,

Notice :

টিলা কেটে পাথর উত্তোলন : ধ্বংস হচ্ছে পর্যটন এলাকা বারিক্যা টিলা


শামস শামীম ::

সুনামগঞ্জের পর্যটন এলাকা খ্যাত বারিক্যা টিলায় (বড়গোপটিলা) পরিবেশ বিধ্বংসী তৎপরতায় মেতে ওঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্র। অনিন্দ্যসুন্দর টিলা কেটে বসতি নির্মাণসহ সম্প্রতি টিলা থেকে পাথর উত্তোলনের জন্য ওই চক্র বনবিভাগের বাগান কেটে ফেলেছে। এখন সেখান থেকে পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করছে। এ ঘটনায় বনবিভাগের উপকারভোগী বাগানের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলাও দিয়েছে বন ও টিলাখেকোরা। এ ঘটনায় পরিবেশ বিধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুক্রবার দুপুরে কয়েক হাজার মানুষ মানববন্ধন করেছেন।
তাহিরপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মেঘালয় পাহাড়ের কোলঘেঁষে রূপের নদী খ্যাত সীমান্ত নদী যাদুকাটার তীরে বাংলাদেশ অংশে একটি পাহাড়াকৃতির সুউচ্চ টিলা রয়েছে। ঢালু ও খাড়া প্রকৃতির এই টিলাটি সরকারি রেকর্ডে বড়গোপটিলা টিলা হিসেবে চিহ্নিত থাকলে গত এক দশক ধরে বারিক্যাটিলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দৃষ্টিনন্দন এই টিলাটি পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয়। পাহাড় ও নদীসংশ্লিষ্ট গহীন বনের এই নৈসর্গিক টিলাটিতে প্রায় ৩১২ একর জমি রয়েছে। যার সবটুকুই সরকারি ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত। এই টিলায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মিশনারি বিদ্যালয় এবং একটি গীর্জাসহ মসজিদও রয়েছে। টিলার নিচেই একটি কমিউনিটি ক্লিনিকও রয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের পাশে গত বছর ৫-৭টি বসতবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে টিলা কেটে। টিলার পশ্চিমাংশ কেটে বসতি স্থাপন করায় গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে টিলা ধসে বালু ও পাথরে রাস্তা ও ফসলি বোরো জমি ভরাট হয়ে গেছে। টিলা কেটে বসতবাড়ি নির্মাণ বন্ধ না হলে পুরো টিলাটিই ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা।
জানা গেছে, গত বছর উপজেলা প্রশাসন টিলা কেটে বসতি স্থাপন করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বসতবাড়িগুলো গুড়িয়ে দেয়। কিন্তু কিছুদিন যাবার পরই আবার টিলা কেটে বসতি নির্মাণের হিড়িক পড়ে।
সুনামগঞ্জ বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালে টিলার পূর্ব-দক্ষিণের ৫ একর ভূমি সামাজিক বনায়নের উদ্যোগ নেয় বনবিভাগ। বিশ্বম্ভরপুর শক্তিয়ারখলা বনবিটের তত্ত্বাবধানে সামাজিক এই বনায়ন কার্যক্রম শুরু হয়। উপকারভোগীরা আকাশমনি, আগর, গামারিসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ লাগান। তবে বনবিভাগের এই মূল্যবান বাগানেই রয়েছে বড় বড় পাথর। যাতে দৃষ্টি পড়েছে পাথরখেকো সিন্ডিকেটের। গত ১৫ সেপ্টেম্বর টিলার পূর্বাংশের বনভূমি কেটে গাছপালা উজাড় করে পাথর উত্তোলনের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় একটি চক্র। চক্রটি রাতের আঁধারে গাছ কেটে পাথর উত্তোলন করে মোটা অংকে টাকা পাওয়ার লোভে এটা করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

বন ও পাথরখেকো সিন্ডিকেটকে পরিবেশ বিধ্বংসী কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানালে বনবিভাগের সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান প্রতিবাদ করলে তার উপর হামলা করে দখলকারীরা। এ নিয়ে বনখেকো ও বনরক্ষকদের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটে। টিলা কেটে পাথর উত্তোলন ও গাছপালা বিক্রির বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর সরেজমিন পরিদর্শন করেন ইউনিয়ন ভূমি সহকারি কর্মকর্তা মো. সেলিম মিয়া। তিনি গত ১৯ সেপ্টেম্বর তাহিরপুর উপজেলার সহকারি কমিশনার (ভূমি) বরাবরে সরেজমিন প্রতিবেদন জমা দেন। সরেজমিন এসে লাল ফ্ল্যাগ টাঙিয়ে দখলবাজদের ওই ভূমিতে না যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রতিবেদনে তিনি বন কাটার বিষয়টি উল্লেখ করলেও পশ্চিমাংশের টিলা কেটে বসতি নির্মাণের বিষয়টি এড়িয়ে যান। তার প্রতিবেদনে টিলা কেটে পাথর ও গাছ বিক্রয়কারী এবং জবরদখলকারী হিসেবে বড়গোপ গ্রামের নূরুল ইসলাম, আব্দুল জলিল, বিল্লাল মিয়া, জাহিদ হাসান, সোলেমান, মো. হানিফা, মো. শফিকুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, মুছা মিয়া, আলমগীর, রাশিদ মিয়া, তোফাজ্জল, নিজাম মিয়া ও আদম আলী নামের ১৪ জন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। প্রতিবেদনে তিনি অবৈধ ও বেআইনীভাবে পর্যটন টিলাটি কেটে পাথর উত্তোলন ও গাছগাছালি বিক্রির করায় নৈসর্গিক পাহাড়ের সৌন্দর্য্য বিনষ্ট, পর্যটকদের চলাফেরায় সমস্যাসৃষ্টিসহ নানা অভিযোগ এনে অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে টিলার বন কেটে পাথর বিক্রি ও গাছগাছালি বিক্রির ঘটনায় বনায়ন কর্মসূচির সাধারণ সম্পাদক মো. মুজিবুর রহমান বাদী হয়ে ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর তার বিরুদ্ধেও পাল্টা মামলা করেছে বনখেকো চক্র। তাছাড়া বনবিভাগও টিলা কেটে গাছ বিক্রির অভিযোগে একটি পৃথক মামলা করেছে।
এদিকে পর্যটন এলাকার বনায়ন ধ্বংসকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তাদের বিচারের দাবিতে এলাকার কয়েক হাজার মানুষ শুক্রবার সকালে টিলার নিচে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। একই দিন চানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বন ও পাথরখেকোদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বনায়ন প্রকল্পের সাধারণ সম্পাদক তাদের শিক্ষকের উপর মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির সাধারণ সম্পাদক ও চানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমান বলেন, বনবিভাগের বাগান কেটে গাছগাছালি বিক্রি ও টিলা কেটে পাথর উত্তোলনের প্রতিবাদ করায় আমাদের উপর সশস্ত্র হামলা করেছে দখলদাররা। আমরা এ ঘটনায় মামলা করায় তারাও আমাদের উপর হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছে। তবে এলাকার সকল মানুষ পর্যটন এলাকাটি রক্ষা ও প্রকৃতি ধ্বংসকারীদের বিচার দাবি করে নানা কর্মসূচি পালন করছেন।
ইউনিয়ন সহকারি ভূমি কর্মকর্তা মো. সেলিম মিয়া বলেন, আমি সরেজমিন গিয়ে গণ্যমান্যদের সঙ্গে কথা বলে বনবিভাগের বাগান কর্তনকারী ও টিলা কেটে পাথর উত্তোলনকারীদের তালিকা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি।
বিশ্বম্ভরপুর শক্তিয়ারখলা বনবিট কর্মকর্তা বীরেন্দ্র কিশোর রায় বলেন, আমাদের বনায়ন প্রকল্প ধ্বংস করে যারা গাছপালা কর্তন করেছে এবং আমাদের সাধারণ সম্পাদক প্রতিবাদ করায় তাকে মারধর করেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছি।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, আমি শীঘ্রই ওইদিকে সরেজমিন যাব। তাছাড়া স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি দেখার জন্য বলব। পাহাড় ও বন ধ্বংস করে কোন স্থাপনা করতে বা পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করতে দেওয়া হবেনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী