,

Notice :
«» জেলা প্রশাসকের সাথে রিপোর্টার্স ইউনিটি নেতৃবৃন্দের সৌজন্য সাক্ষাৎ «» সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবার মান আরো বৃদ্ধি করতে হবে : জেলা প্রশাসক «» জগন্নাথপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ভুল রিপোর্ট প্রদানের অভিযোগ «» কালনী নদী থেকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ উদ্ধার «» স্বেচ্ছাসেবক লীগের আনন্দ মিছিল «» সরকারি কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপনে জরুরি সভা আজ «» দুর্গাপূজা উপলক্ষে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে «» নতুন এমপিওভুক্তির আবেদন ৯৪৯৮, চলছে যাচাই-বাছাই «» দ্বিমুখী ক্ষতি থেকে অভিভাবকদের রক্ষা করুন «» টাঙ্গুয়ার হাওর : নৌ মালিক-চালকদের কাছে জিম্মি পর্যটকরা

সিলেট অঞ্চলের কৃষি, সমস্যা ও সম্ভাবনা

মোহাইমিনুর রশিদ ::
দুইটি পাতা একটি কুড়ির দেশ সিলেট। বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাংশে হাওর, বাঁওর, বিল, পাহাড়, নদী, বনাঞ্চল আর সমতল ভূমির অপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত সিলেট অঞ্চল। সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ জেলার সমন্বয়ে এ সিলেট অঞ্চল। এ অঞ্চলের মোট আয়তন ১২,৫০৫.৩২ বর্গকিলোমিটার যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ১২% এবং মোট জনসংখ্যা প্রায় ১,১৪,২৪,৭২০ জন। প্রায় ১১,৮১,২১৩টি কৃষি পরিবারের মোট ফসলি জমি প্রায় ১২,৫৬,৮৫৭ হেক্টর। ভূমির বিচিত্র লীলায় রয়েছে হাজারও পাহাড়-টিলা এবং হাওর-বাঁওরের সংখ্যা প্রায় ২১৮টি।
এ অঞ্চলে আবাদি জমির শতকরা ৪০ ভাগই হাওর এলাকা যেখানে অসংখ্য ছোট বড় হাওর, বিল আর প্রাকৃতিক জলাধার আছে। বিশ্ব খ্যাত হাকালুকি ও টাঙ্গুয়ার হাওর এ সিলেট অঞ্চলেই অবস্থিত।
বাংলাদেশের মোট ১৬৩টি চা বাগানের মধ্যে ১২৭টি চা বাগান রয়েছে এ সিলেট অঞ্চলে। শস্য খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংস¤পূর্ণ এ অঞ্চল তবে শাকসবজি উৎপাদনে দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে এখনও অনেক পেছনে। কৃষি পরিবেশ অঞ্চলেরও রয়েছে এক বিচিত্রতা মোট ৬টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চল যথা এইজেড ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৯ এবং ৩০ ভুক্ত এ অঞ্চল। বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল অঞ্চল সিলেট। সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজার জেলায় সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য সূত্রে ২০১৬ সালে এ অঞ্চলে মোট বৃষ্টিপাত ছিল ৭,৮৫৩ মিমি.। এ অঞ্চলের মাটির কথা কি আর বলব, এ অঞ্চলের মাটিরও রয়েছে বৈচিত্রতা। টিলা, পাহাড় এবং সুরমা অববাহিকা হওয়ায় বেশিরভাগ মাটিই অম্লীয় মাটি। অনেকাংশে অম্লীয় মাত্রা পিএইচ স্কেলে ৪.০০ এর নিচে। মাটির গঠনেও রয়েছে ভিন্নতা। ধানভিত্তিক ফসল ধারায় স্বল্পমেয়াদি অন্যান্য ফসল সমন্বয় করে যথাযথ পরিকল্পনা ও উপযোগী কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব। কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে সিলেট অঞ্চলে তাই প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষির রয়েছে অপার সম্ভাবনা।
একনজরে সিলেট অঞ্চলের কৃষির হালচাল :
সিলেট অঞ্চলের মানুষের মূল উপজীব্য বিষয় কৃষি হওয়া সত্ত্বেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেটের কৃষি এখনও অনেক পেছনে। সিলেট অঞ্চলে নিট ফসলি জমি প্রায় ৭,৯৭,৯৪৯ হেক্টর। জেলাওয়ারি নিট ফসলি জমির পরিমাণ সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জে যথাক্রমে ২,১৪,৩৩৩ হেক্টর, ১,২৬,৬৮২ হেক্টর, ১,৮০,৫০০ হেক্টর এবং ২,৭৬,৪৩৪ হেক্টর। সিলেট অঞ্চলে এক ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় ৩,৭২,৪৫০ হেক্টর, দুই ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় ৩,৩৩,৬৫৩ হেক্টর, তিন ফসলি জমির পরিমাণ মাত্র ৮৩,০০০ হেক্টর এবং তিনের অধিক ফসলি জমির পরিমাণ একবারেই নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে ফসলের নিবিড়তা ১৯৭ শতাংশ। অথচ সিলেট অঞ্চলের শস্যের নিবিড়তা মাত্র ১৬৮%। যার মধ্যে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ জেলার ফসলের গড় নিবিড়তা যথাক্রমে ১৭৪%, ১৭৮%, ১৭২% এবং ১৪৯%। এ অঞ্চলে মোট কৃষক পরিবার প্রায় ১১,৮১,২১৩টি, এর মধ্যে ভূমিহীন পরিবার প্রায় ২,৩৪,০৬৩টি, প্রান্তিক চাষি প্রায় ৫,২১,৬৯২টি, ক্ষুদ্র চাষি প্রায় ২,৩০,৫২৮টি, মাঝারি ১,৫০,৮৭৩টি এবং বড় কৃষক পরিবার প্রায় ৪৪,০৫৭ টি।
সিলেট অঞ্চলে মৌসুমি পতিত জমি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রবি মৌসুমে প্রায় ১,৬৪,১৬৮ হেক্টর, খরিফ-১ এ প্রায় ১,৮১,৭২৫ হেক্টর এবং খরিফ-২ এ প্রায় ৫১,৫০১ হেক্টর জমি পতিত থাকে। খাদ্য পরিস্থিতির বিবেচনায় এ অঞ্চল শস্য খাদ্যে উদ্বৃত্ত- ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ৯,৩৭,০৯১ মেট্রিক টন শস্য খাদ্য বেশি উৎপাদিত হয়েছিল।
এ অঞ্চলের প্রধান প্রধান শস্যবিন্যাস :
প্রধান প্রধান শস্যবিন্যাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বোরো-পতিত-পতিত (৩৪%), বোরো-পতিত রোপা আমন (১৭%), পতিত-আউশ-রোপা আমন (১২%), পতিত-পতিত-রোপা আমন (১০%), বোরো-আউশ-রোপা আমন (৪%), বোরো-বোনা আমন-রোপা আমন (৪%), সবজি-পতিত-রোপা আমন (৩%), সবজি-সবজি-সবজি (৩%), সরিষা+বোরো-পতিত-রোপা আমন (৩%), এসব।
সিলেট অঞ্চলের কৃষিতে প্রধান প্রধান সমস্যা :
বর্তমানে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমাদের কৃষি চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অঞ্চলের কৃষি ও কৃষিজীবী মানুষের জীবন জীবিকার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। অতিবৃষ্টি, বজ্রসহ বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে সর্বনাশা আগাম বন্যা কৃষকের জন্য আতঙ্কের বিষয়। প্রতিনিয়ত পাহাড়ি ঢলে নদী ভরাট হওয়ায় নদীতে পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে খ- খ- বাঁধ ভেঙে নি¤œাঞ্চলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ফসলহানি হওয়া। ভূ-গর্ভস্থ পাথর, বালি ও গ্যাসের জন্য গভীর নলকূপ স্থাপনে অপরাগতা। শীত মৌসুমে নদী ও খালের পানি দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ায় সেচ কাজ পরিচালনা ব্যাহত হওয়া। রবি মৌসুমে পতিত জমিতে গো-চারণের উপদ্রব। প্রবাসী মালিক ফলে অনেক সময় জমি বর্গা চাষে দিতে অনীহা। চা বাগানের অন্তর্গত টিলা জাতীয় জমি অনাবাদি থাকা। আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষাকল্পে স্বল্প জীবনকাল স¤পন্ন উফশী জাত ও সময়মতো বীজের অভাব। নদীর পাড় ও বাঁধ থেকে হাওরের জমি অত্যন্ত নিচু বিধায় পানির চাপে নদীর পাড় উপচিয়ে ও বাঁধ ভেঙে স্বল্প সময়ের মধ্যে মাঠের ফসল ডুবে যাওয়া। হাওর এলাকায় দেরিতে পানি সরার কারণে সঠিক সময়ে বোরো বীজতলা ও চারা রোপণ বিলম্বিত হওয়া। শীতকালে শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশা, বোরো ধান সংগ্রহের সময় বৃষ্টিপাত হয় বিধায় ধান শুকানো সমস্যা, হাওর এলাকায় ফসলের মাঠ বাড়ি হতে দূরবর্তী স্থানে হওয়ায় কৃষি উপকরণসহ নিয়মিত জমি পরিদর্শন সমস্যা। তাছাড়া অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সেচ ও নিষ্কাশনের অপ্রতুলতা, শ্রমিক সংকট।
সিলেট অঞ্চল উপযোগী ফসল ও জাত :
ধান ফসলের জন্য প্রথমে আমন ধানের আগাম জাতের মধ্যে রয়েছে বিনাধান৭, বিনাধান১৭, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯, ব্রি ধান৫৭, ব্রি ধান৬২ এসব জাত। মধ্যম মেয়াদি আমন ধানের জাতের মধ্যে আছে ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১ এবং ব্রি ধান৪৯ এবং নাবি জাত হিসেবে বিআর২২, বিআর২৩, বিনাশাইল, নাইজার শাইল এসব। অধিক ফলনশীল মাঝারি থেকে মোটা চালের জন্য বিআর১০, বিআর১১, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৩১ চাষ করা যায়। সুগন্ধি চালের জন্য ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭, ব্রি ধান৩৮ চাষ করা যায়। বন্যার পানি বা জলমগ্নতা সহনশীল জাত ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২ এবং বিনাধান১১, বিনাধান১২ চাষ করা যায়। তবে সিলেট এলাকার জন্য ব্রি ধান৪৯ এবং বিআর১১ খুবই উপযোগী। বোরো ধানের উপযোগী জাতগুলো-উফশী জাত : ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৮ এসব। হাওর এলাকায় বোরো ধানের জাত হিসেবে ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৫৮ এবং বিনাধান-১০ চাষ করা খুবই উপযোগী। হাওর এলাকায় আগাম আকস্মিক বন্যার হাত থেকে বাঁচার জন্য ব্রি ধান২৯ চাষ না করাই উত্তম। আউশ মৌসুমে উফশী ধান বিআর২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮ উল্লেখযোগ্য। সর্বোপরি এ এলাকায় সুগন্ধি ধান উৎপাদনের একটি বিশাল সুযোগ রয়েছে।
গম ফসলের মধ্যে বারি গম-২৪, বারি গম-২৫ এবং বারি গম-২৬ চাষ সম্প্রসারণ করা যায়। তেল ফসলের ক্ষেত্রে সরিষা (বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫, বারি সরিষা-১৭ এসব), সয়াবিন, বাদাম, চিনাবাদাম, সূর্যমুখী, তিল, তিসি; মসলা জাতীয় মরিচ, হলুদ; সবজি হিসেবে করলা, লাউ, বেগুন, টমেটো, শসা, মটরশুঁটি, ঢেঁড়শ, মিষ্টিকুমড়া; ফল চাষ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে খাটো জাতের নারিকেল, মাল্টা, আমড়া, থাই পেয়ারা, কাউফল, ডেউয়া, কুল, সফেদা, আমলকী, লটকন, তৈকর, আম, জাম, বাতাবিলেবু, তরমুজ, বাঙি লাগানো যায়। তাছাড়া অন্যান্য ফসল চুইঝাল, সাতকরা, গোলমরিচ, নাগামরিচ, লাইশাক, গাছ আলু, খাসিয়া পান, সুপারি, ফরাস, লতিকচু, চাষ বেশ উপযোগী। তাছাড়াও রয়েছে বেত, মূর্তা এসবের চাষ।
সিলেট অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী প্রযুক্তিগুলো :
এ এলাকার জন্য উপযোগী প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে প্রথমে হচ্ছে ডলোচুনের ব্যবহার-সিলেট এলাকার অম্লীয় মাটি দূর করার জন্য শতাংশ প্রতি ০৪ কেজি হারে ডলোচুন ভালোভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে, একবার ডলোচুন প্রয়োগ করলে পরবর্তী তিন বছর আর একই জমিতে ডলোচুন দিতে হয় না। ধান চাষে প্রযুক্তি- আমন মৌসুমে বন্যা সহনশীল জাতের ধান ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২ এবং বিনাধান১০, বিনাধান১২ চাষ করা। হাওর এলাকায় বোরো ধানের জাত হিসেবে ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৫৮ এবং বিনাধান১০ চাষ করা খুবই উচিত। আউশে ব্রি ধান৪৮ চাষাবাদ করা। সবজি চাষে গোলাপগঞ্জ মডেল- সবজি বাগানের চারটি বেডে সারা বছর উৎপাদনের চারটি সবজি বিন্যাস অনুসরণ করার জন্য সুপারিশ করা হয়। এক্ষেত্রে প্রথম বেডে : টমেটো অথবা মুলা পরবর্তীতে ডাঁটা তারপর গিমাকলমি, দ্বিতীয় বেডে : লালশাক অথবা বাঁধাকপি এরপর ডাঁটা তারপর ঢেঁড়শ, তৃতীয় বেডে : বেগুন বা লালশাক তারপর পুঁইশাক এবং তারপরে গিমাকলমি সবশেষে চতুর্থ বেডে : ফরাস শিম তারপর লালশাক পরবর্তীতে পুঁইশাক বা বরবটি চাষ করে সারা বছর বাড়ির আঙিনা থেকে শাকসবজি সংগ্রহ করা যায়। স¤পূরক সেচ ব্যবস্থাপনা-সিলেট অঞ্চলে রবি ফসলের সময় পানির অভাব দেখা দেয়, ফলে পরিকল্পিত উপায়ে ছড়া বা পুকুর কেটে পানি সংরক্ষণ করে স¤পূরক সেচ প্রদান করার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। টিলায় ফলবাগান স্থাপন, আম ধানের সাথে মিষ্টিকুমড়ার রিলে শস্য চাষ, বসতবাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ, বসতবাড়িতে ফল বাগান স্থাপন, সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনা- হাওর এলাকায় একমাত্র ফসল বোরো ধান, পাশাপাশি কৃষকের হাস চাষ, গবাদিপ্রাণী লালন পালন, হাঁস-মুরগি পালন করেও আয় রোজগার করতে পারে। বস্তা পদ্ধতিতে ফল ও সবজি চাষ, জলাবদ্ধ এলাকার জন্য ভাসমান সবজি চাষ, মালচিংয়ের মাধ্যমে ফসল চাষ, বিনাচাষে ফসল উৎপাদন, আন্তঃফসল হিসেবে হলুদ, আদার চাষ; ভার্মিক¤েপাস্ট, সবুজ সার, খামারজাত সার, সেক্স ফেরোমেন ট্র্যাপ, ফিতা পাইপ পদ্ধতিতে সেচ, ¯িপ্রংকলার পদ্ধতিতে সেচ প্রদান, রাবার ড্যাম, খাল ও নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ এসব। তাছাড়া পলিথিন সেচ বা পানি দিয়ে বোরো বীজতলা শৈত্যপ্রবাহ থেকে রক্ষা করা।
উপযোগী কৃষি যন্ত্রপাতি :
এলাকা উপযোগী কৃষি যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে পাওয়ার টিলার, রিপার, বেড প্লান্টার, পাওয়ার থ্রেসার, প্যাডেল থ্রেসার, কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রাইস রিপার, ফুট পা¤প, ¯েপ্রয়ার। তাছাড়া মাটির অম্লত্ব পরিমাপের জন্য যন্ত্র পিএইচ মিটার, আবহাওয়াগত তথ্য প্রাপ্তির জন্য আবহাওয়া ডিসপ্লেবোর্ড, বজ্রপাত থেকে রক্ষার জন্য বজ্রপাত এরেস্টার, আপেক্ষিক আদ্রতামাপক যন্ত্র, বীজ সংরক্ষণের জন্য ড্রামের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। হাওর এলাকার একমাত্র ফসল বোরো ধান কাটার জন্য রাইস রিপার, মিনি কম্বাইন্ড হারভেস্টার খুবই উপযোগী তাছাড়া সময়মতো ধান শুকানোর জন্য ভাসমান মাড়াই স্থান/খলা (ফ্লোটিং থ্রেসিং ফ্লোর) সহ ড্রায়ার ব্যবস্থাপনা।
সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য কর্মসূচিভিত্তিক সুপারিশ :
পাহাড়, টিলা ও বসতবাড়িতে ফল বাগান স্থাপন করা, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সবজি আবাদ করা, অপ্রচলিত ফলের (কাউফল, ডেউয়া, লটকন, বাতাবিলেবু, শরিফা, তৈকর) আবাদ সম্প্রসারণ করা, তাছাড়া (খাটো জাতের নারিকেল, আমড়া, পেয়ারা, মাল্টা, সফেদা) বাগান তৈরি করা, উচ্চমূল্যের ফসলের (গ্রীষ্মকালীন টমেটো ও শিম, কুল, কলা, সুপারি, পান, সূর্যমুখী) আবাদ সম্প্রসারণ করা, বসতবাড়ির আঙিনায় গোলাপগঞ্জ মডেল অনুসরণ করে সবজি উৎপাদন করা, হাওরাঞ্চলে সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রম (সবজি চাষ, হাস পালন, গবাদিপ্রাণী পালন) চালু করা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় ক¤েপাস্ট সার ও ডলোচুনের ব্যবহার নিশ্চিত করা, ডিএপি ও এমওপি সারের ব্যবহার বাড়ানো, রাস্তার দুই ধারে তাল, খেজুর, সজিনা বাগান তৈরি করা, জলাবদ্ধ স্থানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভাসমান বেডে সবজির চারা এমনকি সবজি উৎপাদন, পাহাড়ি ছড়ায় বাঁধ দিয়ে পানি সংরক্ষণ করে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ওয়াটার রিজার্ভার, বিল, খাস পুকুরসহ অন্যান্য জলাশয় খনন করে পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, আগাম বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য আগাম জাত চাষাবাদ নিশ্চিত করা ও বন্যা প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণ, মেরামত ও প্রয়োজনীয় স্লুইস গেট স্থাপন করা, পলিথিন সেচ ও পানি দিয়ে বোরো বীজতলাকে শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশা থেকে রক্ষা করা, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের জন্য রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার, পাওয়ার থ্রেসার ও ড্রায়ার যন্ত্রসহ অন্যান্য যন্ত্রগুলো সহজীকরণ ও সহজলভ্যকরণ করা, হাওর এলাকায় সাবমার্সিবল রোড নির্মাণ, দূরবর্তী স্থানে থ্রেসিং ফ্লোর এবং গুদাম ঘর তৈরি করা, প্রয়োজনীয় সংখ্যক হিমাগার তৈরি করা, ফসল/ফল/সবজি সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ সহায়ক কার্যক্রম এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার সংযোগ সৃষ্টি করা, কৃষি উপকরণ সরবরাহ ও ঋণ প্রাপ্তি সহজলভ্যকরণ; সেচের জন্য ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার এসব। পতিত জমির ব্যবহার নিশ্চিত করতে আউশ আবাদ বৃদ্ধি করা, প্রবাসী মালিকাধীন জমিগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসা। বোরো ধান রোপণ ও কর্তনের সময় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করা। তাছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে প্রয়োজন মাফিক দক্ষ জনবল নিশ্চিত করাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সম্ভাবনাময় সিলেট অঞ্চল :
পতিত জমি, পাহাড় টিলায় ফলবাগান স্থাপন, বসতবাড়ির আঙিনায় ফল ও সবজি চাষ সম্প্রসারণ, স্বল্প পানির চাহিদা স¤পন্ন ফসলের আবাদ বাড়ানো, উচ্চ মূল্যের ফসলের চাষাবাদ সম্প্রসারণ, স্থানীয় ফসলের জাতগুলোর উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি করা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রায়োগিক কার্যক্রম গ্রহণ করা, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন, পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহার ও ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, আউশ ধানের আবাদ বৃদ্ধি, সমতল ভূমির জন্য বিশেষ ফসল যেমন ভুট্টা, ফরাস, লতিকচু, হলুদ, আদা, ডাল, শাকসবজি, কচু, ক্যাপসিকাম, নাগামরিচ, তরমুজ, কলা, গোলআলু, মিষ্টিআলু ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ সিলেট এলাকার কৃষি ব্যবস্থায় উন্নয়নের সম্ভাব্য সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া হাওর এলাকার জন্য রবি সবজি, চিনাবাদাম, গর্জন, তিল, তিসি, তরমুজ এসব ফসল এবং পাহাড়ি ও টিলায় কমলা, মাল্টা, বাহারি রকমের লেবু, জারালেবু, সাতকরা, লিচু, আনারস, আদা, হলুদ, পেয়ারা এসব ফসল আবাদ করা যায়। যার ফলে পতিত জমির সুষ্ঠু ব্যবহারসহ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজিত কৃষি প্রযুক্তিগুলো সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা বাড়ানো সম্ভব।
জমি পতিত রাখা নাকি অপরাধের তালিকায় পড়ে। তাছাড়া বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের তাগিদ রয়েছে জমিকে চাষের আওতায় আনার। চাষের আওতায় জমির পরিমাণ বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ সিলেট অঞ্চলের রয়েছে। হাওর অঞ্চলকে বিশেষ নজরে নিয়ে অম্লীয় মাটির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নব উদ্যোগে নব কৌশলে সিলেটের কৃষিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও কৃষি সম্প্রসারণের সমন্বিত উদ্যোগ।
(তথ্যসূত্র : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা গবেষণা ও উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়েবসাইট এবং কৃষক কর্তৃক ধারণালব্ধ জ্ঞান)।
[লেখক : মোহাইমিনুর রশিদ, কৃষিবিদ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী