,

Notice :
«» সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রদীপ সিংহ কে বিদায়ী সংবর্ধনা «» বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতে অবদানে পুরস্কার বিতরণ «» রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় খালেদা জিয়াকে জেলে আটকে রাখা হয়েছে –কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন «» পাকনা হাওরের : স্কিম গ্রহণ সংক্রান্ত জন-অংশগ্রহণমূলক মতবিনিময় «» জামালগঞ্জে নাশকতার মামলায় ৪ জন গ্রেফতার «» প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ালেন জাহাঙ্গীর আলম «» পরিত্যক্ত গুদামঘরটি অপসারণ করুন «» বিএনপির রাজনীতি : আন্দোলনের ফাঁকে নির্বাচনী প্রচারণা «» ভিডিও কনফারেন্সে তাহিরপুরের শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী «» গ্রেনেড হামলার রায় প্রত্যাহারে বিএনপির কালো পতাকা মিছিল

উদীচী ও কমরেড শ্রীকান্ত


সুশান্ত দাস প্রশান্ত ::

ভাটির জনপদ শাল্লা। আশির দশকেও হাতে বাউয়া নাও (নৌকা) আর বর্ষায় পাও (পা) ছাড়া যোগাযোগের কোন বাহন ছিল না। যদিও আধুনিক সভ্যতার ক্রমবিকাশে এর কিঞ্চিৎ পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। শাল্লা উপজেলা (ঘুঙ্গিয়ারগাঁও বাজার) শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিসেবা সবকিছু মিলিয়ে কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে তা পরিমাপের চেয়ে অবনতি হয়নি তা নিঃসন্দেহে বলা যায় এখন রাষ্ট্রীয় কারণে হয়ে থাকুক বা প্রকৃতি-জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে হয়ে থাকুক সেটা ভিন্ন বিষয়। মাত্র সেদিনও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি বর্ষায় হাওরের পানির উপর ভাসতো। বাজারের হাতে গুনা কয়েকটি ঘর ছাড়া আজকের সরকারি কলেজটিও বিচ্ছিন্নবস্থায় হাওরের পানির উপর ভাসতো। হাতে বাউয়া নৌকা ছাড়া বাজার থেকে কলেজে আসা কল্পনা করা যেত না। যাক যে কথায় ফিরতে হয়- আনুষ্ঠানিকভাবে শাল্লায় কবে কখন উদীচী প্রতিষ্ঠা হয়েছে তা বলা মুশকিল। তবে পরিষ্কারভাবে মনে পড়ছে আমি ৩য়/৪র্থ শ্রেণিতে পড়াবস্থায় শাল্লা কলেজে ছাত্র ইউনিয়ের নবীনবরণ অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছিল উদীচী’র সৌজন্যে। সেই বছর কিংবা পরের বছর শাল্লা হলরুমে বিজয় দিবস বা ২১শে ফেব্রুয়ারিতে উদীচীর নাটক ‘দেওয়ালের লিখন’ হয়েছিল উদীচী’র সৌজন্যে। আরো উদযাপিত হয়েছিল বিশ্ব শ্রমিক দিবস ১লা মে শাল্লাস্থ শাহীদ আলী স্কুল মাঠে। তাছাড়া কেন্দ্রীয়ভাবে জাতীয় সম্মেলনসহ কেন্দ্র থেকে বিভাগ পর্যন্ত শাল্লা উদীচীর স¤পৃক্তাতো ছিল। তবে কেন্দ্রীয় উদীচী ১৯৬৮ সালের ২৯শে অক্টোবর একটি কমিটির মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেছিল। জন্মলগ্ন থেকে উদীচী অধিকার, স্বাধীনতা ও সাম্যের সমাজ নির্মাণের সংগ্রাম করে আসছে। উদীচী ’৬৮, ’৬৯, ’৭০, ’৭১ সালে বাঙালির সার্বিক মুক্তির চেতনাকে ধারণ করে গড়ে তোলে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। এ সংগ্রাম আজ গ্রাম-বাংলার পথে-ঘাটে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘটনা চক্রে কমরেড শ্রীকান্ত দাশের জীবনপঞ্জী ও সাক্ষাৎকার দেখে উদীচীর সূচনালগ্নের কমিটির সদস্যদের সাথে তাঁর স¤পৃক্তা পাওয়া যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য স্মৃতিময় ঘটনা ১৯৪৪/৪৫ সালে নেত্রকোণায় ‘অল ইন্ডিয়া কৃষক সম্মেলন’-এ গণসংগীত পরিবেশন করতে কমরেড মনি সিংহ’র ভূয়সী প্রশংসা কামিয়ে সত্যেন সেনের সান্নিধ্য পান। পাওয়া যায় তাঁর ঘরে থাকা ব্যক্তিগত ট্রাংকে উদীচীর তখনকার কমিটির ব্যক্তিদের অনেক চিঠি। যা শাল্লা উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী নামে। তিনি তিলে তিলে অনেক প্রতিকূলতায় গড়ে তুলেছেন স্বপ্নের আদর্শিক স্তম্ভ শাল্লা উদীচীকে।
আমার যতটুকু মনেপড়ে শাল্লা উদীচী প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি কাজ করে যাচ্ছেন তার কর্মময় জীবন ‘সিলেট মুসলিম জুয়েলার্স’ এর সময় থেকে বা এর আগেও হতে পারে। চিঠিও আসতো ওইখানে। তারপর কর্মজীবন ছেড়ে বাড়িতে এসে ঠিকানা পরিবর্তন করে কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানানো হয়। কিন্তু
কেন্দ্রীয় কমিটি প্রায়ই ভুলবশত পূর্ববর্তী সিলেটের ঠিকানায় চিঠি পাঠাতো। কমরেড তখন আবার ঠিকানা ঠিক-ঠাক করেও কেন্দ্রে পাঠাতেন। এমনকি কোন কোন সময় আমি নিজেই অনেক চিঠি মুসলিম জুয়েলার্স থেকে এনে বাড়িতে তার হাতে দিতাম। জুয়েলার্সে ঢুকলেই উনারা হাসিমুখে আগেই বলতে-থাকেন হ্যাঁ আপনাদের উদীচীর অনেক চিঠি আসছে। সত্যিকার অর্থে শ্রীকান্ত দাশ যেমনি রাজনীতি প্রিয় ছিলেন তেমনি ছিলেন উদীচী প্রিয় গণসংগীত পিপাসু প্রগতিশীল মানুষ। তিনি ব্রিটিশ হঠাও আন্দোলনে দরাজ কণ্ঠে সুর তুলেছিলেন ‘কাউয়ায় ধান খাইলরে, খেদানোর মানুষ নাই, খাওয়ার বেলায় আছে মানুষ, কামের বেলা নাই’। আবার ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দশ লক্ষ বাঙালির জীবন প্রদীপ যখন নিভে যায় তখন বিবেকবান বাঙালির প্রাণ কেঁদে ওঠেছিল। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সারাদেশের মানুষ একযোগে সাহায্যের হাত বাড়ায়। তাৎক্ষণিকভাবে একটি গান রচনা এবং এ গানের সুরারোপ করেন শ্রীকান্ত দাশ “ভিক্ষা দাওগো নগরবাসী, দাও গো ভিক্ষা দাও”। তিনি গণমানুষের কবি দিলওয়ারের অনেক গান/কবিতায় সুর করেছেন যেমন- ‘মা আমার গলা ধরে বলেছে।। হয়নিরে শেষ তোর যুদ্ধ, হয়নিরে সব প্রাণ শুদ্ধ।’
তাছাড়াও কমরেড শ্রীকান্ত দাশ নিজে লিখে গিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের নাটক (‘মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যন্ত অঞ্চল’ অপ্রকাশিত) সহ অসংখ্য গণসংগীত।
বস্তুতপক্ষে সমাজ সংস্কৃতির প্রকৃত নির্মাতা জনগণ। অথচ তারাই সমাজ সংস্কৃতির সকল প্রকার সুফল থেকে বঞ্চিত থাকেন। এই বঞ্চিত মানুষের হাতে তাদের শ্রমের সার্বিক ফসল তুলে দেয়ার পরিবেশ রচনা করতে হলে বর্তমান শোষণমূলক সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন দরকার। আবার এই ইতিবাচক পরিবর্তন গণমানুষের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা ছাড়া সম্ভব নয়। সে কারণেই গণমানুষকে আপন অধিকার স¤পর্কে সচেতন এবং তা আদায়ে সংঘবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার প্রেরণা দেয় উদীচী।
উদীচীর কার্যক্রমের দুইটি প্রধান দিক একটি পারফর্মিং বিভাগ, অন্যটি সংগঠন। প্রত্যেক শাখা সংগঠনেরই সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাটক, নৃত্য ইত্যাদি বিভাগ থাকার নিয়ম রয়েছে। যদিও এক সময়ে উদীচীর আলাদা আলাদা কোন বিভাগ ছিল না। যে শিল্পীরা গান করতেন তারাই আবার নাটক করতেন। কেউ কেউ আবার আবৃত্তিও করতেন। আর এই সংগীত তথা গণসঙ্গীতকে আরো বেশি বিস্তার ঘটানো, গণসঙ্গীত যাতে আরো বেশি শ্রমজীবী মানুষকে উজ্জীবিত করতে পারে, তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারে, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে শিল্পীরা যাতে এ সকল বঞ্চিত-নিপীড়িত-শোষিত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পারে সে লক্ষ্যে উদীচী ধারাবাহিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে এসেছে। তেমনি উদীচীর ভাবশিষ্য গণসংগীত অনুরাগী কমরেড শ্রীকান্ত দাশ। যিনি ১৯৫০ বাংলার ফালগুন মাসে (১৯৪৩/৪৪সাল) সুরমা উপত্যকায় ৮ম কৃষক সম্মেলনে তিনি প্রথম গণসংগীতে যোগ দেন। ১৯৪৪/১৯৪৫ সালে নেত্রকোণায়, “অল ইন্ডিয়া কৃষক সম্মেলন”এ তিনি যোগ দিয়েছিলেন।
আজ শাল্লা উদীচীর সম্মেলন প্রস্তুতি পর্ব চলছে যার প্রতিষ্ঠালগ্নে একান্ত একনিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। দায়িত্ব পালন করেছিলেন শাল্লা উদীচী প্রতিষ্ঠাতাকারী হিসেবে। আরো ছিলেন উদীচী’র কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টাম-লীর সদস্য। বলতে দ্বিধা নাই ‘উদীচী’ অপরাপর সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে আলাদা। উদীচী অর্থ উত্তর দিক, বা ধ্রুব তারা’র দিক। দিকহারা নাবিকেরা যেমন উত্তর দিকে ধ্রুব তারা’র অবস্থান দেখে তাদের নিজ নিজ গন্তব্য স্থির করেন- তেমনি এদেশের সংস্কৃতি তথা গণমানুষের সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক আন্দোলন সবকিছুই উদীচীকে দেখে তার চলার পথ চিনতে পারবে। যতটুকু জানা যায় কথাগুলো সত্যেন সেন খুব সচেতনভাবে নিজেই ব্যাখ্যা করেছিলেন।
প্রথমে ঢাকার নারিন্দায় সাইদুর রহমানের বাসায় মহড়া শুরু হয়। স্থানীয় ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে পরে মুক্তধারা, আবেদ খানের বাসা, হাশেম খানের বাসা, স্বপন ভাবীর বাসা সর্বত্রই প্রায় একই অভিজ্ঞতার পর শান্তিনগরে পীর হবিবুর রহমান মোর্শেদ আলী ও মোনায়েম সরকারের মেস যা ন্যাপের মেস নামে পরিচিত ছিল- সেখানে দলটি উঠে আসে। এই বাসাটি রহিমা চৌধুরাণীর বাসা ছিল। এখানে মসজিদ কমিটি মহড়ায় আপত্তি জানালে দলটির শুভানুধ্যায়ীরা পাল্টা হুমকি প্রদান করেন এবং দলটির বিরুদ্ধে মসজিদে প্রচারিত ইসলামী ছাত্র সংঘের লিফলেট কেড়ে নেন। এতে কাজ হয়। এ সময় একদিন সত্যেন দা দলটির নামকরণের প্রস্তাব দেন এবং নিজেই নাম রাখেন ‘উদীচী’ ।
উদীচী প্রতিষ্ঠার পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই- ১৯১৭ সালে সোভিয়েত বিপ্লবের বিজয়ের পর বিশ্ববাসী নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে শোষণমুক্তির। বুঝতে শুরু করে পুঁজির শৃঙ্খল তাহলে শেষ কথা নয়। নতুন যুগের ভোরে বিশ্ববাসী জেগে উঠতে শুরু করে। শামিল হয় জাগরণের মিছিলে। সে মিছিলে যোগ দেয় ভারতবর্ষের মানুষেরাও। সে মিছিল প্রগতির মিছিল। আর মিছিলের মানুষদের অভিধা হয় প্রগতিশীল। এক নতুন আলোকে বিশ্বটাকে এরা দেখতে পায় নতুন করে। গড়ে ওঠে নতুন শিল্প-সাহিত্য, কবিতা-গান-নৃত্য, নাটক-চলচ্চিত্র, চিত্রকলা-ভাস্কর্য বিশ্ববীক্ষণের এই নতুন আবেগে। এই নতুনধারার শিল্পকলা বিকশিত হয় কোথাও-প্রগতিশীল রাজনীতির অগ্রগামী, কোথাও সহগামী আবার কোথাও অনুগামী হয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় চল্লিশের দশকে ভারতবর্ষে একে একে গড়ে ওঠে সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি, প্রগতি লেখক সংঘ, ফ্যাসিস্ট বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ প্রভৃতি। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই কোলকাতায় প্রতিষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ-এর ঢাকা শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৯ সালে। এর নিয়মিত সদস্য ছিলেন সতীশ পাকড়াশী, সোমেন চন্দ, রণেশ দাশগুপ্ত, কিরণশংকর সেনগুপ্ত, সত্যেন সেন, পরবর্তীকালে মুনীর চৌধুরী ও সরদার ফজলুল করিম। এদের মধ্যে দুজন সত্যেন সেন ও রণেশ দাশগুপ্ত উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা এবং দুজন মুনীর চৌধুরী (শহীদ) ও সরদার ফজলুল করিম উদীচীর অন্যতম উপদেষ্টা। এঁদের সবারই যোগ ছিল ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। রণেশ দাশগুপ্তের ভাষায়- বিপ্লবী নয়া ধ্রুপদী গণকথাশিল্পী সত্যেন সেন ‘উপমহাদেশের জাতীয় মুক্তি ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে অভ্যুত্থানের পর অভ্যুত্থানে যাঁরা নিরন্তর (বর্তমান শতকের প্রায় গোড়া থেকে আশির দশক পর্যন্ত) একটার পর একটা দায়িত্ব পালনে ব্রতী ও উদ্যোগী থেকেছেন’ সেই কর্মীদেরই একজন। রণেশ দাশগুপ্ত যদিও নিজের কথা বলেন নি, কিন্তু আমরা জানি- তিনিও তা-ই ছিলেন। এই চেতনাই ছিল সত্যেন সেন ও রণেশ দাশগুপ্তের জীবন ও শিল্পবোধের কেন্দ্রীয় প্রেরণা।
এই প্রেরণার তাগিদেই সত্যেন সেন ১৯৪০ সনে নারী আত্মরক্ষা সমিতির জন্য গান লেখেন- “ওঠো ভারতের নারী” (সূত্র : শ্রীমতি নিবেদিতা নাগ), ১৯৪২ সালের নভেম্বরে লেখেন “লীগ কংগ্রেস এক হও”, ১৯৪৩ এ দুর্ভিক্ষের উপর গাণ লেখেন ‘চাউলের মূল্য চৌদ্দ টাকা, কেরোসিন তেল নাইরে, কী করি উপায়’।১৯৪৬ সালে কমরেড ব্রজেন দাশের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য কবিয়াল দল গঠন করেন। ইতোমধ্যে ১৯৪৩ সনে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ এবং ১৯৪৪ সনে গণনাট্য সংঘের স্বতন্ত্র বাংলা শাখা গঠন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পূর্ববঙ্গের প্রগতিশীলদের উপর নেমে আসে নির্যাতনের স্টিম রোলার। এসময় প্রগতিশীলরা গড়ে তোলেন ‘শিখা’ গোষ্ঠী এবং বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন। সত্যেন সেন ১৯৪৭ এর দেশভাগের পর ১৯৪৯ পর্যন্ত আত্মগোপনে, ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত কারান্তরালে থাকতে বাধ্য হন। তিনি কাজ করতেন কৃষকদের মধ্যে। তিনি কাজ করতে গিয়ে দেখলেন বক্তৃতার চেয়ে কৃষকদেরকে গান দিয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করা যায়। তিনি চল্লিশ পঞ্চাশের দশকে অজ¯্র গণসঙ্গীত লিখেছেন, সুর করেছেন, গেয়েছেন। নিজে ছিলেন শিল্পী। পাশাপাশি নিকট অতীতেই ছিল গণনাট্য সংঘের অভিজ্ঞতা।১৯৫৬’র ঢাকা জেলা কৃষক সম্মেলন থেকে সত্যেন দা এমন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন তৈরির তাগিদ হৃদয়ে লালন করেন- যে সংগঠন গান, নাটকের মধ্যে দিয়ে সমাজ ও সংস্কৃতি বদলের আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। সেই আদর্শ সামনে রেখে কিছু উৎসাহী তরুণের সহযোগিতায় গড়ে তোলেন “সৃজনী সাহিত্য ও শিল্পীগোষ্ঠী”। এরপর তিনি একটি গানের দল তৈরি করলেন ১৯৫৮ সালে। এই দল তৈরি করার পর পরই সত্যেন সেন কারারুদ্ধ হন এবং বেশির ভাগ সময়ই তাঁকে জেলে কাটাতে হয়। কিন্তু তাঁর তৈরি এ দলটির কর্মকা- টিকে থাকে। গানে এ দলের হাল ধরেন গোলাম মোহাম্মদ ইদু ও সাইদুর রহমান। সাথে ছিলেন আবদুল করিম, আবদুল খালেক প্রমুখ। শিল্পী জাহিদুর রহিম মাঝে মাঝে এই দলটির সাথে যুক্ত হতেন। এর সাথে যুক্ত হন সৃজনীর শুভ রহমান, মোজাম্মেল হোসেন মন্টু, আবেদ খান, নিয়ামত হোসেন, ইউসুফ পাশা, ইয়াহিয়া বখত প্রমুখ। এঁরা সবাই ছিলেন লেখক সাহিত্যিক কবি ও গল্পকার। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত এই নামহীন দলটি বিভিন্ন কৃষক সমাবেশে ও শ্রমিক জমায়েতে গান গেয়েছে। ১৯৬৫-৬৭ তে এর সাথে যুক্ত হন বদরুল আহসান খান, মোস্তফা ওয়াহিদ খান, রাজিয়া বেগম, আখতার হুসেন, পারভেজ শামসুদ্দিন, মজনু মনির প্রমুখ। এ দলের গানগুলোর বেশির ভাগই ছিল বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের গান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের দেশ পর্যায়ের গান, ভারতীয় গণনাট্য সংঘের তৎকালীন প্রচলিত কিছু বাংলা ও হিন্দী গণসঙ্গীত এবং সত্যেন সেনের নিজের লেখা ও সুর করা গান।
১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা কালে যখন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে, ঢাকাসহ সারা দেশ যখন উত্তাল মিছিল-মিটিং, স্লোগান, গণসঙ্গীতে সে সময়েও গানের পাশাপাশি উদীচীর নতুন পথনাটক ‘সামনে লড়াই’। ১৯৬৮তে বাংলা একাডেমীতে মঞ্চনাটক ‘আলো আসছে’ ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী পথ নাটক ‘শপথ নিলাম’ এরপরই জহির রায়হানের ‘পোস্টার’ গল্পের নাট্যরূপ দিয়ে পথ নাটক, ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যাকা-ের পর ’৭৫ এর আগস্ট থেকে ’৭৫ এর ডিসেম্বর। মাত্র ৫ মাস। সারাদেশ তখনো স্তব্ধ, মূক। কেউ কোন কথা বলে না। উদীচীর শিল্পীরা শিল্পকলা একাডেমীর অনুষ্ঠানে গান ধরেছে। সমবেত কণ্ঠে, “এদেশ বিপন্ন, বিপন্ন আজ।” সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা থেকে শিল্পী অজিত রায়ের সুর করা গান। পরের গান সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা থেকে, “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা।” পরের গান ছিল “ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে”। এরপর ১৯৭৬ এর একুশের অনুষ্ঠান। সেন্টু রায়ের পরিকল্পনায় ৬ ফুট উচ্চতায় খালি মাইক্রোফোন, ডায়াসে পাইপ আর চশমা রেখে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ। এর পরপরই মাহমুদ সেলিমের নেতৃত্বে রচিত হয় গীতিআলেখ্য ‘ইতিহাস কথা কও’। লোকজ ফর্মে ও সুরে এই গীতিআলেখ্যের ভিতর দিয়ে প্রচ- সাহসের সাথে উদীচী বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধুর অবদান, তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ তুলে ধরে। এটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৭৬ এর ১৬ ডিসেম্বর কেরানীগঞ্জের ই¯পাহানি কলেজের মাঠে। এর পরে ১৯৭৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে রমনা বটমূলে “ইতিহাস কথা কও” এর নির্ধারিত মঞ্চায়ন যখন নিষিদ্ধ হয় তখন সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রোকেয়া হলের সামনের রাস্তায় ১৫/২০ হাজার দর্শকের সামনে এটি মঞ্চায়িত হয়। অতঃপর স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে যুদ্ধপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ পর্যন্ত উদীচীর ভূমিকা অনন্য। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি বাঙালির সকল গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামে অনবদ্য ভূমিকা পালন এবং অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল জাতি গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে।
আসছে ২১ শে সেপ্টেম্বর শাল্লা উদীচী’র হবে সম্মেলন। সম্মেলনে আসবে অনেক নতুন নতুন মুখ। উদীচী হবে সংস্কৃতির অগ্নিসেতু, যা সমস্ত অন্ধকারকে পরাভূত করে জনগণকে নিয়ে যাবে মুক্তির পথে। জয় উদীচী। জয় হোক মেহনতি মানুষের।
[লেখক : সুশান্ত দাস (প্রশান্ত), রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী, লন্ডন, যুক্তরাজ্য]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী