে প্রাচীন এই পুরার্কীতি গুলো অবহেলা ও অনাদরে ছিল। অবশেষে খননকাজ শুরু হওয়ায় আমরা আশাবাদী। আমরা আশা করছি এখানে লাউড় সভ্যতার অনেক অজানা ইতিহাস জানা যাবে।
৯ সদস্যের খনন দলের প্রধান প্রতœতত্ব অধিদপ্তর চট্টগ্রাম-সিলেট অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, আমরা দুই মাস এখানে থাকব। প্রথম দিনের খননেই আমরা অনেক কিছু পেয়েছি। দুর্গ খননের শুরুতেই ৫শ বছরের পুরনো ইট পেয়েছি। নিচে আরো খনন করলে এবং পাশের ব্রাম্মণড়াও রাজবাড়ি খনন হলে আরো কয়েকটা যুগের প্রতিনিধিত্বকারী ঐতিহাসিক উপাদান পেতে পারি। তিনি বলেন বিভিন্ন সময়ের জরিপ ও প্রথম দিনের খনন শেষেই আমাদের মনে হয়েছে এখানে কয়েকটি সভ্যতার নির্দশন রয়েছে। মেঘালয় পাহাড় ও যাদুকাটা নদীকে কেন্দ্র করে এই এখানে বারবার সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী