,

Notice :

সর্বত্র বাংলা প্রচলনের ব্যর্থতা একটি পশ্চাদপদতার লক্ষণ : শাহজাহান গাজী

আমরা স্বাধীন দেশের মানুষ, স্বাধীন দেশের নাগরিক। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। অথচ আমি ব্যাংক থেকে টাকা পয়সা তোলার সময় কিংবা কোনও লেনদেনের সময় যে-সব কাগজপত্র ব্যবহার করি সে-গুলো ইংরেজি। তখন সত্যিকার অর্থে আমার কেমন একটা লাগে। আমি সাধারণ মানুষ, এতো বিদ্যাবুদ্ধি আমার নেই যে, সেই কেমন লাগাটাকে কথার মারপেচে সাজিয়ে গুছিয়ে বুঝিয়ে বলি। কেবল মনে হয়, বাংলাদেশে, বাঙালির দেশে, বাংলাভাষার দেশে সরকারি কাগজপত্র ইংরেজি ভাষায় কেন? ইংরেজদের দেশে সরকারি কাগজপত্র তো ইংরেজি ভাষায়, বাংলাভাষায় তো হয় না। তবে আমাদের দেশে সরকারি কাগজপত্র বাংলায় না হয়ে ইংরেজিতে কেন? আমার কাছে এর একটা সহজ উত্তর আছে। আমরা ১৯৪৭-এর আগে ইংরেজদের দ্বারা শাসিত হয়েছিলাম।
ইংরেজরা তাদের শাসনের সুবিধার জন্য সরকারি বা রাষ্ট্র পরিচালনার এবং লেখাপড়া করার ভাষা ইংরেজি করে নিয়েছে। তারা রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী ছিল, তাদের ইচ্ছামতো তারা প্রশাসনিক সকল কাজের ভাষা ইংরেজি করে নিয়েছে। কিন্তু এখন তো আর রাষ্ট্রক্ষমতায় ইংরেজরা নেই, তাহলে বিভিন্ন কাজ কারবারের ভাষা ইংরেজি কেন? এই ইংরেজি এই দেশের ক’জন মানুষ বোঝেন? এই দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ তো গ্রামে বাস করেন, তাঁরা কেউই একদম ইংরেজি বুঝেন না এবং যাঁরা উচ্চ শিক্ষিত তারই বা ক’জন ইংরেজি ভাল করে বোঝেন বা তাঁরা নিজেদেরকে ইংরেজিতে প-িত বলতে পারেন? আমার তো মনে হয় এ দেশে যাঁরা আসলেই ইংরেজি জানেন তাঁরা সংখ্যায় হাতে গোণা। দেশের সাধারণ মানুষ যদি নাই বোঝেন তো বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের কাগজপত্রে এই ইংরেজির প্রচলন কেন, বাংলার প্রচলনে দোষ কী, বাধা কোথায়? মনে হয়, যাঁরা ইংরেজি প্রচলিত থাকার পক্ষপাতী ইংরেজি প্রচলিত থাকলে তাঁরা কোনও না কোনওভাবে লাভবান হন এবং ইংরেজি না-বুঝার কারণে সাধারণ মানুষকে কোনও না কোনওভাবে ঠকানোর একটা সুযাগ সৃষ্টি হয়।
ব্যাংকের লেনদেন, হিসাব তথ্যগুলো এমনকি ইন্টারমিডিয়েট পাশ ছাত্রছাত্রী পর্যন্ত টিকঠাকভাবে পড়তে পারে না, পড়তে পারলেও বুঝে না। আমার হিসাবে কোনটা জমা কোনটা খরচ, কোনটা কেটে নেওয়া হল কোনটা যোগ করা হল, আমি একরকম অশিক্ষিত মানুষ, তার কিছুই বুঝি না। অথবা অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তর ব্যবস্থাপত্রটি ইংরেজিতে লেখেন। অষুধের নাম তো ইংরেজিতেই লেখা হয়, অষুধ ব্যবহারের নিয়মাদিও প্রায়শই ইংরেজিতেই থাকে। তখন বড় বিপদে পড়ি। এই বিপদের তা-ব আরও গভীর পর্যন্ত প্রসারিত। বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত অফিস-আদালত, ডক্তারখানা, ইমারতের ডিজাইন-ইস্টিমেট, টেন্ডার ইত্যাদিতে ইংরেজির ব্যবহার প্রচলিত। সাধারণ মানুষের যে-গুলো বুঝার কোনও উপায় নেই।
না-বুঝার মহাসমুদ্রে সাধারণ মানুষকে ডুবিয়ে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় যাঁরা উচ্চপদগুলোতে বসে আছেন আপনারা মাতৃভাষার প্রতি কতোটা শ্রদ্ধাশীল, এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। অন্তত আমার মধ্যে এই প্রশ্নটি উঠেছে। আমি সোজা মানুষ সোজা কথায় বুঝি বাংলাাদেশর সকল মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, বাংলা তাদের মাতৃভাষা, তাহলে কোন যুক্তিতে এই দেশের আফিস-আদালতে ইংরেজি চলতে পারে, তাও আবার ইংরেজদের থেকে স্বাধীন হওয়ার ৭০ বছর পরে, মাথায় ঢুকে না। পাকিস্তানের ২৪ বছর বাঙালির কেটে গেলো উর্দুর সঙ্গে যুদ্ধ করে, এখন পাকিস্তানি শাসন শেষ হওয়ার পর ৪৭ বছর ধরে নতুন করে ইংরেজির সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে আমাদেরকে। সত্যি অবাক লাগে। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজরা এবং পাকিস্তান আমলে পশ্চিমা অবাঙালিরা শাসন করেছে আমাদের। ইংরেজরা ইংরেজির এবং পাকিস্তানি অবাঙালিরা ইসলামের নামে উর্দুর অত্যাচার চালিয়ে ছিল আমাদের উপর। আমরা ইংরেজ ও অবাঙালি পশ্চিমাদের অসহ্য অত্যাচারে জর্জরিত হয়েছি, স্বাভাবিকভাবেই অফিস আদালতে, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ও উর্দু ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এখন আমরা কোন্ অবাঙালিদের দ্বারা শাসিত হচ্ছি যে, এখন বাংলাকে ফেলে দিয়ে ইংরেজিকে প্রশাসনের বিভিন্ন কাজেকর্মে ব্যবহার কার হচ্ছে? কেন জানি আমার কেবল মনে হয়, এর পেছনে যুক্তিসঙ্গত কোনও উত্তর তাঁদের পক্ষে থেকে নেই, যাঁরা এখনও ইংরেজিকে ছলেবলেকলেকৌশলে ব্যবহার করে চলেছেন। আর যদি কোনও যুক্তি সঙ্গত উত্তর তাঁদের পক্ষ থেকে না থাকে তবে ইংরেজির ব্যবহারের একটাই কারণ থাকতে পারে, যে-কারণটা অবশ্যই কেনও আর্থিক স্বার্থ উদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। একেবারে এমনি এমনি তো কোনও একটি কাজ এমন বছরের পর বছর ধরে চলে আসতে পারে না। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনও না কোনও একটি কারণ থাকতেই হবে। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারি নির্দেশনা প্রবর্তিত হয়েছে ইংরেজিকে বাদ দিয়ে বাঙলাকে সর্বস্তরে প্রচলন করার জন্যে। কিন্তু জানা কথা, সেগুলো এখনও পর্যন্ত অবহেলিত হচ্ছে।
মনে হয়, বাংলা ব্যবহার না করে ইংরেজি ব্যবহার কারর মধ্যে বাংলাভাষাকে অমর্যাদা করা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি এই অবমাননার কলঙ্ক বাঙালি আর কতো দিন নিজের ঘাড়ে বহন করবে? বাঙালির এই মানসিকতা কি পশ্চাদপদতার একটি লক্ষণ নয়?
লেখক : সভাপতি, ইমারত নির্মাণ কর্মী কল্যাণ সংগঠন, সুনামগঞ্জ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী