,

Notice :

ধ্বংসের পথে বারিক্যা টিলা : প্রতিকার কাম্য

আমাদের একজন প্রথিতযশা সাহিত্যিক আছেন। তিনি দক্ষ গল্পকার শাহেদ আলী। তাঁর একটা বিখ্যাত গল্পের নাম ‘একই সমতলে’। গল্পের উপজীব্য একটি দুগ্ধপুষ্য মানবসন্তান ও একটি কচি বাছুরের ক্ষুধার মধ্যে কোনও তফাৎ নেই, শিশুর অনতিতরুণী মায়ের এই উপলব্ধি অর্জন। প্রসঙ্গটি আর বেশি বিস্তৃত করে বলতে যাওয়ার মতো পরিসর এখানে নেই। কেবল এইটুকু বলি, মানুষের মানবিকতা এতো শক্তিধর যে, গল্পের পরিসরে মানুষ এবং পশুকে একই সমতলে বিবেচনা করতে কসুর করেনি। অথচ বিশ্বসভায় মানুষে মানুষে সমতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মানুষ বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশে মানুষের সম্পদ বৈষম্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। গল্পের নায়িকা জয়গুনের মতো আমাদের উপলদ্ধি উপজিত হচ্ছে না। মানুষকে মানুষের সমতলে অর্থাৎ একই সমতলে অবতীর্ণ হতে হবে এই মানবকল্যাণকামী চিন্তা বর্তমানের স্বার্থন্বেষী মানুষের চিন্তায় উদ্রিক্ত হচ্ছে না, বরং মানুষে মানুষে বিস্তর বৈষম্য সৃষ্টির পথে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে চলেছে একদল মানুষ। এই একদল মানুষ কেবল বিত্তে বড় হতে চায়, কিন্তু জয়গুনের মতো চিত্তে নয়। বিত্তে বড় হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে মানুষ মানুষের মধ্যে সাম্যতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে বিশ্ব জুড়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। সে-প্রচেষ্টার শেষ নেই। এই প্রচেষ্টার অংশ বিশেষ মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়কে সমতল করে দিচ্ছে। বন কাটছে, পাহাড় কটছে। পাহাড় কেটে সমতলের সমান করে দিয়ে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ছে। পাহাড় যতো সমতলের সমান হচ্ছে মানুষে মানুষে তেমনি পাহাড় সমতলের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এই প্রবণতা সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে সুনামগঞ্জের উত্তরে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বারিক্যা টিলা পর্যন্ত। সংবাদে প্রকাশ ইতোমধ্যে বারিক্যা টিলা কেটে সমতল করে দিচ্ছে বিত্তলোভী উনচিত্তরা এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও কার্যকর প্রতিরোধ তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না, বরং অন্যদিকে যে-প্রভাবশালী চক্র পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকা- করে যাচ্ছে এবং বন ও পাহাড় কেটে চলেছে তাদের এইরূপ অপকর্মের প্রতিবাদ করায় প্রতিবাদকারীদের উপর হামলা-মামলা করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। জানা যায় যে, বনবিভাগের বাগানকর্তনকারী ও টিলাকর্তন করে পাথর উত্তোলনকারীদের তালিকা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতি-পরিপ্রেক্ষিতে বলার মতো বিষয় একটিই যে, প্রশাসনিক প্রতিকার যদি বিলম্বিত হয় তবে এই বিলম্বের অবসরে নিন্মোক্ত কয়েকটি ঘটনা ঘটতে পারে। ১. বারিক্যা টিলার পর্যটক আকর্ষণের প্রাকৃতিক বাস্তবতা চিরতরে ক্ষুণ্ন হতে পারে, ২. যেখানে সর্বাগ্রে প্রশাসনিক প্রতিরোধ কার্যকর হওয়ার কথা সেখানে সাধারণের প্রাথমিক প্রতিরোধটি প্রশাসনিক সহায়তা না পেয়ে ব্যর্থ হতে পারে, ৩. শেষ পর্যন্ত প্রভাবশালীরা জয় লাভ করবে ও বারিক্যা টিলার মর্যাদাটি টিলা থেকে সমতলের সঙ্গে মিশে যাবে, এবং ৪. সুনামগঞ্জ হতে বারিক্যা টিলা নামক একটি পর্যটন কেন্দ্র চিরতরে হারিয়ে গিয়ে সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যকে মহাকালের গর্ভে বিলীন করে দেবে।
পরিশেষে একটাই কথা, অনতিবিলম্বে প্রতিকার কাম্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী